এক
জানালার গ্রিল গলে বৃষ্টির ঠান্ডা ছাট এসে আঘাত করছিল আলফাতুনের মুখে ও শরীরে। বাইরের মুষলধারে বৃষ্টি, আর শীতল হাওয়া মাখতে মাখতে বারবার সে একই কথা ভাবছিল—আজ কি সত্যিই তমিজুদ্দিনের সঙ্গে দূরের ট্রিপে যাওয়া হবে? বারান্দায় এসে বৃষ্টি দেখছে, আবার রুমে ঢুকছে। ঘরের ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় তার শাড়ীপরা দেখছে, দেখছে নিজেকে। গাছের পাতায় জমা ফোঁটা ফোঁটা জলকণার মতোই আলফাতুনের মনে দ্বিধাটাও চঞ্চল হতে থাকে। আজ সত্যিই কি তমিজুদ্দিনের সাথে দূরের ট্রিপে পাড়ি জমানো হবে? মুষলধারে বৃষ্টি, দমকা বাতাসে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার তীব্র ভালোলাগা, আর অনিশ্চয়তা একই সাথে আলফাতুনের ভেতরে দোলা দিয়ে যাচ্ছিল।
মিরপুর সনি সিনেমা হলের পুবপাশের গলিতে নুইয়ে পড়া একটা বটগাছকে নিরাপত্তায় রেখে গাড়িতে অপেক্ষা করছিলেন তমিজুদ্দিন। পঁয়ষট্টি বছর বয়সি একজন পুরুষের অপেক্ষা অনেক বেশি শান্ত, গভীর, ও নীরব হতে পারে, হয়তো। একথা আলফাতুন ভাবছে তার নিজের অজান্তেই। আসলেই তমিজুদ্দিন গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছেন, শান্ত পাথরের মতো, আর উইন্ডশিল্ডের ওপর জমে থাকা বৃষ্টির প্রতিটি জলবিন্দুতে তখন জমে উঠছিল তার বিগত একযুগের একাকিত্বের পুঞ্জীভূত কামনা ও অপেক্ষা।
লুকিং গ্লাসে রিকশা থেকে আলফাতুনকে নামতে দেখল তমিজুদ্দিন। কোনো তাড়া ছাড়াই সে গাড়ির বামদিকের দরজাটা খুলে দিল, এই খুলে দেওয়াটা যেন অমোঘ একটা নিয়মের মতোই আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। আলফাতুন এসে বসল ড্রাইভিং সিটের ঠিক পাশের আসনটায়। গাড়ির ভেতরের ঠান্ডা এসির বাতাস তাকে আলতো করে ছুঁয়ে গেল। কোনো কথা না বলে ড্যাশবোর্ডের বক্স থেকে বেশ কিছু টিস্যু টেনে নিলো সে। রিকশায় আসার সময় বৃষ্টি ঝাপটায় শরীর যে পানি জমেছে তা যত্নে মুছতে লাগল। আজ সে কপালে লাল টিপ পরেছে। শাড়ির রঙের সাথে মিলিয়ে ঠোঁটে আলতো লিপস্টিক দিয়েছে। বের হওয়ার সময় তার ছোট মেয়ে অবন্তী বলেছিল, “মা, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।”
গাড়ির বন্ধ জানালার কাচে ধাক্কা খেয়ে ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল এই একটা বাক্য “মা, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে”। জামালের মৃত্যুর পর এই প্রথম সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল। আজ সে বসে আছে জামালেরই বন্ধু তমিজুদ্দিনের পাশে।
গাড়ির ইঞ্জিনটা মৃদু গর্জন করে স্টার্ট নিলো। আলফাতুনের মনে হলো, চাকা ঘোরার সাথে সাথে আসলে সে কোনো এক অদৃশ্য ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সমাজ, স্মৃতি কিংবা নিজের ভেতরের বিচারকের আঙুলিকে পাত্তা দিতে মোটেই রাজি নয় সে। অদ্ভুত একটা পুলক তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। এই পুলক আনন্দের, আবার একটা নিষিদ্ধ সীমানা পার হয়ে যাবার শিহরনও। গাড়ির লুকিং গ্লাসের দিকে বারবার তাকাল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার মনে হলো, সে আসলে অন্য কোনো সত্তায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। তমিজুদ্দিনের হাত এখন স্টিয়ারিং হুইলে। হাইওয়েতে উঠার পর গাড়ির গতি বাড়াল। বাইরে তখন চেনা শহরটা দ্রুত পেছনে ছুটে যাচ্ছে, আর আলফাতুন তলিয়ে যাচ্ছে এক চেনা-অচেনার অদ্ভুত গোলকধাঁধায়।
দুই
মেঘ আর বৃষ্টি দেখলেই আলফাতুননেসার মনেও একটা ইচ্ছা জেগে ওঠে, যে ইচ্ছাটা জমিয়ে রেখেছিল বহু বছর ধরে। সকালে, সন্ধ্যায় যখনই মুষলধারে বৃষ্টি হয়, তা দেখতে দেখতে ভিজতে ইচ্ছা করে তার। কতবার ভেবেছে সকালের ঝুম বৃষ্টিতে প্রিয় কারো সঙ্গে দূরের ট্রিপে যাবে, রাস্তার পাশে কোনো এক মাঠের কাছে গাড়ি থামিয়ে তারা ভিজবে। দুজনে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইবে:
“আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে
জানিনে, জানিনে কিছুতে
কেন যে মন লাগে না ॥
এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে
উদ্ভ্রান্ত মেঘে মন চায়
মন চায় ওই বলাকার পথখানি নিতে চিনে॥”
হাত ধরে মাঠের পানি ছিটিয়ে ছিটিয়ে জল-খেলা হবে। গত সপ্তাহ ধরে এই বৃষ্টিটা সত্যিই তার ভেতরের ইচ্ছাটাকে তীব্র করে তুলেছে। ভোর চারটের দিকে ধূসর আবছায়া মারিয়ে যখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল, আলফাতুননেসার ঘুম তখনো পুরোপুরি ভাঙেনি। চোখের পাতায় আলতো করে লেগে থাকা স্বপ্নের অবশিষ্টাংশ, আর জানালার কাছে আছড়ে পড়া জলের ফোঁটার শব্দের মধ্যে সে স্পষ্ট কোনো বিভেদরেখা টানতে পারছিল না। তার শরীরটা বিছানায় স্থির পড়ে থাকলেও, মনটা অনেক আগেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। ঘুম-ঘুম চোখে, মুষলধারে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এক অনিশ্চিত যাত্রার জন্য সে ভেতরে ভেতরে পুষে আসছে। স্বপ্ন ও ইচ্ছা কেউ বুঝি এভাবে পুষে রাখে মনের মধ্যে, বহু বছর ধরে। নিজেকে সে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করে—কেন এই আকাঙ্ক্ষা? অঝোর ধারার বৃষ্টিতে চারপাশের চিরচেনা পৃথিবীর সীমানা হারিয়ে যাওয়ার মতোই তার মনের ভেতরটা সীমাহীন দিগন্তের মতো হয়ে যায়। সীমানা হারিয়ে যায় নিজের মনটারও। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সম্পর্কের চেনা ব্যাকরণ সবকিছু কেমন যেন আবছা ও তরল হয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে অভিজ্ঞতাটা ফিরে পেতে চায় আলফাতুন্নেসা। আসলে আলফাতুনের মনটাও ঠিক এখানে এক প্রবহমান, নোঙরহীন নদীতে মুষলধারে পড়া বৃষ্টির মতোই। প্রত্যেকটা অবস্থাই যেন তার কাছে একটা গন্তব্য। স্থায়ী কোনো গন্তব্যে পৌঁছুতে চায় না সে। ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া বৃষ্টির আকাশ, মাঠ, প্রান্তরের মতোই তার মন। একটা থেকে আরেক অবস্থায় যেতে যেতে যে রং ও ধূসরতা স্থান করে নেয়, তাতেই সে ঠাঁই চায়।
আজও বৃষ্টি হচ্ছে। ভোরের বৃষ্টিঝরা আকাশটা যেন আদিম কোনো যন্ত্রণায় নীলচে-ধূসর বর্ণ হয়ে লাফালাফি করছে জানালার কাছে, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহগনি গাছের পাতায়। আলফাতুনের ঘুম ভেঙেছে একটু আগেই। বিছানার ওমটুকু ছাড়তে তার মন সায় দিচ্ছিল না। চোখের পাতায় তখনো লেগেছিল ঝাপসা, এক টুকরো স্বপ্নের আবেশ—“গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ..”। স্বপ্নটার কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছিল না সে। বাইরে তখনও বর্ষণের শব্দ ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। একঘেয়ে, অথচ একটানা শব্দে সে চোখ মেলল। আলতো পায়ে, প্রায় নিঃশব্দে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বৃষ্টির পানি তখনও জানালার গ্রিল বেয়ে পড়ছে। খুব ইচ্ছা হয়েছিল থুতনি গ্রিলে রেখে আনমনা মাথা হেলিয়ে বৃষ্টি পড়া দেখার। সে ইচ্ছাটা কেন যেন মিলিয়ে গেছে। একটা ঠান্ডা, বুনো, আর ভেজা মাটির গন্ধ তাকে মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে নিলো। রুমের পশ্চিম পাশের বড়ো জানালাটা আধবোজা ছিল। সেখান থেকেই ধেয়ে আসছিল এক অস্থির, হিমেল দমকা হাওয়া। জানালার কাছে হালকা বাতাসের তীব্র ঝাপটায় বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে এক অদ্ভুত অবাধ্যতায়। কাচের ওপর তীব্র বেগে আছড়ে পড়া জলের ফোঁটার শব্দ যেন অদৃশ্য কোনো পিয়ানোর চাবিতে উন্মাদের মতো তীব্র গতিতে আঙুল চালনা করছে অবাধ্য মাতাল এক যন্ত্রী। কাচ বেয়ে জলকণাগুলো আঁকাবাঁকা ধারায় নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। সে অনুভব করছে তার ভেতরটাকে। অবাধ্য মাতাল যন্ত্রীর মতোই দমকা হাওয়ায় ভেসে আসা বৃষ্টির ফোঁটার পতনের শব্দের মতোই পিয়ানোর অবাধ্য আলেগ্রো ছন্দটি তার ভিতরে ভেজে উঠলো। ভেতরে জমা স্মৃতির অবাধ্য ধারার মতোই তার বুকের গভীরে নতুন কোনো পথ খুঁজে নেবার উদ্যেমও সৃষ্টি হয়। আলফাতুন পলকহীন চোখে দেখছে বাতাসের প্রতিটি ঝাপটার সাথে জলের ক্ষুদ্র কণাগুলো বারান্দার গ্রিল গলে ভেতরে ঢুকে আসছে। ছুঁয়ে দিচ্ছে তার পায়ের আঙুল। যেন এক হিমশীতল স্পর্শ। তার উন্মুক্ত হাতের পাতায় এসে আছড়ে পড়ছে অবাধ্য বৃষ্টির হিমকণা।
মাঝেমধ্যেই আকাশের দূর সীমানা হতে তীব্র নীল আলোয় চমকিয়ে উঠেছে বজ্রপাত। সেই গম্ভীর, মেঘমন্দ্র বজ্রধ্বনি বুক কাঁপানো এক তীব্রতায় চারপাশের চিরচেনা নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খানখান করে দেয়। বিদ্যুৎ চমকের সেই ক্ষণস্থায়ী তীব্র আলোয় আলফাতুন দেখল, সামনের চেনা পৃথিবীটা কেমন অচেনা এক রহস্যময় ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে। রাস্তার ধারের মেহগনি গাছটার পাতাগুলো বাতাসের তোড়ে মাথা দোলাচ্ছে। বৃষ্টির ওপারে ধোঁয়াশায় লক্ষ্য করা গেলো আবছা একটা সবুজ বনরেখা, যেন অন্য একটি অপার্থিব জগতের অংশ হয়ে উঠেছে। তার ভেতরটাও কামনার জ্বালায় অপার্থিব হয়ে উঠেছে।
নিবিড়, উৎসুক চোখে বৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকে আলফাতুন। তার চোখের অতলান্তে জমে থাকা না বলা জ্বালা, আর প্রকৃতির তাণ্ডব স্নিগ্ধতা একসঙ্গে লীন হয়ে যাবার মধুর অনুভবে বিভোর হয়ে যায় তার মন ও প্রাণ। এই চেয়ে থাকার মধ্যে কোনো তাড়া নেই, কোনো সামাজিক বন্ধনের দায়বদ্ধতা নেই, শুধু আছে এক নীরবতা। এই যে বাইরে বজ্রের হুংকার, আর জলের অবিরাম স্রোতোধারা, ঠিক তার বিপরীতে নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত শান্ত চরাচর—এই দুই বিপরীত মেরুর মেলবন্ধন তাকে এক অদ্ভুত মাদকতায় আচ্ছন্ন করে দেয়। বৃষ্টির ছাট তার তপ্ত গালের ওপর এসে পড়তেই সে পরম শান্তিতে চোখ বন্ধ করে নেয়। চোখের পাতা জুড়ে বৃষ্টির ছিটে জল কিছুটা শীতল করে দেয় তার ভেতর-বাহির। সে অনুভব করল, অঝোর বর্ষণে তার চেনা সংসারের বাইরে যে কৃত্রিম খোলসটা রয়েছে, তা দ্রবীভূত হয়ে জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। সেখানে জামাল নেই, তাহমিদ নেই, মোয়াজ্জেম নেই, এমনকি তমিজুদ্দিনের মতো ষাটোর্ধ্ব তমিজুদ্দিনও না। কেমন নিঃসঙ্গ! বৃষ্টির শব্দের মতোই নিঃসঙ্গ। অথচ মাথার ওপরে আছে উন্মুক্ত আকাশ, আর বৃষ্টিতে ভেজা বাতাসের মৃদু মন্দিরা। তার মনে হলো, মানুষের মনের নিভৃত কোণে জমে থাকা সব অপ্রকাশিত হাহাকার, আর পুঞ্জীভূত গোপন বাসনাগুলো এই আকাশের বুক চিরে বৃষ্টির রূপ নিয়ে নেমে আসছে।
বৃষ্টির সঙ্গে ভেসে আসা শীতল বাতাসে আলফাতুনের অবাধ্য চুল খানিকটা এলোমেলো করে দিয়ে যায়। বাতাসের ঝাপটা লেগে মুখখানাও ভিজে যায়। বাতাসে ভর করে আসা বৃষ্টির মৃদু আর্দ্রতায় তার গায়ের গাউনটাও ভারী হয়ে ওঠে। আলফাতুন স্থির দাঁড়িয়ে থাকে বৃষ্টির মুখোমুখি। তার এই নিবিড় চেয়ে থাকা, আর বৃষ্টিভেজা অস্থির ধমকা হাওয়ার সঙ্গে মনের এক শব্দহীন গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংলাপ একাকার হয়ে যায়। কোনটা রেখে কোনটাকে রাখতে হবে, ঠাহর করতে পারে না। বিছানা ছেড়ে সে যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, হিমেল বাতাসের একটা ঠান্ডা ঝাপটা তার অবাধ্য চুলে এসে লাগে। ভেতরের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা তখনো কেটে যায়নি। সে ভাবল, এই বৃষ্টিভেজা ভোরে গাড়ির কাচে মাথা রেখে ছুটে চলার চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে? যখন পেছনের চেনা শহরটা হারিয়ে যাবে বৃষ্টির ঘন চাদরে, আর সামনের মেঠো রাস্তাটা মিলিয়ে যাবে ভেজা দিগন্তে। সেখানে কোনো অতীত থাকবে না, ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা থাকবে না, থাকবে শুধুই চিরন্তন বর্তমান।
এই কাল্পনিক যাত্রায় তাহমিদ নেই, জামাল নেই, এমনকি তমিজুদ্দিনের মতো কোনো বিশ্বস্ত আশ্রয়ও নেই। সে সম্পূর্ণ একা, অথচ তার চারপাশে ভিড় করে আছে ফেলে আসা অসংখ্য স্মৃতির মৃদু সুবাস। স্বভাবে ও মেজাজে আলফাতুন এমনই যে সে তার জীবনের কোনো বন্ধনকেই পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না, আবার কোনো বন্ধনেই নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিতে পারে না। এই যে দোদুল্যমান অবস্থা—ঘুম ও জাগরণের মাঝে আলতো আলো-আঁধারি—এটাই আলফাতুনের আসল চারণভূমি। এখানে সে পুষে রাখে আকাশ, বাতাস, রাতের ঝড়-ঝাপটাও।
বাইরে তখন মেঘের গর্জন বাড়ছে। গায়ের চাদরটা একটু শক্ত করে জড়িয়ে সে দরজার দিকে পা বাড়াল। আলফাতুন ভালো করেই জানে, এই অকাল বৃষ্টির সকালের যাত্রা তাকে কোনো সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেবে না। কিন্তু এই না-পৌঁছানোর মাদকতাটুকুই তো তাকে সবচেয়ে বেশি আচ্ছন্ন করে রাখছে। অদ্ভুত একটা উদাসীন হাসি ঠোঁটে নিয়ে অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এসে, যেখানে বুড়িগঙ্গার ওপারের এক আদিগন্ত বৃষ্টিধারা তার অপেক্ষায় চাতকের মতো চেয়ে আছে।
তিন
মুষলধারার বৃষ্টি দেখতে দেখতে অনাবিল একটা ভ্রমণের ইচ্ছা ভেতরে পুষে আসছিল আলফাতুন, তাও অনেকদিন ধরে। আজ সেটা অমনি অমনি মিলে গেল। আসলে দূরে কোথাও যাওয়ার কথা ছিল তাহমিদের সঙ্গে। কিন্তু আলফাতুনের চরিত্রে এক অদ্ভুত, প্রবহমান উদাসীনতা আছে নির্দিষ্ট কোনো সম্পর্কের নোঙরে দীর্ঘদিন স্থির থাকা তার স্বভাবের পরিপন্থি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে তার জীবনে আসা পুরোনো মানুষদের কাউকেই কখনো ভুলে যায় না। আবার মাখামাখি করে রাখার অভ্যাসটাও তার নেই। তাহমিদ ও আলফাতুনের নিবিড় এই সম্পর্কটা তাই বাইরে থেকে পাঠ করা যায় না। তাহমিদ যখনই আলফাতুনকে নিয়ে ভাবে, তার কাছে মনে হয় এ সম্পর্কটা যেন অন্তহীন, অসমাপ্ত উপন্যাসের মতো, যার প্রতিটি পাতা সে উল্টাতে চায়, অথচ অজানা, অদৃশ্য একটা হিম করা সংশয় যেন তাকে আবার আগের পাতায় নিয়ে যায়। পুরোনো সেই পাতায় ফিরেও মনে হয় নতুন করে সে পড়ছে একটা কিছু। সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে তাদের এই সম্পর্কটা আলো আর ছায়ায় আড়াআড়িতে চলে আসছে আজ অবধি। সেই থেকে আজও তাহমিদ আলফাতুনের প্রেম মগ্ন হয়ে আছে। এ যেন মনোযোগী পাঠকের মতোই মগ্ন হয়ে উপন্যাস পাঠ করার মতো। বছরের পর বছর ধরে পড়ছে, আর পেছনের পাতায় নতুন গল্পের পটভূমিকায় ফিরে যাচ্ছে। বারবার। এর মধ্যেই তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে বিষণ্ন একটা একাকিত্ব, যা ভর করে আছে যাপিত জীবনে। নির্মম এক কসাইয়ের মতো সে কাটাছেঁড়া করে, অবলীলায়।
আলফাতুনের স্বভাবের মধ্যে অদ্ভুত একটা ধরন আছে। জীবনের মূলবৃত্তে সে তাহমিদকে ভাবে, অথচ তাকেই সে রাখে পরিবৃত্তের কিনারায়, ঢুকতে দেয় না। শুধুই কেন্দ্রকে ধরে ঘুরছে। তাও বছর চল্লিশেক ধরে। চৌকাঠ মাড়িয়ে কখনো পা বাড়ানোর সুযোগ পায় না তাহমিদ। অদৃশ্য, অথচ দুর্ভেদ্য একটা কাছের মায়াবী দেয়াল তুলে রাখে মাঝখানে। যখনই তারা কাছে আসে, তারপরই খুব অনমনীয় অবহেলায় তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। এবার এতও বিস্মিত হয় তাহমিদ, তাকে ছাড়া আলফাতুনের একটা মুহূর্ত যায় না। কাছে টেনেও বুকে না নেওয়ার খেলাটা খুব সূক্ষ্মভাবে আলফাতুন করতে পারে। আলফাতুনের এই আচরণটা তাহমিদের ভেতরে ভেতরে নীল বিষাদের মতো জমা করা কষ্ট জাগায়। রাতের অন্ধকারে তাহমিদের মনে হয়, এ বুঝি আলফাতুনের অলিখিত শপথ পৃথিবীতে আর কাউকে না হোক, তাহমিদকে সে আজীবন একটা অদ্ভুত, নান্দনিক কষ্টে ডুবিয়ে রাখবে। কষ্টটা পাবে সে, অথচ কোনো চিৎকার করবে না। তাহমিদের এই কষ্টটা ভোরের এক পশলা বৃষ্টির মতোই জানালার কাচে সজোরে আঘাত করে যায়। একটানা বৃষ্টির জলে মাটিকে ভিজিয়ে দেয়, অথচ এ জলকে নদী হতে দেয় না। এখন আর তাতে তাহমিদ কষ্ট পায় না, বরং ভালোবাসে। সে জেনে গেছে, আলফাতুনের দ্বিচারিতা স্বভাবটা।
আলফাতুন তার ভালোটা বুঝে। এই বোঝাপড়ায় অন্যদের স্থান হয় না, যেমনটি হয়নি তাহমিদের। তার স্মৃতিগুলো কোনো ধুলো পড়া পুরোনো অ্যালবাম নয়, বরং ড্রয়ারে রাখা সুরভিত রুমালের মতো, যা সে সময় অসময় বের করে ঘ্রাণ নেয়। একেক ঘ্রাণ, বন্য ঘ্রাণ, মৃদু অথচ আবিরমাখা ঘ্রাণ—সবই থরে থরে সাজিয়ে রেখে দেয়। সবার মতো করেই সবাইকে স্মরণে রাখে আলফাতুন। নিজের মতো এক সমান্তরাল সমীকরণে। কালের বৃষ্টিভেজা এই দিনটির অপেক্ষায় ছিল আলফাতুন। এরকম একটা সকালের খোঁজে পাওয়া যেন তার জীবনের সফলতা, লক্ষ্য। শেষ মুহূর্তে যে সময়টা তার মিলে গেলে তাহমিদকে তা উপভোগের সুযোগ দেয়নি সে।
চার
তখন সবেমাত্র সকাল শুরু হয়েছে। মিরপুরের সনি সিনেমা হলের পাশে এলিয়েন মডেলের গাড়িটার স্টার্ট বন্ধ করে অপেক্ষা করছিলেন তমিজুদ্দিন। আকাশ ভেঙে আবার বৃষ্টি নামল। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আলফাতুন বের হয়। তার পরনের গাঢ় রঙের শাড়িটা ভোরের ধূসর আলোয় হয়তো গাঢ় নীল বা ঘন বেগুনি বলে ভুল হতে পারে। বৃষ্টির স্পর্শ পেয়ে তা এখন অন্য একটা রং নিয়েছে। শাড়ির সুতোগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে, বৃষ্টির স্পর্শ পেয়ে। শাড়ির রঙটা আরও ঘন হয়ে প্রায় কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। বৃষ্টির অবাধ্য ফোঁটা যখন একের পর এক শাড়ির জমিনে, আর আঁচলে আছড়ে পড়ছিল, তখনো তা কোনো সমস্যা তৈরি করেনি। বরং হঠাৎ দমকা হাওয়ায় বৃষ্টির ফোঁটার পতন যেন এক অবাধ্য আলেগ্রে সুরের রূপ নিল। সেই চঞ্চল ছন্দের প্রতিটি আঘাত নকশা এঁকে দিচ্ছিল শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে। ভেজা শাড়িটা আলফাতুনের শরীরে একটা মসৃণ তরঙ্গের মতো লেপ্টে আছে। জলকণার ভারে শাড়ির আঁচলটা তার কাঁধ বেয়ে নিচে নেমে এসেছে, ঠিক তার অবচেতন মনের অবাধ্য চিন্তাগুলোর মতোই যেন নিয়মের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে তারা। জলে ভেজা কাপড়ের স্পর্শ তার শরীরে এক হিমশীতল, অথচ নিবিড় অনুভূতি জাগিয়ে দেয়। বাইরের ঠান্ডা বাতাস যখন সেই ভেজা কাপড়ে মৃদু কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে যায়, আলফাতুনের মনে হয়— সে আর চেনা সমাজের কোনো পরিপাটি নারী নয়, বরং সে নিজেই এই জলঝড়ের অংশ।
পড়ার জন্য এই গাঢ় শাড়িটি বেছে নেওয়ার কারণ আছে। এ কারণের একটি হতে পারে তার অবচেতনে জমে থাকা মনস্তাত্ত্বিক একটা খেলা। সে হয়তো চেয়েছিল নিজের ভেতরের গোপন বাসনা, আর হাহাকারগুলোকে এই গাঢ় রঙের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে। অনেক কষ্টে-তেস্টে লুকিয়ে রাখা তার এই গোপন আবরণটি বৃষ্টির জল আরো বেশি উন্মুক্ত করে দিয়েছে। শাড়ির পাড় বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়া জল যেন তার মনের অপ্রকাশিত কান্নারই রূপকে পরিণত হয়। এই বৃষ্টির স্পর্শে ভিজতে ভিজতে আলফাতুন তা অনুভব করবে, নিবিড় করে। তবে এই সিক্ততা পরাজয় নয়, বরং এক আদিম ও অনাবিল সমর্পণ, যেখানে তার ভেতরের কৃত্রিম খোলসটা শাড়ির রঙের মতোই তরল ও তীব্র হয়ে ওঠে।
বাসা থেকে রিকশা করে সনি সিনেমার হলে গলি অবধি আসতে গিয়ে রিকশার পাতলা পলিথিনের তৈরি ঠুনকো নিরাপত্তা ভেদ করে বৃষ্টির অবাধ্য ছাট কখন যে তার শাড়ির নিচের দিকটা ভিজিয়ে দিয়েছে, সে খেয়াল তার ছিল না। গাড়িটির কাছে এসে চটজলদি ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। তখনও তার শরীরে, মনে বৃষ্টির মৃদু সুবাস, আর চোখে এক আকাশ মুগ্ধতা।
“কোথায় যাবে, ঠিক করেছ কিছু?”
তমিজুদ্দিনের গলায় বয়সের চেয়েও আশ্বস্ত করার মতো ওম ছিল। আলফাতুন শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বলল,
“মাওয়ার দিকে খারাপ হবে না।”
পুরোনো এলিয়েন মডেলের গাড়িটি তার নিজস্ব মন্থর গতিতে চলতে শুরু করে। ঢাকা শহরের চেনা জটলা পেরিয়ে গাড়ি যখন বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে কেরানীগঞ্জের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন ঘড়ির কাঁটা সবে সকাল আটটা ছুঁয়েছে। বহুদিন ধরে আলফাতুন তার অফিসের সহকর্মীদের কাছে শুনে আসছে—কেরানীগঞ্জের ইনসার আলীর খুদের ভাতের দোকানের কথা। গরম গরম খুদের ভাতের সঙ্গে শুঁটকি ভুনা, বেগুন ভর্তা, আর হরেক রকমের চাটনির যে স্বাদ, তা খাবারের ইচ্ছেটা বহুদিনের। শিবচর যাবার পথে সকালের ভোজ এখানে সেরে নিলে খারাপ হবে না।
গাড়ি এগিয়ে যায়। ড্রাইভারের সিটে বসা পঁয়ষট্টি বছর বয়সি তমিজুদ্দিনের পুরো মনোযোগ তখন সামনের পিচঢালা ভেজা রাস্তায়। তমিজউদ্দিনের বামপায়ে আলফাতুন তার হাতটি রাখল। তমিজুদ্দিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার এই ভঙ্গিটি ছিল ভীষণ নিবিড়। বয়স পঁয়ষট্টি পেরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই পরিণত বয়সে এসেও একজন নারীর এমন অতর্কিত ও মায়াবী স্পর্শে ভেতর থেকে চমকে ওঠেন তিনি। বহুকাল পর তার বুকের ভেতর অদ্ভুত, তীব্র একটা শিহরন খেলে গেল—যেন এক চিলতে বসন্তের হাওয়া এসে দোলা দিয়ে গেল তার শুকনো ডালে। স্টিয়ারিং ধরে থাকা অবস্থাতেই তার বাম হাতটি বাড়িয়ে আলফাতুনের ডান হাতটি যত্নে চেপে ধরেন তমিজুদ্দিন। দুটি হাতের এই মিলন শব্দহীন এক ভালোবাসার গল্পে পরিণত হলো। গাড়ি চালানোর কারণে সুখকর এই স্পর্শটা বেশি সময় ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। মৃদু হেসে আলতো করে হাতটি ছেড়ে দিয়ে আবার স্টিয়ারিং-এ হাত রাখলেন।
সামনে একটা মোড় আসতেই আলফাতুন আঙুল উঁচিয়ে পথ দেখালেন,
“এই যে দেখুন, এই রাস্তাটা রোহিতপুরের দিকে চলে গেছে।”
তমিজুদ্দিন গাড়িটি সেই ভেজা গ্রামীণ মেঠো পথের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন। বাইরে তখনো অবিরত বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। গাড়ির ভেতরে দুটি মানুষের জীবনে শুরু হলো এক নতুন, স্নিগ্ধ ও শৈল্পিক রূপকথায়। আলফাতুন গাড়ির কাচ দিয়ে বাইরের বৃষ্টির শব্দ শুনতে জীবনের হিসাব মেলাচ্ছে। প্রতিদিনই সে যেভাবে হিসাব মেলায়।
পাঁচ
কেরানীগঞ্জের রুহিতপুর এলাকার এক কোণে সকালের অঝোর ধারা বৃষ্টির ফাঁকফোকর মারিয়ে তখন হালকা মিষ্টি রোদের ম্রিয়-আলো এসে পড়েছে “ইসমত আলী খুদের ভাত” দোকানের চারপাশে। কাঠের বেঞ্চিতে, আর পেছন দিকটায় এ আলো তখনো পৌঁছুতে পারেনি। বাইরে তখনো আশ্বিনের মেঘভাঙা আকাশ। আবার বুঝি শুরু হবে অবিরত মুষলধারে বৃষ্টি। কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরের পথের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ইসমত আলী খুদের ভাত’ রেস্টুরেন্টটি ক্লদ মনের ক্যানভাস থেকে উঠে আসা এক টুকরো চিত্রকর্মের মতো মনে হলো। খাবারের রেস্টুরেন্টটা মূলত পুরোনো টিনের ঘর। ওপরের মরচে ধরা ঢেউ-খেলানো টিনের চালের খাঁজগুলো ভেদ করে, কিংবা আলগা জোড়াতালির ফাঁকফোকর গলে ভেতরের আবছা অন্ধকার চিরে আলোর রশ্মি এসে পড়ে এখানে। সেই আলো একঘেয়ে আলো নয়; তা হলো বৃষ্টি-ধোয়া আকাশ থেকে ফিল্টার হয়ে আসা ধূসর ও হলদেটে আলোর মিশ্রণ। বাতাসের আর্দ্রতায় ভেসে বেড়ানো ধূলিকণা, আর গরম ভাতের বাষ্পের কুণ্ডলী সেই আলোর রেখায় স্তরে স্তরে কাঁপছে। আলোর এই আনাগোনায় ঘরের ভেতরের কাঠের বেঞ্চি, মাটির মেঝে আর করোগেটেড টিনের বেড়ার ওপর আলো-ছায়ার এক অবিরাম ভাঙাগড়ার খেলা চলছে। বাইরের মেঘ যখন ঘনীভূত হয়, ভেতরের আলোটাও তখন সরষে ফুলের রঙের মতো ম্লান হয়ে আসে; আবার যখন মেঘের আড়াল থেকে সূর্যের আলো ক্ষণিকের জন্য উঁকি দেয়, তখন টিনের ফুটো দিয়ে আসা আলোকরশ্মিগুলো মেঝের ওপর জ্বলজ্বলে জলছাপের মতো ফুটে ওঠে। চোখ মেললে মনে হয়, আস্ত ঘরটাই যেন তরল আলো আর ছায়ার এক মায়াবী কুয়াশায় ভাসছে।
গাড়ির দরজা খুলে আলফাতুননেসা এবং তমিজুদ্দিন যখন টিনের ঘরটিতে এসে ঢুকলেন, তখনও মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। দুজনের শরীরই বৃষ্টির জলে ভেজা। ঠান্ডা বাতাসের একটা ঝাপটা তাদের স্পর্শ করে গেল। আলফাতুন তার পঞ্চাশোর্ধ্ব চপলতায় গাঢ় রঙের ভেজা শাড়িটা সামলাতে সামলাতে, হাতের তালু দিয়ে নিজের গাল ও কপালের বৃষ্টির পানি মুছছিল। তমিজুদ্দিন সাহেবও তার সাদা শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডলে জমে থাকা জলের বিন্দু হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। ঠিক তখনই, কোনো গৌরচন্দ্রিকা ছাড়াই, আলফাতুননেসা তমিজুদ্দিনের একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তার ভেজা শাড়ির সুবাস, আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আলফাতুন তার শাড়ির শুকনো আঁচলটা ডান হাতে তুলে নিলো এবং পরম মমতায়, অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তমিজুদ্দিনের মাথা ও কপাল মুছে দিতে লাগল।
তার হাতটির এই কোমল ওঠানামা আর সুতি শাড়ির আঁচলের উষ্ণ স্পর্শ তমিজুদ্দিনের শরীর পার হয়ে সোজা গিয়ে আঘাত করল তার স্মৃতির প্রাচীন কোঠরে। পঁয়ষট্টি বছর বয়সি এই প্রৌঢ়ের মুহূর্তে এসে মনে হলো, সময় যেন এক ঝটকায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর পেছনে ফিরে গেছে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার মৃত স্ত্রী কোহিনূরের মুখ। তাও প্রায় বছর দশেক আগের কথা। তখনো তমিজুদ্দিনের মাথায় রুপালি চুলের রেখা পড়েনি। সবেমাত্র তারা জীবনের প্রথম উপার্জনের অর্থ দিয়ে ‘অ্যালিয়েন’ মডেলের গাড়ি কিনেছিলেন। তমিজুদ্দিন সবে গাড়ি চালানো শিখছেন, স্টিয়ারিং ধরলে হাত সামান্য কাঁপে। সেই নতুন গাড়ির আনন্দ, আর এক বুক রোমাঞ্চ নিয়ে কোহিনূরকে পাশে বসিয়ে আরিচা ঘাট হয়ে রওনা হয়েছিলেন যশোরের পৈতৃক বাড়ির দিকে। ঠিক আজকের মতোই সেদিনও আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছিল। পদ্মার উত্তাল জলরাশি পেরিয়ে যখন তাদের গাড়িটি ফেরিতে ওঠে, তখন চারপাশ চাদরের মতো ঢেকে দিয়েছিল কুয়াশার ছায়া, অন্ধকার। দোতলা পেরিয়ে তিনতলার রেস্টুরেন্টটিতে পাশাপাশি দুটি চেয়ার নিয়ে বসেছিল। তখন তমিজুদ্দিনের চুলে, আর ঘাড়ে বৃষ্টির ছাট লেগে জল জমে ছিল। কোহিনূর ঠিক এই আলফাতুনের মতোই, একদম অমনি করেই তার সুতি শাড়ির আঁচলটা টেনে নিয়ে মাথা মুছে দিয়েছিল তমিজুদ্দিনের। সেই আঁচলের ওম আর আজকের এই আঁচলের স্পর্শের মধ্যে তমিজুদ্দিন কোনো তফাত খুঁজে পেলেন না। তাঁর বুকের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাস ও পরম প্রশান্তির ঢেউ একসাথে আছড়ে পড়ল।
ছয়
থেমে থেমে সারাবেলা জুড়েই বৃষ্টি হচ্ছিল। সাথে বাতাসের ঝাপটায় টিনের চালের ফাঁক গলে আসা রুপালি আলোটা এক মুহূর্তে উবে গেল। চারপাশটা এতটাই অন্ধকার হয়ে এল যে, মনে হচ্ছিল এ যেন প্রত্যন্ত কোনো গাঁয়ের বিদ্যুৎহীন ঘর, যেখানে মাত্রই একটা কুপিবাতি বা হারিকেন নিভে গেছে। সেই ম্লান অন্ধকারের মাঝে রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে রাখা ঝুলন্ত ফিলিপ বাতির শিখাটি দুলতে লাগল। দোকানে তখন অন্য কোনো লোকজনের ভিড় ছিল না। বৃষ্টির কারণে মেঠো পথ পুরো জনশূন্য। খুদের ভাতের দোকানের মালিক ইসমত আলী সবেমাত্র খাবারগুলো রান্না শেষ করে বড়ো বড়ো টিনের ঢালায় সাজিয়ে রেখেছেন। খাবারের ওপরে দেওয়া আছে জালি নেটের সুদৃশ্য ঢাকনা। সেই নেটের ছোট ছোট ছিদ্র গলে গরম ভাতের ভাপ, আর খাঁটি সরিষার তেলে রাঁধা শুঁটকি ভুনার স্বর্গীয় সুবাস পুরো ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগছিল ঢালার এক কোণে রাখা ডুবো তেলে ভাজা শুকনো মরিচ। গরম তেলের ছোঁয়ায় মরিচগুলোর গায়ের চড়া লাল রংটা বদলে গিয়ে গভীর, কালচে-লালচে, কোনোকটি খয়েরি আভা ধারণ করেছে। সেই ভাজা মরিচ থেকে বের হওয়া ঝাঁঝালো অথচ লোভনীয় সুবাস, আর পোড়া তেলের গন্ধ নাসিকারন্ধ্রে এসে এমনভাবে আঘাত করছিল যে, ক্ষুধার তৃষ্ণা এক মুহূর্তে দ্বিগুণ হয়ে যায়। চাক্ষুষ বর্ণে সেই মরিচগুলো যেন একেকটি জ্বলন্ত কয়লার টুকরোর মতো কাঠের টেবিলের ওপর দ্যুতি ছড়াচ্ছিল।
সাত
ইসমত আলী তাদেরকে খাতির করে একদম পেছনের কোনায় নিরিবিলি একটা কাঠের টেবিল দেখিয়ে দিলেন। আলফাতুননেসা এবং তমিজুদ্দিন সাহেব মুখোমুখি না বসে, পাশাপাশি বসলেন। বাইরে তখনো বৃষ্টির অবিরাম রিমঝিম শব্দ, আর ভেতরে একটা ফিলিপ বাল্বের মৃদু আলোর কাঁপন। প্লেটে গরম ধোয়া ওঠা খুদের ভাত, সেই কালচে-লালচে ভাজা মরিচ, আর বাটিতে কয়েক পদের ভর্তা সাজিয়ে দিয়ে গেলেন। খাবার খাওয়া তখনো শুরু হয়নি। ঠিক সেই নীরব মুহূর্তে, টেবিলের নিচের অন্ধকার অংশে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। আলফাতুননেসা তার শাড়ির নিচে থাকা নিজের ডান পা আস্তে করে বাড়িয়ে দিলেন। তমিজুদ্দিনের পায়ের গোড়ালির ওপর সে তার নিজের পা আলতো করে চেপে ধরলেন। সেই স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিমতা। পঞ্চাশ বছর বয়সি এক নারীর এই পরিণত চপলতা তমিজুদ্দিনের ভেতরের সমস্ত একাকিত্ব, আর মৃত স্ত্রীর স্মৃতির অবগাহনকে এক মুহূর্তে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। টেবিলের ওপরে তারা দুজনে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে রইলেন, যেন কিছুই হয়নি। টেবিলের নিচে দুটি পায়ের এই নিবিড় অবস্থান, বৃষ্টির শব্দের মাঝে তাদের শরীর ও মনের দূরত্বকে শূন্যে নামিয়ে আনে। তমিজুদ্দিন সাহেব পা সরিয়ে নিলেন না; বরং এক অনন্য প্রশ্রয়ে, জীবনের শেষ বিকেলের নতুন বসন্তকে মনে মনে মেনে নিয়ে আলফাতুনের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মৃদু হাসলেন। বাইরে তখনো অবিরত ধারায় রূপকথা লিখে চলছিল আশ্বিনের বৃষ্টি।









