‘‘বইয়ের ছোট ছোট চিত্রগুলিও আমাকে ধান্দায় ফেলে দিয়েছে। দেখছি অনেক মেয়েদের শরীরে কাপড় প্রায় নেই। ভালো করে তাকাতে পারছি না, কারণ ওইসব ছবির মতো কোনো দৃশ্যই আমি পূর্বে কোথাও দেখিনি। কিছু কিছু ছবিতে যুগল’’
এ কথাতো সত্য, মানুষ পৃথিবীতে আসার পূর্ব থেকেই ব্যারিয়ার ভেঙে ফেলার দিকে ঝুঁকেছিল। নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি দূর্ণিবার আকর্ষণ অনুভব করেছিল। পৃথিবীর আদি মানব আদম ও হাওয়ার গন্দম ভক্ষণের পেছনেও ছিল ওই নিষেধের আকর্ষণ। অর্থাৎ যা-কিছু বারণের পাঁচিলে ঘেরা, তাতেই থাকে আকর্ষণের প্রাণভোমরা।
বয়স যখন অল্প, তারুণ্যের কুশিপাতাগুলো জীবনের দিকে উঁকিঝুঁকি মারছে–তখন আড়াল-আবডাল নিয়েই কৌতুহল তৈরি হয়। অবশ্য অনেক সময় ওই মোহ তৈরির পূর্বেই নিষিদ্ধ বস্তু ভক্ষণ করা হয়ে যায়। নিজের অজান্তেই কোনো কোনো মানুষকে নিষেধের কারাগারে বন্দি হয়ে যেতে হয়। সেভাবেই জীবনের আলো-আঁধারি ভালো করে চেনার আগেই আমিও খেয়ে ফেলেছিলাম গন্দম বৃক্ষের পরিপক্ব ফল। দেখে ফেলেছিলাম পৃথিবীর আদিমতম মায়াজালের রূপটি।
আমাদের বেড়ে উঠবার কালে এতকিছু তো নাগালের ভেতর ছিল না। জীবন-যাতনা-একাকীত্ব থেকে পরিত্রাণের আশায় আমরা ছিলাম বইপোকা। অন্যের লেখা জীবন পড়ে পড়ে আমরা নিজেদের জীবনের ক্ষত ভুলতে চাইতাম। অবশ্য ওই কাজ করা ছাড়া আমাদের সন্মুখে দ্বিতীয় কোনো পথ ছিল না।
এই কালে তো দুই আঙুলের ভিতর হাজারটা টিভি চ্যানেল। পাঁচ আঙুলের ভিতর গুগুল আর ইন্টারনেট। আবালবৃদ্ধবণিতার হাতে সেলফোন– মহামারী আকারে। অথচ আমাদের কালে দুই-চারটা বনেদি-অফিসে আর উচ্চবিত্তদের সংসারে এনালগ ফোনের প্রচলন ছিল। ফলে আমাদের একাকীত্ব, ভালোলাগা যতকিছু মেটাতে হতো বই পড়ে। কাগজে ছাপা কালির অক্ষরগুলো ভিজিয়ে দিতাম চোখের জলে।
আমি ছিলাম তাড়িখোরদের অনুরূপ বইখোর। হাতের কাছে যে বই-ই পেতাম গোগ্রাসে খেয়ে ফেলতাম। যেসব বাসায় বইয়ের সামান্য কালেকশনও থাকত সেসব বাসায় আমার উপস্থিতি ছিল সন্দেহজনক। কারণ বা অকারণেই ওখানে যেতে চাইতাম আমি।
আমি যে মেয়েটির সাথে ইশকুলে যেতাম ওদের বাসাটা ছিল বইয়ের আড়ত। রোজ রেডি হয়ে ওদের বাসায় যেতাম। কোনো কোনো দিন ও ইশকুল কামাই দিত। আর সেদিন হতো আমার পোয়াবারো। আমি আমার একঘেয়ে, নিরানন্দময় আর কঠিন শাসনের বাসায় ফিরে যেতাম না। লেগে যেতাম বই পড়তে, ঢুকে যেতাম আমার স্বপ্নের দুনিয়ায়। এইভাবেই আমি ওদের ছোট লাইব্রেরির প্রায় সব বই পড়ে ফেললাম। আমি ছিলাম বইয়ের তেলাপোকা। সর্বভুক জাতীয় প্রাণী। সর্বশেষ যে বইটি আমি পড়ার জন্য নিলাম সেটা ঢাউস মোটা এক বই। বইয়ের ওপরে লেখা-‘সহস্র এক আরব্য রজনী’।
আমার বয়স তখন আট কি নয়, আমি পড়তে শুরু করলাম এক অত্যাচারি বাদশা শাহরিয়ারের গল্প। উজির কন্যা শেহেরজাদের গল্প। যে বাদশা প্রতিদিন একজন করে নারীকে বিয়ে করে, আর রজনী পোহালেই তার মৃত্যুদণ্ড দেয়। এভাবে রাজ্য প্রায় নারীশূন্য হয়ে পড়ল। আর শাহরিয়ারের বিয়ের জন্য উপযুক্ত কুমারী-কন্যার আকাল দেখা দিল। নিজের প্রাণ বাঁচাতে উজির চোখের জল ফেলতে ফেলতে নিজকন্যার সাথে বাদশার বিয়ে দিল। পরদিন জল্লাদ অপেক্ষমান অবলার প্রাণ হরণের জন্য। কিন্তু বাদশা শাহরিয়ার নাকি তাঁর মতি বদলেছেন। শেহেরজাদের মস্তক তার পরের দিন প্রভাতে ছিন্ন করা হবে।
শাহরিয়ারকে তুখোড় বুদ্ধিমতি শেহেরজাদ বলতে শুরু করেছে এক গল্প এবং অতি কৌশলে ছড়িয়ে দিচ্ছে টানটান উত্তেজনা। শাহরিয়ার একটা পর একটা গল্প শুনে চলেছেন আর আমিও সমান উত্তেজনায় উল্টে চলেছি ওই ঢাউস বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। কিন্তু মাঝেসাঝেই থমকে যাচ্ছি স্বামী-স্ত্রীর প্রসংগ এলে। ধাক্কা খাচ্ছি বইয়ে সন্নিবেশিত চিত্রাবলী দেখে। কারণ ওইসব চিত্র আমার পূর্ব পরিচিত নয়।
আমি বুঝতে পারছি না আমার পড়া ‘রাশিয়ার রূপকথা’ বা ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বা ‘এক যে ছিল রাজকুমারী’ বা ‘সোনার ডালে রুপার পাতা’ বইগুলির সাথে কেন এ বইয়ের কোনো মিল নেই। দেও-দৈত্য আছে, রাক্ষসরাও আছে, আছে রাজা-রানী-মন্ত্রী-নাজির-সেপাই কিন্তু তাদের কাজ-কর্ম কেমন যেন অপরিচিত লাগছে!
আমি ভয়ে ভয়ে বোঝার চেষ্টা করি কী বই এটা?
প্রথম দিককার পাতাগুলি উল্টালে দেখতে পাই নিচে লেখা রয়েছে– প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ এ কথাটার সঠিক অর্থ কি? আমি বুঝতে পারি না। তবে ভয় লাগে, কারণ বই পড়ার মতো গর্হিত অপরাধ আমি করে চলেছি। আমার বাসার কেউ দেখলে আমাকে রাম ধোলাই দিয়ে দেবে। আমার আব্বার হাতে বেত রেডিই থাকে।
তবে ঢাউস বইটার সব গল্প আমি না বুঝলেও আহ্লাদিত হয়েই পড়তে থাকি। কারণ এই বইটার গল্পগুলি সহসা ফুরিয়ে যায় না। গল্প না-ফুরোবার আনন্দে আমি বিভোর থাকি। পড়তে পড়তে ফের খটকার ভিতরে ঢুকে পড়ি– এক রানী রাজাকে না জানিয়ে প্রাসাদের বাইরে গিয়েছে। আর হাবসি ক্রীতদাস রানীকে বেকায়দায় পেয়ে চুমু খেতে চেয়েছে। রানী প্রাণে বাঁচার জন্য রাজি হয়ে যায়। আর চুমু খেতে খেতে সেই ক্রীতদাস রানীর গালে জোরে কামড়ে দেয়। রানী চুমুর দাগ লুকোবার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। আমি ভেবে পাই না চুমু খাওয়ার সাথে কামড় কীভাবে যুক্ত হয়? কাউকে জিজ্ঞেস করব সে উপায় তো কোনো ভাবেই নাই! তবে এটুকু বুঝি চুমু খাওয়া খারাপ কাজ। নইলে রানী কেন রাজি হতে চাচ্ছিল না? আর কামড়ে দেয়া আরও ভয়াবহ খারাপ কিছু, নইলে রানী কেন তা লুকোবার জন্য অস্থির হলো?
এদিকে বইয়ের ছোট ছোট চিত্রগুলিও আমাকে ধান্দায় ফেলে দিয়েছে। দেখছি অনেক মেয়েদের শরীরে কাপড় প্রায় নেই। ভালো করে তাকাতে পারছি না, কারণ ওইসব ছবির মতো কোনো দৃশ্যই আমি পূর্বে কোথাও দেখিনি। কিছু কিছু ছবিতে যুগল। কিন্তু আমি স্পষ্ট করে তাদের দেখতে চাচ্ছি না। আমার কেবলই মনে পড়ছে আব্বা যদি জানতে পারে আমি নভেল (তখন গল্প বা উপন্যাসের যে কোনো বইকেই আমাদের পরিবারের নারীরা বলত নভেল)পড়ছি তাহলে আমার শরীরে নীল দাগের বন্যা বয়ে যাবে। যে নীল দাগ দেখে আমি প্রায়ই কাঁদতে কাঁদতে রাত ভোর কর দেই।
অনেক অনেক দিন পরে বুঝেছিলাম কী বই আমি পড়ে ছিলাম। আমি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছি তখন ওই বইটাই আরও সুদৃশ্য মোড়কে আমাকে আমার প্রেমিক উপহার দিয়েছিল। আর বইয়ের উপরে অপূর্ব সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে দিয়েছিল কত শত রজনী গত হয়েছে তার সাথে আমার প্রেম হবার পর!
তবে এই বই হাতে পেয়ে আমার গন্দম ভক্ষণের অনুভূতি হয়নি। যেমন পূর্বে হয়েছিল। আমার বালিকা চোখের সন্মুখে অর্ধনগ্ন যুগল আমাকে কী রকম কুহকের ভিতর ঠেলে দিয়েছিল। ভাবতে ভাবতে আমার ছোট্ট মাথার ভিতর গণ্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছিলাম, চুম্বন কেন লুকিয়ে খেতে হয় কিংবা কেউ কামড়ে দিলে রানী কেন তা লুকিয়ে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে! যদিও আমি বইটা পড়ছিলাম আমার বদরাগী আব্বার চোখের আড়ালে, কিন্তু ত্রাস আমাকে তাড়িয়ে ফিরছিল– আব্বা যদি জানে, যদি কোনোভাবে জানতে পারে, তাহলে পিটিয়ে আমার পিঠের ছাল তুলে নেবে নির্ঘাত। নভেল পড়বার অপরাধে আরও কত অত্যাচার যে বরাদ্দ আছে, ভেবে আমি বারংবার শিউরে উঠেছিলাম।
বিশেষ সংখ্যার আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন-







