সালেক উদ্দিনের দুটি অনুগল্প

সালেক উদ্দিন
০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:২৭আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:২৭

শেষ পর্যন্ত


— বহুদিন আগে আপনার একটি লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম।
— কতটা?
— এতটাই যে এত দ্রুত আপনার এত কাছে এসেছিলাম।
— কী লিখেছিলাম তাতে?
— ভালোবাসার কাছে কোনো প্রত্যাশা থাকতে নেই। ভালোবাসা প্রতিদান যা দেওয়ার এমনিতেই দেয়।
— আর?
— প্রত্যাশা এলে ভালোবাসা সরে যায়। প্রত্যাশা গভীর হলে ভালোবাসা ভেঙে যায়।
— বাহ, সুন্দর তো!
— আপনার মনে নেই?  
— মনে রাখার দরকার নেই।
— কেন?
— কারণ, এটাই আমার বিশ্বাস।
— আপনাকে ভালোলাগার আরেকটি কারণ ছিল।
— কী সেটা?
— আপনার মুখের শোনা গ্রীসের সেই চিত্রশিল্পীর গল্প।
— কোনটা?
— শিল্পীর আঁকা অষ্টাদশী রমণীর বস্ত্রহীন ছবি দেখে গ্রীসের সবাই অশ্লীল বলেছিল।
— হ্যাঁ , সে সময় যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করার দোষে শিল্পীকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল।
— আদালতে দাঁড়িয়ে শিল্পী বলেছিলেন, না তিনি কোনো অশ্লীল ছবি আঁকেননি। তাই না?
— তোমার তো বেশ মনে আছে, দেখছি।
— সেই ছবির এক পায়ে মোজা এঁকে দিয়ে শিল্পী বলেছিলেন, "চিত্রটি আগে ছিল প্রকৃতি, এখন অশ্লীল হলো"।
— তুমি গল্পটা বুঝেছিলে?
— মনে হয়েছিল বুঝেছি।


— এত রাতে ছাদে কী করছেন কবি? 
— চাঁদ দেখছি। 
— তুমি?
— হ্যাঁ, আমি কাব্য। আমি প্রকৃতি।
— আমি কবি। সেই শিল্পী।
— এবার বলুন , কে বেশি সুন্দর—জ্যোৎস্না, না আমি? উত্তর দিচ্ছ না কেন?
— তুমি।
— জ্যোৎস্নার চেয়েও?
— হ্যাঁ। শুধু তুমি।
— আপনার চোখ আকাশ থেকে নেমে এলো কেন?
— কাব্য...
— শেষ পর্যন্ত মোজাটা পড়িয়ে দিলেন কবি?


কমলা বিক্রি হয়নি


— নাম?
— নাম কমলা ছিল।
— ছিল?
— যে নামে কেউ ডাকে না, একদিন সে নাম অতীত হয়ে যায়।
— কখন জীবনকে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়েছিল?
— গার্মেন্টসে চাকরি করতাম তখন।
— কেন?
— তখন জীবন ছিল, ভবিষ্যৎ ছিল।
— পেয়েছিলে সেই ভবিষ্যৎ?
— পেয়েছিলাম। অন্তত তাই ভেবেছিলাম।


— তাকে ভালোবেসেছিলে?
— এতটাই যে সন্দেহ করতে ভুলে গিয়েছিলাম।
— তারপর?
— এক রাতে বুঝলাম, বিশ্বাস আর মালিকানা এক জিনিস নয়।
— কীভাবে?
— যে মানুষ আমার হাত ধরে সংসার বানিয়েছিল, সেই মানুষই আমাকে বিক্রি করে বিদেশ চলে গেল। কমলা থেকে সুইটি হয়ে গেলাম।
— সেদিন সবচেয়ে বেশি কী হারিয়েছিলে?
— মানুষ সম্পর্কে আমার সরল ধারণা।
— কাঁদছিলি?
— প্রথমে।
— পরে?
— যখন বুঝলাম কান্না কাউকে ফিরিয়ে আনে না, তখন থেমে গিয়েছিলাম।


— পতিতালয়ের সবচেয়ে কঠিন রাত কোনটা ছিল?
— প্রথম রাত না।
— তবে?
— যেদিন দেখলাম আর কষ্ট হচ্ছে না।
— কেন?
— কারণ মানুষ সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
— এটা কি শক্তি?
— কখনো কখনো অভিশাপ।
— তখন কি নিজেকে সুইটি ভাবতে শিখেছিলে?
— হ্যাঁ।
— কমলা?
— সে ভেতরে ছিল।


— আবার ভালোবাসলি কেন? 
— সে অন্যদের মতো ছিল না।
— কীভাবে বুঝলি?
— মনে হতো সে আমার শরীরকে নয়, আমাকে চাইত।
— ভুল হয়েছিল?
— ডুবন্ত মানুষ সাঁতার শেখে না, ভাসার মতো অবলম্বন খোঁজে।
— সে কি তোকে বাঁচিয়েছিল?
— একদিন গভীর রাতে অন্ধপল্লী থেকে আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল অন্য এক শহরে। 
— তারপর?
— আবার সংসার।
— ভয় লাগেনি?
— লেগেছিল।
— তবু?
— সব মানুষ এক নয়।
— এই বিশ্বাসেই পৃথিবী এখনো টিকে আছে।
— সুখী ছিলি?
— এবার সুখকে চিনতে শিখেছিলাম।


— সেবার প্লেনে প্রথম উঠেছিলি, তাই না?
— হ্যাঁ।
— কেমন লেগেছিল?
— জানালার বাইরে মেঘেরা ছুটছিল। মনে হচ্ছিল জীবনও এমনই।
— তারপর তোর দ্বিতীয় স্বামী তোকে কোথায় নিয়ে গেল?
— ভিনদেশের একটা হাসপাতালে।
— হাসপাতাল?
— নামের।
— মানে?
— সব জায়গার নাম তার কাজের পরিচয় দেয় না।
— সন্দেহ হয়নি?
— না।
— কেন?
— সেটা আমার বিশ্বাসের রোগ।


— কখন বুঝলি?
— যেদিন দেখলাম, আমার শরীরকে তারা আমার চেয়েও বেশি মূল্য দেয়।
— ভয় পেয়েছিলি? 
— না।
— কেন?
— যাকে দুবার বিক্রি করা হয়েছে, তার কাছে ভয় নতুন কিছু নয়।
— তকে প্রথম কে বিক্রি করেছিল?
— স্বামী।
— দ্বিতীয়বার?
— স্বামী।
— কাকতালীয়?
— হয়তো।
— তাহলে ভালোবাসা কী?
— একটা দরজা।
— আর বিশ্বাস?
— সেই দরজার চাবি।
— দুজনের কেউই কি ঢোকার যোগ্য ছিল?
— মানুষ সাধারণত সেটা খুব দেরিতে শেখে।


— এই হাসপাতালটা যে তোকে কিনে নিয়েছে, বুঝতে পেরেছিস তো?
— পেরেছি।
— কখন?
— যখন শেষ মানুষটাও হারিয়ে গেল।
— হারিয়ে যায়নি, পালিয়ে গেছে।
— হুঁ।
— এখন ওরা তোর কী করবে জানিস?
— না।
— তোর ভেতরের যা যা দরকার, সেগুলো অন্যদের বাঁচিয়ে রাখবে।
— আর আমি?
— প্রয়োজন শেষ হলে বিকৃত জিনিস ফেলে দেওয়া হয়।


— সুইটি?
— আপনি আবার কে?
— ডাক্তার।
— কিন্তু আমার আগে কেউ এসেছিল নাকি?
— কমলা এসেছিল।
— কোথায় সে? 
— আমার ভেতরে।  
— ও, সেই কথা।
— আপনিও কি আমাকে কিনেছেন? 
— না। তোমার শরীরের কিছু অংশের দাম দিয়েছি।
— কিন্তু কমলা বিক্রি হয়নি।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শ্যামনগরবাসীর নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিতে হাইকোর্টের রুল, অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ
শ্যামনগরবাসীর নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিতে হাইকোর্টের রুল, অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ
শরণার্থী থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার, ওয়ানডে অভিষেকের অপেক্ষায় জাইনুল্লাহ
শরণার্থী থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার, ওয়ানডে অভিষেকের অপেক্ষায় জাইনুল্লাহ
কেরালার নাম বদলে দিচ্ছে মোদি সরকার
কেরালার নাম বদলে দিচ্ছে মোদি সরকার
হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে ইসি, দেশে এখন ভোটার কত
স্থানীয় সরকার নির্বাচনহালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে ইসি, দেশে এখন ভোটার কত
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
নতুন দায়িত্বে ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
নাম বদলাচ্ছে র‌্যাব, পুরো নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে এক বাহিনীর কাছে
নাম বদলাচ্ছে র‌্যাব, পুরো নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে এক বাহিনীর কাছে
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা
সাপে কামড়ের অ্যান্টিভেনম না দিয়ে অন্যত্র রেফার, পথে অ্যাম্বুলেন্সে বিএনপি নেতার মৃত্যু
সাপে কামড়ের অ্যান্টিভেনম না দিয়ে অন্যত্র রেফার, পথে অ্যাম্বুলেন্সে বিএনপি নেতার মৃত্যু
প্রাইভেট পড়ালেই এমপিও বাতিল হবে শিক্ষকদের: প্রতিমন্ত্রী পুতুল
প্রাইভেট পড়ালেই এমপিও বাতিল হবে শিক্ষকদের: প্রতিমন্ত্রী পুতুল