১৮তম পর্ব
“শিশুর মুখের দুধের মতো পবিত্র গলায় বলেছিল দ্রোণঃ
এ মাটি আমার, এ মানুষ আমার...”
আমার স্কুলের বন্ধু পিন্টু ভাদুড়ী, কলোনির চার নম্বর গলির মাথায় ইউথ কয়ার ক্লাবের পূর্ব দিকে ছিল তাদের বাড়ি। তার বড়দা কল্যাণ ভাদুড়ী, নকশাল ছিলেন জানতাম। তাকে দেখব বলে একদিন আমি ও সুকু ওদের বাসায় গিয়েছিলাম, কিন্তু সে যাত্রায় দেখা হয়নি। একদিন শুনলাম তাকে খুন করা হয়েছে। জলপাইগুড়ি শহর থেকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূরের ধূপগুড়িতে বাঁশঝাড়ের পাশে চপারের আঘাতে খণ্ডবিখণ্ড তার দেহ পাওয়া গেছে। তিনি তখন পার্টির হোলটাইমার হয়ে আত্মগোপন করেছিলেন ধূপগুড়িতে। গ্রামের এক কৃষকের বাড়িতে স্নান করার সময় তাকে ঘিরে ফেলে চপারের কোপে হত্যা করা হয়। এর পেছনে সেই শাসক প্রসূত গুণ্ডারা ছিল বলে অভিযোগ উঠলে এই নিয়ে খোঁজ-খবর নিতে যান মোহিতনগরের শিক্ষক অধীর চক্রবর্তী বা বেণু স্যার। ছাত্রছাত্রীদের কাছে খুব প্রিয় শিক্ষক বেণু চক্রবর্তী ক্লাসের বাইরেও তার ছাত্রদের নিয়ে নিয়মিত বসতেন। সুবক্তা এই শিক্ষক বিশ্বের নানা বিষয়, দর্শনের কঠিন বিষয় সহজ ভাবে বুঝিয়ে বলতেন সেই কিশোর কিশোরীদের। নকশালবাড়ি আন্দোলনের পক্ষে থাকাই বেণু মাস্টারের উপর দায়িত্ব পড়ল কল্যাণ ভাদুড়ীর খুনের খোঁজ-খবর নিয়ে এসে পার্টিকে জানাতে। ধূপগুড়ির কালীরহাটে গিয়ে তিনি স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে কল্যাণ ভাদুড়ী হত্যার বিষয়ে খোঁজ খবর নেবেন, সেই রিপোর্ট পার্টিকে জানবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনিও খুন হয়ে যান। জানা যায়, যারা বেণু মাস্টারকে পথ দেখিয়ে গ্রামের ভেতর নিয়ে যায় তারাই তাকে খুন করে। জলপাইগুড়ি শহরেও কিছু মর্মান্তিক খুনের ঘটনা ঘটে এই সময়। মোহিত নগরে খুন হন সমীর তলাপাত্র, এরপর তার আত্মীয়-স্বজনরা মোহিতনগরের জমি মিশনারি স্কুলের কাছে বিক্রি করে চলে আসেন শহরে। জেলা আদালতের সামনে খুন হন পুলিশের এক সাব-ইন্সপেক্টর সুজয় ব্যানার্জী। বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ স্পন্দিত বাংলার এই অঞ্চলের মাটিও তখন রক্তে ভিজে উঠছিল। ‘শান্তি বাহিনী’ তখন সরকারি বর্মে সজ্জিত হয়ে পাড়ায় পাড়ায় ‘নকশাল’ খুঁজছে। নিঃশব্দে, অজ্ঞাতে গুম হয়ে যাচ্ছে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা ছাত্র, তরুণরা।
রাষ্ট্রের পেশিশক্তি ও বর্মে আচ্ছাদিত এদের হাতে গোটা রাজ্যই তখন বিষ্ণু দে-এর ভাষায় ‘নরকের পরে এ রচনা’। গোটা রাজ্য জুড়ে এই হত্যা সন্ত্রাসের মধ্যে আমার চিন্তা-চেতনাকে আজীবন ক্ষতবিক্ষত করেছে তিমির বরণ ঘোষ, দ্রোণাচার্য, সরোজ দত্তর হত্যার ঘটনা, বরানগর কাশীপুর থেকে আমাদের প্রাণকৃষ্ণ, ফালাকাটা। তিমির বরণ ঘোষ, এই দেশের রুদ্ধদ্বার কারাগারের ভেতর বন্দুকের নগ্ন বেয়নেট তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। ১৯৬৪-৭২; এই বাংলার অজস্র তরুণ প্রাণ ফুলের কুঁড়ি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। তিমিরের মৃত্যুর পর প্রিয় ছাত্রের হত্যার খবরে শোকস্তব্ধ কবি শঙ্খ ঘোষ লেখেন এক অমোঘ কবিতা—
“ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্ন শির, তিমির।”
তিনি, শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন— ‘অনার্স ক্লাসে এসে ভর্তি হলো যখন, তরুণ লাবণ্যময় মুখ, উজ্জ্বল চোখ, নম্র আর লাজুক। ...তারপর একবছর বিদেশে কাটাবার পর যখন ফিরে এসেছি আবার আটষট্টিতে, তিমিরের মুখের রেখায় অনেক বদল হয়ে গেছে ততদিনে। কেবল তিমির নয়, অনেক যুবকেরই তখন পালটে গেছে আদল, অনেকেরই মনে হচ্ছে নকশালবাড়ির পথ দেশের মুক্তির পথ, সে-পথে মেতে উঠছে অনেকের মতো তিমিরও’। এরপর একদিন বইয়ের একটি তালিকা নিয়ে ছাত্র আসে শিক্ষকের কাছে।
— ‘ফেরত পেতে দেরি হবে অনেক। এখন তো দেখা হবে না অনেকদিন।’
— ‘অনেকদিন আর কোথায়? তোমাদের এমএ ক্লাস শুরু হতে খুব তো বেশি দেরি নেই আর।’
অল্প খানিকক্ষণ নিচু-মুখে বসে রইল তিমির, বলল তারপর— ‘কিন্তু এম এ পড়ছি না আমি। পড়ে কোনো লাভ নেই। কোনো লাভ নেই এইসব পড়াশোনায়। আপনি কি মনে করেন, না পড়লে কোনো ক্ষতি আছে? ... গ্রামে চলে যাচ্ছি আমি। কোথায় থাকব, কবে ফিরব, কিছুই ঠিক নেই। বইগুলো সঙ্গে থাকলে একটু সুবিধা হবে আমার।’
এই তিমির ‘কিন্তু ধারাও পড়ে একদিন। তারপর, আবার একদিন, কয়েকজন সহবন্দীর সঙ্গে মিলিয়ে তাকে পিটিয়ে মারে পুলিশ—সে খবরও কানে এসে পৌঁছায়’। যন্ত্রণাদগ্ধ কবি লিখলেন—
‘ইন্দ্র ধরেছে কুলিশ
চুরমার ফেটে যায় মেঘ, দশভাগে দশটানে বিদ্যুৎ
তারপর সব চুপ
এই তোমার মুখ, তিমির
কিন্তু তারপর সব চুপ।’
রাষ্ট্র লালিত সেই হত্যা উদ্যাপনের কালে আমাদের আচ্ছন্ন করছিল নিহত কবির রক্তরঞ্জিত প্রাণ। স্কুলের খাতায় টুকে রাখছি তিমিরের মতোই দ্রোণাচার্য ঘোষের কবিতা। হুগলির মগরার কিশোর দ্রোণাচার্য স্বাধীন ভারতের কারাগারের অভ্যন্তরে খুন হওয়া প্রথম কবি শহিদ। ১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি চুচুড়া কারাগারে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দ্রোণ সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। সেই সময় থেকেই ‘দেশ’, ‘অনুষ্টুপ’, ‘বসুমতী’ প্রভৃতি পত্রিকায় কবিতা পাঠাতেন, ছাপা হত। জয়পুরের এক জোতদার খুন হলে পুলিশের সন্দেহ যায় নকশালদের উপর। তারা অনুমান করে দ্রোণাচার্যকে গ্রেপ্তার করে। তখন দ্রোণের বয়স ২৪। জেলে অমানুষিক অত্যাচার করা হয়। অত্যাচারে গুরুতর আহত দ্রোণকে চুচুড়া ইমামবাড়া হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। দরজার বাইরে কঠিন পাহারা রাখা হয়। দ্রোণাচার্য প্রাতঃক্রিয়া করতে গিয়ে হাসপাতালের প্রাচীর টপকে পালিয়ে যান। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার গ্রেপ্তার হন। এরপর চুচুড়া জেলের মধ্যেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দ্রোণের মৃত্যু সংবাদ বাংলার কবি সাহিত্যিকদের আলোড়ন ফেলে দেয়। কবি সনৎ দাশগুপ্ত লেখেন—
“রক্তমাখা দ্রোণফুল পড়ে আছে ঘাতকের থাবার তলায়
ওই ফুল একদিন ফুটেছিল জ্যোৎস্নায়, কবিতায়
তাহার মায়ের স্নেহের ছায়ায়।
...
ভূমিহীনের জ্বলন্ত হাঁসুয়া যখন হাড়ের টংকার
ক্রোধের বিস্ফার,
তখন দুহাতে ঝড়ের আকাশ করে তপ্ত লাল
ওই ক্রোধ ছুঁয়েছিল দ্রোণঃ জন্মের মাটিতে জানু পেতে বসে
সমস্ত শৌখিন কবিতাবলির ধূসর পাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে
শিশুর মুখের দুধের মতো পবিত্র গলায় বলেছিল দ্রোণঃ
এ মাটি আমার, এ মানুষ আমার...”
চলবে








