প্রশ্নের মুখে পশ্চিমাদের শ্রেষ্ঠত্ব

করোনা ও জনস্বাস্থ্য প্রসঙ্গে শাহাদুজ্জামান

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ইলিয়াছ কামাল রিসাত
১৯ মে ২০২০, ১৩:০০আপডেট : ১৯ মে ২০২০, ১৩:৪৮

[শাহাদুজ্জামান বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। গল্প-উপন্যাস তার কাজের প্রধান ক্ষেত্র হলেও গবেষণা, অনুবাদ, ভ্রমণ এবং প্রবন্ধও লিখেছেন। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং নেদারল্যান্ডসের আমস্টার্ডাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘদিন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যুক্ত আছেন।] করোনা ও জনস্বাস্থ্য প্রসঙ্গে শাহাদুজ্জামান

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে সময় দেবার জন্য। একটা বিষয় পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারছি না। আপনি এ পর্যন্ত কথাসাহিত্যিক ও চিন্তক হিসেবে অনেক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞানী হিসেবে বাংলা ভাষায় সাক্ষাৎকার বোধহয় এই প্রথম দিচ্ছেন। একাডেমিশিয়ান হিসেবে বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল কিংবা ওয়েবসাইটে হয়তো পেশাগত কারণে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, কিন্তু বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় আপনার লেখক পরিচয়ই সবসময় দেখে এসেছি। সেই সূত্রে বলছি, চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞানী হিসেবে এই প্রথম সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন, সে ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই। এটা কি করোনা মহামারির ‘অভূতপূর্ব’ সময়ের জরুরি পরিচয়, নাকি আরও অন্য অনেক কিছু?

শাহাদুজ্জামান : জনস্বাস্থ্য আমার কাজের বিষয়। এটা সত্য, আমি যে সাক্ষাৎকারগুলো দিয়েছি বিভিন্ন সময়ে, সেগুলো লেখক হিসেবেই। জনস্বাস্থ্য নিয়ে, নৃ-বিজ্ঞান নিয়ে অনেক নিবন্ধ লিখেছি, কলাম লিখেছি, বইও লিখেছি; কিন্তু সাক্ষাৎকার সে অর্থে দেইনি। সে হিসেবে তুমি ঠিকই বলছো যে, চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞানী হিসেবে সম্ভবত এটাই আমার প্রথম সাক্ষাৎকার। এবং এই করোনা মহামারির সূত্রেই জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক ও চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞানী হিসেবে আমার পরিচয় একটু প্রধান হয়ে উঠেছে। আমি বাংলাদেশের করোনা মহামারি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা এরই মধ্যে শুরু করেছি।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : আপনি বিশ্বস্বাস্থ্য পড়াতে গিয়ে পৃথিবীর মহামারির ইতিহাস পড়ান। সেই সূত্রে কোভিড-১৯-এর সঙ্গে ইতিহাসের অন্যান্য মহামারির মিলগুলো কোথায়? এই মহামারি কোন কারণে একেবারেই ভিন্ন?

শাহাদুজ্জামান : আমি যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য বিষয়ে যে কোর্স পড়াই, মহামারির ইতিহাস তার অন্তর্ভুক্ত। হ্যাঁ, সত্যি বলতে এই মুহূর্তে যে মহামারি চলছে তার সঙ্গে ইতিহাসের অন্যান্য মহামারির অনেক মিল-অমিল দুটোই আছে। যদি খুব বড় কিছু মহামারির কথা বলি, তার মধ্যে একটি হচ্ছে ১৩-১৪ শতকের ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা ‘প্লেগ মহামারি’, যাতে ইউরোপের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেটি পুরো মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ হয়ে একেবারে আফ্রিকা পর্যন্ত যে বাণিজ্য চলত, মানে সিল্করুটের পথ ধরে এই মহামারিটি বিস্তৃত হয়। মূলত ইঁদুর থেকে—ইঁদুরের শরীরে একটি বিশেষ জীবাণু ঠিক নয়, একটি পতঙ্গ, যেটি মানুষের শরীরে আসে—প্লেগ ছড়ায়। অনেক গবেষণা হয়েছে এটা নিয়ে। সে সময়কার অর্থনীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। এর কিছুকাল আগে মঙ্গোলিয়ান হালাকু খান, চেঙ্গিস খান—এরা পুরো মধ্য এশিয়া যুদ্ধ করে দখল করেছিল। সে সময় বেশ বড় একটা খরা হয় এবং সে খরার কারণে বহু ইঁদুর, বহু মেঠো ইঁদুর শহরের ভেতর ঢুকে যায়। তখন মানুষের শরীরে জীবাণুটি সংক্রমিত হতে শুরু করে এবং ঐ সিল্করুট দিয়ে ইউরোপের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এটা একটা ভয়ঙ্কর ঘাতক মহামারি হিসেবে এখনো চিহ্নিত হয়ে আছে। এর পরে ১৮ এবং ১৯ শতকে বেশ ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু কলেরা মহামারি হয়েছে, বিশেষ করে ইউরোপে। সেই মহামারির সূত্রপাত এই পাক-ভারত উপমহাদেশে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বাংলা অঞ্চল থেকে হয়েছে। তখন ঔপনিবেশিক কাল এবং তাদের সৈন্যদের মাধ্যমে রোগটা ছড়িয়েছে। সেসময় রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ হয়েছে বৃটেনের, ক্রিমিয়ার। এই যুদ্ধের পথ ধরে এবং ঔপনিবেশিক সৈন্যদের মাধ্যমে এটি ভারত থেকে ইউরোপ পর্যন্ত, সেই প্যারিস হয়ে ইংল্যান্ডে পর্যন্ত পৌঁছায়। এছাড়া সে সময় এই অঞ্চলে স্মলপক্স বা গুঁটিবসন্ত মহামারি হত। তারপরে বিংশ শতাব্দীর ১৯১৮ এবং ১৯২০ সালে স্প্যানিশ ফ্লু নামে আরেকটা বড় মহামারি হয়। তাতে ইউরোপ-সহ অন্যান্য অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। সে সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল; যুদ্ধ-জাহাজ থেকে আমেরিকা ও ইউরোপে সৈন্যদের মাধ্যমে এক দেশের থেকে আরেক দেশে রোগটি ছড়ায়।

এখন আমরা যদি কোভিড-১৯-এর সাথে তুলনা করি, তাহলে কতগুলো জিনিস কমন দেখা যায়। কথা হচ্ছে রোগ যেমন একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, তেমনি মহামারি একটা সামাজিক অভিজ্ঞতা। ফলে মহামারির অভিঘাত হয় সামাজিকভাবে। সব মহামারির প্রথমেই একটা ভয়ংকর আতঙ্ক তৈরি হয় পুরো সমাজের ভেতরে, কারণ এটা যে ব্যাপকতা নিয়ে আসে এবং যে ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে তাতে পুরো সমাজের ভেতর একটা আতঙ্ক তৈরি হয়। এবং সবার ভেতরে একটা প্রশ্ন, প্রতিটা মহামারিতেই তৈরি হয় যে, এটার উৎপত্তি  কোথায়, কারা এটা ছড়াল? এরকম একটা পরিস্থিতিতে এই প্রশ্নগুলো সামনে চলে আসে। এবং যেটা দেখা গেছে যে, প্রায় সব মহামারির সময় ক্ষমতাবানরা, যারা প্রান্তিক মানুষ বা যারা ক্ষমতাহীন তাদেরকে এর জন্য দায়ী করেছে। মহামারির জন্য অপবাদ দিয়েছে, সামাজিকভাবে নিগ্রহ করেছে, স্টিগমাটাইজড যেটাকে বলি আমরা। ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর সময়ে সেই ১৩শ’ ১৪শ’ সালে ইহুদিদের দায়ী করা হয়েছে। বহু ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছে সে সময়ে। তারপরে যেটা দেখা গেছে যে, ঔপনিবেশিক কালে কলেরা মহামারির সময়ে ব্রিটিশরা দায়ী করেছে ভারতীয়দের জীবন-যাপন, তাদের মতে নোংরা জীবন-যাপন এবং বিশেষ করে ভারতবর্ষে তখন বড় বড় তীর্থ হত সেই তীর্থস্থানগুলোকে। তখন নানা রকম আইন করা হয়েছে, তীর্থস্থান বন্ধ করা হয়েছে, মানুষকে নিগ্রহ করা হয়েছে এবং বিশেষ করে দরিদ্র মানুষদের দায়ী করা হয়েছে। সেটা ইউরোপেও হয়েছে। ইউরোপে যখন এটা পৌঁছায় তখন এর জন্য দায়ী করা হয়েছিল দরিদ্রদের এবং তাদেরকে শহর থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, শহরের অনেক জায়গায় তাদের ঢোকা নিষেধ ছিল, বাজারে অনেক কিছু স্পর্শ করা তাদের নিষেধ ছিল। সে সময় সামাজিক ব্যবস্থাগুলো ভেঙে পড়ে। সমাজের ভেতর নানা রকম অসন্তোষ তৈরি হয়, ক্ষোভ তৈরি হয়। গত শতাব্দীর মহামারির সময় অনেক বিপ্লব বিদ্রোহ ঘটেছে। মহামারির কারণে সাধারণ মানুষ, গরিব মানুষ নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছিল, তা নিয়ে নানা রকম ষড়যন্ত্র-তত্ত্বও তৈরি হয়। এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ধনী ও ক্ষমতাবানরা আসলে গরিবদের হত্যা করার জন্য এই অসুখটা তৈরি করেছে। বঞ্চিত মানুষের বিদ্রোহ হয়েছে বৃটেনে, হাঙ্গেরিতে।

তো আমরা যদি এখন কোভিড-১৯-এর সময়েও দেখি, কিছু ব্যাপারে মিল তো আছেই। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, স্বাভাবিকভাবেই শুরু থেকে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, আবার শুরু থেকেই খোঁজা হচ্ছে কে এটার জন্য দায়ী? আমেরিকা যেমন শুরুতেই এর জন্য চীনকে দায়ী করেছে। নিঃসন্দেহে চীন থেকে এটার উৎপত্তি হয়েছে, কিন্তু চীনকে তারা নানা রকম অপবাদ দিয়েছে। ‘চাইনিজ ভাইরাস’ বলেছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে করে চীনের মানুষদের প্রতি এক ধরনের স্টিগমা তৈরি হয়েছে ইউরোপে। এখানে ইউকে-তে, অনেক চীনা শিক্ষার্থী আছে। তারা নানা রকম ‘রেসিয়াল অ্যাটাকে’র মুখোমুখি হয়েছে করোনাভাইরাসের সময়ে। তো এই আতঙ্ক, সঙ্গে সঙ্গে স্টগমাটাইজ করা, দায়ী করার প্রবণতাগুলো একই রকম। আবার সব সময় একটা ষড়যন্ত্র-তত্ত্বও কাজ করেছে। এই করোনা মহামারির সময়েও এই ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব বেশ চালু ছিল। ইনিশিয়ালি এটা কি ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয়েছে কি-না, চীনারাই তৈরি করেছে না-কি আমেরিকানরা করেছে এবং সেটা চীনে ছড়িয়ে দিয়েছে, এসব কথা হয়েছে। এমনকি ইরান এবং বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকায় এবং তার প্রধানরাও সরাসরি ষড়যন্ত্রের কথাটা বলেছেন।

এছাড়া যেটা হয় যে, মহামারির সময়ে সমাজে অনেক পরিবর্তন ঘটে। সেটা ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর সময়ও হয়েছে। তখন চার্চের অনেক ক্ষমতা ছিলো। কিন্তু দেখা গেছে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নিয়ে চার্চ কোনো উত্তর দিতে পারেনি, মানুষকে কোনো আশ্রয় দিতে পারেনি, সান্ত্বনা দিতে পারেনি এবং এটার কোনো নিরাময় দিতে পারেনি। চার্চের উপরে মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাসে অনেকটা ধস নেমেছিল। যে কোনো রোগের জন্য তখন লোকে স্পিরিচুয়াল কারণ খুঁজতো, ঈশ্বরের উপর মানুষ বিশ্বাস করত, কিন্তু এই ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর পরে মানুষ বাস্তব জীবনে মানুষের শরীরে কী সমস্যা আছে সেটা বোঝার চেষ্টা করেছে। ঐ রকম সময়ে তখন ‘বডি ডিসেকশন’ শুরু হয়। তো অনেক সমাজতাত্ত্বিক বলেছেন যে, এই যে মধ্যযুগে ইউরোপে আলোকায়ন যেটাকে বলে ‘এনলাইটেনমেন্ট’ তৈরি হয়েছে সেটার একটা সূত্রপাত ঘটে এই প্লেগের কারণে। তখন মানুষের যুক্তি ও বিজ্ঞানের উপর ভরসা করার সূত্রপাত হয়। কলেরা মহামারির সময়ও বিরাট পরিবর্তন হয়েছে নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে, ইউরোপের, বিশেষ করে যে সুয়ারেজ সিস্টেমে, তারপরে বিভিন্ন নেইবারহুড, ধনীদের নেইবারহুড, গরিবদের নেইবারহুড আলাদা হয়ে যাওয়া। শহরের পুরো স্ট্রাকচার চেঞ্জ হবার পেছনে কলেরা মহামারির বড় ভূমিকা আছে। কারণ কলেরা মহামারির কারণে তখন বিরাট হাইজিন কমিটি হয়, হাইজিন কনফারেন্স হয়, গ্লোবাল কনফারেন্স হয়, বিশেষ করে ধনী দেশগুলো মিলে সেটি করে। তো এভাবে পরিবর্তনগুলো ঘটেছে। এমনকি বলা যায় যে, নতুন মেডিকেল ডিসিপ্লিনও হয়েছে, যেমন পাবলিক হেলথ। মেডিক্যাল সায়েন্স যখন একটা উচ্চ শিখরে ছিল এবং তারা মনে করছিল যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে তারা পৌঁছে গেছে এবং তারা অনেকটা মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। একটা সুন্দর মৃত্যু তারা নিশ্চিত করছে। হাসপাতালের ভেতরে সুন্দর বিছানায় মৃত্যু ঘটছে, যেখানে এ কলেরার মতো একটা বর্বর ধরনের এবং তাদের মতে বর্বর দেশ থেকে আসা একটা রোগ, যা তাদের সেই বুর্জোয়া আভিজাত্যবোধকে আঘাত করে। বলা যায় যে নিজেদের কলোনিয়াল যে প্রাইড সেটার উপর একটা আঘাত আসে। কিন্তু প্রচলিত মেডিকেল সাইন্স এর উত্তর দিতে পারেনি, সে সময় পাবলিক হেলথের ধারণাগুলো তৈরি হয়।

কলেরা মহামারির কারণে তখন প্রথম জন স্নো একটা গবেষণা করেছিলেন যে, কীভাবে লন্ডনের একটা রাস্তার টিউবওয়েল থেকে কলেরা ছড়াচ্ছে। বলা যায় যে সেটা জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রথম গবেষণা। এভাবে নতুন ডিসিপ্লিন হয়েছে, ইকোনমিতেও পরিবর্তন এসেছে। ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর পরে বহু মানুষ মরে যাওয়ায় কৃষিভিত্তিক ইউরোপের অর্থনীতিতে ধস নামে। তখন স্বল্পসংখ্যক কৃষক বেঁচে ছিলেন এবং ফলে ‘ব্লাক ডেথ’-এর পর কৃষকদের মজুরি বেড়ে গিয়েছিল, কারণ অল্পসংখ্যক কৃষক বেশি মজুরি দাবি করতে পারতেন। তাদের হাতে এভাবে পয়সা এলো। এসব কারণে একটা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে তখন। তো এখন কোভিড-১৯-পরবর্তী সমাজে কী ধরনের পরিবর্তন হবে এ মুহূর্তে আমরা ঠিক বলতে পারছি না। কিন্তু ইকোনমিতে একটা বিরাট ধস তো অলরেডি নেমে গেছে, ঠিক কীভাবে এটার উত্তরণ ঘটবে এবং সে ক্ষেত্রে সমাজের ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান আরও বাড়বে কি-না সেটা থেকে অসন্তোষ তৈরি হবে কি-না, বিদ্রোহ হবে কি-না, ক্ষোভ তৈরি হবে কি-না, বোঝা যাচ্ছে না।

নতুনভাবে আমাদের জীবন-যাপনের একটা বড় পরিবর্তন হচ্ছে নিঃসন্দেহে। এই যে সারা পৃথিবী লকডাউন থেকেও কানেক্টেড হচ্ছে অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে। তো কোভিড-উত্তর সমাজেও হয়তো অনলাইন যোগাযোগের মাত্রাটা অনেক বেড়ে যাবে, আমাদের ইউনিভার্সিটি অনলাইন টিচিং-এ চলে গেছে। আগের চেয়ে হয়তো অনলাইন টিচিং একটা বড় বিকল্প হিসেবে দাঁড়াবে। বহু মানুষ বাসা থেকে অফিস করছে। তো এর পরেও, কোভিড-উত্তর সময়েও হয়তো দেখা যাবে যে, বাসা থেকে অনেক কাজ করা যায় সুতরাং অনেকে হয়তো বাসা থেকে কাজ করার ব্যাপারে আরও বেশি আগ্রহী হবেন এবং অনেক অর্গানাইজেশনও হয়তো চাইবেন বাসা থেকে কাজ করলে যদি কাজ হয় হোক। মেয়েদের জন্য সেটা বিশেষভাবে সুবিধা কারণ অনেক মেয়েদের বাসা এবং পেশার দায়িত্ব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে। হয়তো তাদের একটা সুযোগ হবে বাসা থেকে কাজ করার। এরকম জীবন যাপনে, অর্থনীতিতে এবং চিন্তার ক্ষেত্রে হয়তো পরিবর্তন হবে।

অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এখন দেখছে যে, আসলে কোভিড-১৯-এর কারণে প্রকৃতির সাথে আমাদের যে সম্পর্ক সেটা নিয়ে ভাবার সুযোগ হয়েছে, আমরা যে প্রকৃতির কাছে কতটা দুর্বল সেটা বোঝা যাচ্ছে। আমরা মার্কেট ইকোনমির বেসিসে যে মানুষের জীবন-যাপন, সমাজ, রাষ্ট্র চালাচ্ছি, শুধুমাত্র কনজিউমারিজমের উপর, মানুষের ভোগের উপরে যে এত গুরুত্ব দিচ্ছি, সেটা নিয়ে নতুন করে ভাবার হয়তো সুযোগ আছে। হয়তো ভাবার সুযোগ আছে যে আমরা কি আরও প্রকৃতির প্রতি সদয় হব কি-না? মানুষের এত যে গ্লোবাল ট্র্যাভেল, তার দরকার আছে কি-না সেটা ভাবার দরকার আছে। করোনা তো গ্লোবাল ট্র্যাভেল থেকেই ছড়িয়েছে। হয়তো  গ্লোবাল ট্রাভেল কমে আসতে পারে। কিন্তু সবই অনুমান। মানুষ যে ইতিহাস থেকে শেখে না তারও তো বহু উদাহরণ আছে।

অন্য একটা রাজনৈতিক মাত্রার কথা বলবো এখানে। ঔপনিবেশিক কাল থেকে নানা প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অর্থনীতিতে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে, রাষ্ট্র পরিচালনায়। কিন্তু কোভিড-১৯-এ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বড় বড় অর্থনীতির দেশ আমেরিকা, ইউরোপের অনেক দেশ, ব্রিটেন, এরা সবাই আসলে ব্যর্থ হয়েছে পুরো পরিস্থিতি মোকাবেলায়। বরং এক্ষেত্রে এশিয়ার কিছু কিছু দেশ, যারা অত বড় অর্থনীতির দেশ নয়, যেমন সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইন্ডিয়ার কেরালা, তারা অনেক ভালোভাবে করোনা মহামারি ম্যানেজ করেছে। ফলে বলা যায় যে, এখন হয়তো পশ্চিমাদের শ্রেষ্ঠত্বকে নিয়ে প্রশ্ন করার সময় এসেছে। এবং এই যে, নানা রকম নিওলিবারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা যে একটা সংকট-মুহূর্তে ভালো কাজ করতে পারেনি সেটা নতুন করে ভাবার সুযোগ আছে। তো এভাবে চিন্তার নানান নতুন দিগন্ত হয়তো এই মহামারি আমাদের জন্য উন্মুক্ত করতে পারে।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : আমাদের দেশের দুর্বলতাগুলোও বেশ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। যদিও ধরনটা অবশ্যই ভিন্ন, উন্নত দেশের তুলনায়। এখন পর্যন্ত সরকার নানা রকমের উদ্যোগ নিয়েছে। তা নিয়ে ইতিবাচক নেতিবাচক অনেক আলোচনাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায় আপনার মূল্যায়ন কী?

শাহাদুজ্জামান : শুরুর দিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটা মোকাবেলার ক্ষেত্রে বেশকিছু ত্রুটি হয়েছে বলে মনে করি। ক্রমশ রাষ্ট্রীয়ভাবে, নানা রকম সামাজিকভাবে চেষ্টা চলছে এটা মোকাবেলা করার। আমি বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে যে গবেষণা করেছি তাতে দেখেছি যে, বাংলাদেশে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে যখন সারা পৃথিবীতে রোগটা ছড়িয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের মানুষ ভাবছিলো বাংলাদেশ নিরাপদ এবং তারা এক ধরনের ভ্রান্ত নিরাপত্তাবোধের ভেতর ছিল। এই ধারণা দুই জায়গা থেকে তৈরি হয়েছে। একদিকে ধর্মীয় বক্তারা বলতে চেয়েছেন যে, এটি আসলে পশ্চিমাদের অসুখ, তার সাথে পশ্চিমাদের নানা রকম অনৈতিক জীবন-যাপন, পাপাচারের সম্পর্ক আছে, আর মুসলমান দেশকে এটা আঘাত করবে না। আমরা যদি ভালো, খাঁটি মুসলমান হই তাহলে এ করোনা থেকে মুক্ত থাকা যাবে, এ ধরনের একটা ধারণা প্রচার করা হয়েছে।

আবার কিছু কিছু বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ প্রচার করেছেন যে, করোনাভাইরাস আমাদের উষ্ণ আবহাওয়ায় বাঁচবে না। তো এ ধরনের কতগুলো ধারণা থেকে বাংলাদেশ বেশ কিছুকাল এক ধরনের ভ্রান্ত নিরাপত্তাবোধের  ভেতরে ছিল। পরবর্তীকালে যখন বাংলাদেশে করোনা চিহ্নিত হতে থাকল এবং প্রথম পর্যায়ে সেটা চিহ্নিত হয় প্রবাসীদের ভেতরে, ইতালি প্রবাসী বিশেষ করে, তখন ভীতিটা তৈরি হতে থাকে এবং এই ভীতিটা মূলত ছিল প্রবাসীদের প্রতি এবং অনেক প্রবাসীকে স্টিগমাটাইজ করা হয়, সরকারিভাবে তাদের বাড়িতে লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি সময়ে দেখা গেল বেশ কিছু মৃত্যু ঘটল করোনায়, যাদের সাথে  আসলে প্রবাসীদের কোনো সম্পর্ক নেই, যা ছিলো কমিউনিটি কেইস, তখন মানুষের ভয়টা বাড়তে থাকল। এবং এর পরে লকডাউন করা হল। এবং লকডাউনটাকে আসলে লকডাউন না বলে ছুটি বলাতে তাতে  আরও বিভ্রান্তি তৈরি হল। কারণ মানুষ এটাকে ছুটি হিসেবে গ্রহণ করল। যেসব দেশে লকডাউন অনেক ক্ষেত্রে খুব কড়া-আইনি প্রক্রিয়ায় লকডাউন করা হয়েছে, কারফিউ জারি করা হয়েছে কিন্তু আমরা যেহেতু ছুটি বলছি তখন সাধারণ মানুষের উপরে আমরা ডিপেন্ড করছি যে, তারা এটাকে সেভাবে পালন করবে। কিন্তু সেটার জন্য দরকার ছিল, করোনা বিষয়ে নানা রকম যে বার্তাগুলো আছে, তথ্যগুলো আছে সেটা ঠিকমতো পৌঁছানো। কিন্তু আমরা গবেষণায় পেয়েছি যে, করোনার বার্তা এবং তথ্যগুলো বাংলাদেশে যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তা আসলে আমাদের সমাজের জন্য উপযোগী নয়। যেমন ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’, এই কথাটি আমাদের সমাজে কতটা প্রযোজ্য, বস্তির ভেতরে কীভাবে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং করা সম্ভব? কিংবা আমরা বলছি, ‘ঘরে থাকুন’, ঘর বলতে আসলে গ্রামে কী বোঝায়, সেখানে বাড়ি আর ঘরের ভেতরে পার্থক্য আছে? তো এসব বিবেচনায় আনা হয়নি। লকডাউন বলতে গ্রামের মানুষ একেকটা পাড়ার ভেতরে তাদের যাতায়াত সীমিত রাখার চেষ্টা করেছে, যদিও মফস্বলে মহল্লার ভেতরে যাতায়াতের যথেষ্ট পথ থাকে। এগুলো তাদের যাতায়াতের একক। তো এই বাস্তবতাগুলো বিবেচনা না করে শুধুমাত্র আমরা কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছি। সেটা ঠিক হয়নি। মানুষ মাস্ক ব্যবহার করছে শুধুমাত্র প্রতীকী অর্থেই, কিংবা হাত ধোয়ার ব্যাপারটাতে দেখা গেছে শুধু সাবান দিয়ে হাত ধোয়, কিন্তু কীভাবে ধুতে হবে সেটা তারা জানে না। এই রকম নানা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এবং সেটি ঘটেছে বার্তাগুলো স্থানীয়করণ না করার কারণে। তো, আমি মনে করি বাংলাদেশে করোনা মোকাবলোর ক্ষেত্রে সামাধানগুলোর স্থানীয়করণ করা দরকার, সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা দরকার। আর মহামারি মোকাবেলার রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডগুলোর সমন্বয় করা দরকার। সেই সমন্বয়ের বেশ অভাব দেখা যাচ্ছে।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বারবার ঘুরে ফিরে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টা আলোচনায় আসছে সারা বিশ্বে। যেহেতু কিউরেটিভ মেডিসিনে কাজ হচ্ছে না সেহেতু জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত কৌশল দিয়েই কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে সর্বত্র। কোভিড-১৯ আমাদের চেনা পরিচিত বায়োমেডিসিনের জয়জয়কার অবস্থায় সামান্য হলেও চিড় ধরিয়েছে। করোনা পরবর্তীকালে জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা কি নতুন করে অনুধাবন হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের এক ডাক্তারের অভিমত তুলে ধরতে চাই আপনার কাছে। তিনি আমাকে ক’দিন আগেই বলেছেন, ‘বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য বিষয়টি সবসময় উপেক্ষিত ছিলো। আমাদের শিক্ষাজীবনে আমরা দায়সারাভাবে একটা চটি বই জনস্বাস্থ্যে পাশ করার জন্য পড়তাম। অথচ কোভিড-১৯ আমাদের হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে জনস্বাস্থ্য কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনস্বাস্থ্য যে আমাদের দেশে উপেক্ষিত তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ দেয়া যায় সম্প্রতি কোভিড-১৯ মোকাবেলায় গঠিত আমাদের টেকনিক্যাল কমিটির দিকে তাকালে। ১৭ জন সদস্যের মধ্যে একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের নাম নেই।’ জনস্বাস্থ্যের বৈশ্বিক ও বাংলাদেশ দুই প্রেক্ষাপটে আপনার মতামত জানতে চাই।

শাহাদুজ্জামান : এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই, যে কোনো মহামারি মোকাবেলা আসলে প্রধানত জনস্বাস্থ্য-কেন্দ্রিক মোকাবেলা। কিউরেটিভ মেডিসিন এসব ক্ষেত্রে এটা সীমিত ভূমিকা পালন করে। ধরা যাক, এই কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে আমরা যদি চিন্তা করি, কোভিড-১৯-এর সত্যিকার অর্থে কোনো চিকিৎসা নেই, কোনো ভ্যাক্সিন নেই। যারা আক্রান্ত হবেন তাদের মধ্যে পাঁচ পার্সেন্ট রোগী হয়তো হসপিটালাইজড হবেন, এবং এই পাঁচ পার্সেন্টের মাত্র তিনভাগ বা দুইভাগকে হয়তো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে যেতে হবে, ইনটেনসিভ কেয়ার পেতে হলে সেখানে একটা মেডিক্যালাইজড ইন্টারভেনশন দরকার। কিন্তু একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি মেডিক্যাল ইন্টারভেনশনের চেয়ে অনেক বেশি দরকার প্রাইমারি লেভেলের সেবা। এই রোগটা যাতে প্রতিরোধ করা যায়, যাতে না ছড়ায় সেটাই মূল কাজ এবং সেটা জনস্বাস্থ্যের কাজ। জনস্বাস্থ্য যেটা করে কীভাবে রোগটাকে প্রতিরোধ করা যায়, জনগণকে সাথে নিয়ে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে। এটা হচ্ছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়, স্বাস্থ্য অর্থনীতির বিষয়, স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়। এটি ঠিক সরাসরি বায়োমেডিক্যাল ইন্টারভেনশনের বিষয় না, ক্লিনিক্যাল বিষয় নয়। সেজন্য এসব ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য একটা অত্যন্ত জরুরি শাখা, যেটা দিয়ে মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার, একেবারে গ্রাম, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত, সেই ইনফ্রাস্ট্রাকচারটা অত্যন্ত ভালো। আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিক আছে ৬০০০ পপুলেশনের জন্য, তারপর ইউনিয়ন পরিষদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতাল আছে। তো সত্যিকার অর্থে আমাদের উচিৎ ছিল, এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে কোভিড ইউনিট বা করোনা ইউনিট করে যেখান থেকে করোনা বিষয়ক সেবা থেকে শুরু করে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। এবং এই ধরনের মহামারির জন্য দরকার একটা সমন্বিত প্রকল্প, যেখানে ক্লিনিশিয়ান, জনস্বাস্থ্যকর্মী, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং সমাজ বিজ্ঞানী থাকবেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সেটা হচ্ছে। আমাদের দেশে করোনা কমিটিতে আমি যতদূর জানি, প্রায় ১৬/১৭ জন মানুষ আছেন, আমি জানি না ডাক্তারদের বাইরে দুই-একজন জনস্বাস্থ্যবিদ আছেন কি-না। এই কমিটিতে দরকার ছিল অনেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের, দরকার ছিল সমাজ বিজ্ঞানীর, মাইক্রোবায়োলজির মানুষ, জেনেটিক্সের মানুষ, কারণ ভাইরাসের জেনেটিক্সটা বোঝা দরকার। এরকম একটা জয়েন্ট কমিটি হওয়া দরকার ছিল এবং এগুলো জনস্বাস্থ্যেরই কাজ। এক্ষেত্রে একটা বড় ব্যাপার হচ্ছে জনগণ যদি এটার সাথে সম্পৃক্ত না হয়, তাহলে মহামারি মোকাবেলা করা সম্ভব হয় না। এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য জরুরি হচ্ছে এই বার্তাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া, মানুষকে সচেতন করা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, এখন করোনাকেন্দ্রিক নানা রকম স্টিগমা তৈরি হচ্ছে, সামাজিক নিপীড়ন হচ্ছে, করোনা রোগীকে শারীরিক-মানসিকভাবে আক্রান্ত করা হচ্ছে, প্রিয়জনকে মানুষ রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে করোনার ভয়ে, তো এগুলো অজ্ঞতা থেকে আসছে। মানুষের না জানা থেকে আসছে। আমরা যতটা এই ইনফরমেশনগুলো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারব ততই সেটা কমবে। সেটার জন্য একটা আলাদা ব্যবস্থা করা দরকার এবং এই যে হেলথ এডুকেশন, এটাও হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের বিষয়। তো আমাদের দেশে নিঃসন্দেহে, আমি নিজেতো জনস্বাস্থ্যে পড়াশোনা করেছি, জনস্বাস্থ্য বাংলাদেশে উন্নত মানের যে ইনিস্টিটিউট ‘ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ’ প্রতিষ্ঠার সাথে আমি যুক্ত ছিলাম। আমি সবসময় বলেছি যে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যেখানে রিসোর্স কম সেখানে শুধুমাত্র ক্লিনিক্যাল হসপিটাল বাড়িয়ে, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস বাড়িয়ে, ক্লিনিক্যাল মেডিসিনের উন্নতি করে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে না। আমাদের অনেক বেশি দরকার রোগ প্রতিরোধের জন্য ব্যবস্থা নেয়া, প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের শক্তি বাড়ানো, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত করা এবং দরকার জনস্বাস্থ্যবিষয়ক ও জনস্বাস্থ্য গবেষণা। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে জনস্বাস্থ্য বিষয় সম্পর্কে ডাক্তারদের ভেতরে, স্বাস্থ্য পরিকল্পনার ভেতর এক ধরনের অস্পষ্টতা আছে। আমি মেডিকেলের ছাত্র ছিলাম, দেখেছি কমিউনিটি মেডিসিনকে অত্যন্ত গুরুত্বহীন হিসেবে পড়ানো হত এবং ছেলেমেয়েরা এটা পড়তে চাইত না। এবং এটাকে একটা বাড়তি বার্ডেন মনে করা হতো! টেনেটুনে পাশ করে গেলেই হল। কিন্তু আমাদের দেশে গ্রামে-গঞ্জে যখন একজন ডাক্তার যাবেন তখন তাকে এই জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডগুলি করতে হবে, তার দরকার জনস্বাস্থ্যের জ্ঞান। আমরা এই কোভিড-১৯ মহামারির সময় দেখতে পাচ্ছি যে, সে ধরনের জনস্বাস্থ্যের নেতৃত্ব তৈরি হয়নি এবং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে প্রস্তুত নয়, সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তো আমি অবশ্যই বলব, এই করোনা মহামারির প্রেক্ষিতে যদি আমাদের জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা তৈরি হয় এবং জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বাড়ে সেটিই হবে মঙ্গলজনক। আমি বহুকাল ধরে বলে আসছি, আবারো বলব যে, আমাদের মতো দরিদ্র দেশগুলোতে, মানে দরিদ্র অর্থনীতির দেশগুলোতে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব অত্যন্ত বাড়ানো উচিৎ।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞান বিষয়ে দেশের নানা জায়গায় বক্তৃতা দেবার সময় আপনি ব্রিটিশ আমলে আরোপিত এপিডেমিক অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই অ্যাক্টে ধর্মীয় সমাবেশগুলো না হয় সে জন্য নানা ধরনের ট্যাক্স আরোপ করা এবং এই সমাবেশগুলোকে ক্রিমিনালাইজও করা হয়।

আমাদের দেশেও ২০১৮ সালের একটি আইন আছে, যা ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন- ২০১৮’ নামে পরিচিত। তাতে আছে : কেউ যদি সংক্রমণ ঘটায় বা গোপন করে, তাহলে ৬ মাস কারাদণ্ড বা ১,০০০০০ (এক লক্ষ টাকা) পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। কেউ যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ পালনে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বা অসম্মতি জানায়, তবে তার ৩ মাস কারাদণ্ড বা ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার টাকা) পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিলে সেও ২ মাস কারাদণ্ড বা ২৫,০০০ (পঁচিশ হাজার টাকা) পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

শাহাদুজ্জামান : একটু আগেই বলেছি যে, ঔপনিবেশিক কালে বিশেষ করে ভারতে ব্রিটিশরা দমন-নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল স্থানীয় জনগণের উপর, স্থানীয় ধর্ম চর্চার উপর। এখানে এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, এর সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ঔপনিবেশিকতার সম্পর্ক আছে। রাষ্ট্র যেটা করে, সে তার জনগণকে এক ধরনের গভর্ন্যান্সের ভেতর এনে ফেলার চেষ্টা করে। তাকে নজরদারির ভেতরে আনার চেষ্টা করে। কারণ এই সমাজ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের নজরদারিটা জরুরি। প্রাক-ঔপনিবেশিক কালে আমাদের এখানকার মানুষ ঠিক রাষ্ট্রের একেবারে হাতের মুঠোয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিল না।

আমাদের নিজস্ব সমাজ যেটা ছিল ‘গ্রাম সমাজ’, সেখানে তাদের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া, যেমন, সালিশ ছিল, মানুষের নানাবিধ ধর্মীয় বোধ, বিচারবোধ ছিলো, সেখানে নানা রকম মিথ ছিলো, এগুলি দিয়ে সমাজের ভালোমন্দ বিচার করা হতো। রাষ্ট্র সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন, পার্থিব জীবনে সেভাবে সমসময় উপস্থিত থাকতো না। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বলা যায় যে, মানুষকে, পুরো সমাজকে, একটা মনিটরিংয়ের ভেতরে নিয়ে আসা, তাদের আইনি শাসনের ভেতরে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়। এবং সেসময় কিন্তু নানা মানুষকে নানা রকম ক্যাটাগরাইজেশন করা হয়। আমরা তো ইউরোপেও, যেটা মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন কীভাবে এই ক্যাটাগরাইজেশন করা হয়েছে, পাগল ব্যাপারটাকে ‘হিস্টরি অব ম্যাডনেস’-এ দেখিয়েছেন কীভাবে পাগল ব্যাপারটাকে একটা ক্যাটাগরাইজ করে, আদারিং করে, একটা ভিন্ন জনগোষ্ঠী করে তৈরি করা হয়েছে। সেই ঔপনিবেশিক কালে এই আদারিং প্রক্রিয়াটা ঠিক সেভাবে শুরু হয়েছে, স্টিগমাটাইজেশন শুরু হয়েছে। ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায় যে, এই যে কুষ্ঠ রোগ, আগেও সমাজে ছিল,  সেটার সাথে একটা পাপবোধের সম্পর্ক মানুষ দেখত যে, এটা কোনো পাপের ফল, এরকম একটা ব্যাপার ছিল। কিন্তু তাদেরকে সমাজ থেকে একেবারে আলাদা করে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করে বৃটিশরা। ব্রিটিশ শাসনের সময় সেটাকে এক ধরনের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয় যে, কুষ্ঠরোগীরা কোথায় যেতে পারবে কী পারবে না, শহরের ভেতরে ঢুকতে পারবে না, তাদের একটা নিজস্ব গণ্ডি করে দেয়া হয়। তারপরে যেমন ‘ভবঘুরে আইন’ করা হয়। বাউলরা, যাদের নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই, পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, তাদেরকে একটা আইনের আওতায় আনা হয় যে, ভবঘুরে হলে তাদেরকে পাকড়াও করতে হবে। তো এটার সাথে ‘গভর্ন্যান্স’-এর সম্পর্ক আছে, প্রশাসনের সম্পর্ক আছে। তারা নোমাডিক মানুষ, তারা ঘুরে বেড়ায়, তারা প্রশাসনের জন্য সমস্যাজনক। ফলে তাদেরকে গণ্ডির ভেতর আনার একটা ব্যাপার আছে।

তো সেই ধরনের একটা ধারাবাহিকতার ভেতর দিয়েই এই যে, আমরা যদি করোনার সময় দেখি সেরকম  প্রক্রিয়া চলছে। আমি একটু আগে বলছিলাম যে, যখন প্রবাসীরা এলো, এই করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পরে, বিশেষ করে ইটালি থেকে প্রথম প্রায় ১৪০ কিংবা ১৪৫ জন প্যাসেঞ্জার নিয়ে একটা বিমান ঢাকায় আসলো এবং তাদেরকে হাজি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হল, সেখানে তাদের নানা রকম ক্ষোভ ইত্যাদির কারণে তাদেরকে গ্রামে, মফস্বল শহরে, গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে দেয়া হলো। কিন্তু প্রশাসন দুটো কাজ করলো : তাদের হাতে একটা সীল দিয়ে দেয়া হলো, যে সীলের ভেতরে তাদের কোয়ারেন্টাইন পিরিয়ডটা রেখে দেয়া হলো এবং তারা যেসব যেসব বাড়িতে গেল, সেসব বাড়িতে লাল পতাকা লাগিয়ে দেয়া হলো। এই যে রাষ্ট্রীয়ভাবে, প্রশাসনিকভাবে তাদেরকে এক ধরনের চিহ্নিত করা হল যে, তারা অগ্রহণযোগ্য মানুষ, এই যে ‘আদারিং’ যেটাকে বলে এবং গফম্যান যিনি স্টিগমা নিয়ে বিখ্যাত সমাজতাত্ত্বিক, তিনি দেখাচ্ছেন, কীভাবে একজনের আইডেন্টিটিটা স্পয়েল করে দেয়া হয়, স্টিগমার ক্ষেত্রে। মানে তার কোনো আচরণ, কোনো পরিচয়-ফিচার এগুলোকে সমাজের জন্য অগ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। তো প্রবাসীরা যারা একসময় খুব সম্মানিত ছিলেন, তাদেরকে প্রোব্যাবল করোনার উৎস হিসেবে তাদের আইডেনটিটিটা স্পয়েল করে দেয়া হল। তো এই যে, গফম্যানই দেখাচ্ছেন সমাজে এই পরিস্থিতিতে একটা স্টিগমার পরিবেশ তৈরি করা হয়। তো এই সামাজিক পরিবেশটা হওয়ার কারণে কমিউনিটির ভেতরে একটা ‘স্টিগমা পাওয়ার’ তৈরি হয়। তারা অন্যকে নিগৃহীত করার ক্ষমতা পায়। আমরা দেখেছি যে, এরপরেই পাড়ার চায়ের স্টলে, দোকানে ইত্যাদিতে, প্রবাসীদের প্রবেশ নিষেধ উল্লেখ করে ব্যানার লাগানো হলো যে, প্রবাসীরা ঘোরাঘুরি করছে তাদের নির্যাতন এক ধরনের হয়রানি করা হলো। এভাবে এক ধরনের স্টিগমা পাওয়ার তৈরি হল। আমি মনে করি শুধুমাত্র মানুষকে সচেতন করলে হবে না, এ ধরনের নিগ্রহ যারা করবে তাদেরকে আইনের মাধ্যমে থামাতে হবে। তো রাষ্ট্র এক ধরনের সার্ভেইল্যান্সের জন্য এটা করে সেটা আমাদের বুঝতে হবে যে, স্টিগমার বিষয়টা কীভাবে সূত্রপাত হয় এবং সেখানে রাষ্ট্রের একটা ভূমিকা আছে সেটা বোঝা দরকার। কিন্তু আবার এটাকে বন্ধ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ভূমিকা নিতে পারে। তো বাংলাদেশ এখন যে পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, এ ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেয়া খুব জরুরি বলে মনে করি।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : স্টিগমার প্রসঙ্গটি আপনি যেহেতু উল্লেখ করলেন, তা নিয়ে আমি আরেকটু জানতে চাইছিলাম যে, এটা কি অনেকটা ‘নিজে ভালো তো জগৎ ভালো’র মতো না?

সামাজিক যৌথতার জায়গায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তিসর্বস্ব একধরনের তৎপরতা যেন দেখছি আমরা। আমাদের তথাকথিত যৌথতার, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সৌহার্দ্যের এই সমাজে এমন প্রবণতা বিশেষ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তার মানে কি আমাদের এসব শক্তির জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আসছে? একে কীভাবে দেখেন? কিছুদিন আগে পুরান ঢাকায় ৮০ বছর বয়স্ক একজন করোনারোগী চিকিৎসার পর সেরে ওঠেন। এই খবরটা ছিলো দারুণ আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এরপরেই দেখা গেল, সেরে ওঠার পর তার পরিবারের কোনো সদস্য তাকে হাসপাতালে নিতে আসছেন না। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নানা অযুহাত দেখিয়ে তাদের বাবাকে বাড়িতে নিয়ে যাননি শেষ পর্যন্ত।

ছোট আরেকটা প্রসঙ্গ জুড়ে দিতে চাই : মহামারিতে স্টিগমা নিয়ে পশ্চিম ও পূর্বের তুলনামূলক কোনো প্রবণতা কি আপনার চোখে পড়েছে?

শাহাদুজ্জামান : এই যে আমাদের ভয়, আতঙ্ক, নিজেকে বাঁচাবার জন্য অন্যকে আক্রমণ করছি, একজন বাড়িওয়ালা বাড়ি থেকে  করোনারোগী বের করে দিচ্ছেন। এটার পেছনে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রবণতা আছে। নিঃসন্দেহে একজন মানুষের ‘সার্ভাইভাল ইনস্টিংক্ট’ আছে, সবাই বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু বিপরীতে সমাজে সামষ্টিক কল্যাণবোধও তো আছে। কোনটা জয় হবে তার সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে। একটা হচ্ছে কলোনিয়াল ইতিহাস আরেকটা হচ্ছে নিওলিবারেল ইতিহাস। 

সেই ঔপনিবেশিক কাল থেকে শুরু করে প্রায় শত বছর হয়ে যাচ্ছে একটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিওলিবারেল সোসাইটির দিকে আমরা গেছি। এতে আমাদের যৌথতার বোধ ক্রমশ এই নিওলিবারেল মার্কেট ইকোনমির কারণে বিঘ্নিত হয়েছে। তাতে ব্যক্তির নিরাপত্তা, আমার বেঁচে থাকাটা একেবারে চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন আমি একদম নির্মম হয়ে উঠতেও কোনো দ্বিধা করছি না।

আমি যেটা বলছিলাম যে, মানুষ তো নিজেকে বাঁচাতে চাইবে, কিন্তু সেটা এরকম একটা বর্বরতার দিকে চলে যেতো না যদি আমাদের সেই যৌথতার বোধটা থাকত। এটাও কেউ কেউ মনে করছেন, এই যে মহামারিকে আমরা যুদ্ধের মতো করে দেখছি, কিন্তু আমরা যদি এটাকে ‘সেবা’র ফ্রেমওয়ার্কে দেখতাম, ‘কেয়ার’ ফ্রেমওয়ার্ক যেটা আমাদের অনেক সমাজের ভেতরে ছিল, প্রি-কলোনিয়াল সমাজে যেটা বলা হয় যে অনেক ‘একসেপ্টেন্স’-এর ব্যাপার ছিলো তাহলে হয়তো ব্যাপারটা অন্যরকম হতো। রোগীকে একেবারে এন্টাগনাইজনা করেও এই যে বিপদের মধ্যে মানুষ আছে, যখন সে সবচেয়ে নাজুক, এই যে একজন করোনা আক্রান্ত মানুষ, তাকে একধরনের সহমর্মিতার ভেতরেই মোকাবেলা করা যায়। কিন্তু এর সঙ্গে একধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং ব্যক্তিসর্বস্বতার একটা সম্পর্ক আছে।

এজন্য এখন যৌথ ব্যাপারগুলো তুলে ধরা উচিৎ। আমাদের দেশে এত বিপদের মধ্যেও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসছে, এমন উদাহরণও আছে। নানা রকম ইনফরমাল উদ্যোগ নিচ্ছে সেটাও আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেগুলোকে হাইলাইট করা দরকার। যারা বেঁচে উঠছে করোনা থেকে তাদের হাইলাইট করা দরকার। এখন পশ্চিম এবং পূর্বের ভেতরে যদি বলি, পশ্চিমাদেশে সোসাইটিতে গভর্ন্যান্স সিস্টেম এবং সারভেইল্যান্স অনেক বেশি কড়া। মানে এখানে সব কিছু সিসিটিভি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত, আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। আমার সমস্ত তথ্য রাষ্ট্রের কাছে আছে এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনী এখানে অত্যন্ত ক্ষমতাবান। ফলে কমিউনিটি চাইলেই এত সহজে অন্যকে নিগৃহিত করতে পারে না। করোনারোগীর বাড়িতে গিয়ে আক্রমণ করা আইনগতভাবেও এখানে দুরূহ। এখানেও স্টিগমা হয় না তা-না, এটা সূক্ষ্মভাবে অন্যভাবে হয়। সেটা ভাষার মধ্য দিয়ে খুব সাটল ওয়েতে হয়। আমাদের দেশে যেহেতু রাষ্ট্র এবং আইন একেবারে জেঁকে বসেনি, তাই এই স্টিগমাগুলোর এক ধরনের রুক্ষ বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকতে পারে।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : নৃ-বিজ্ঞানে মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণ ও এর নানাবিধ প্রবণতা নিয়ে সারাবিশ্বে দারুণ দারুণ গবেষণা হয়ে থাকে। আপনার কাছে আমার স্পেসিফিক প্রশ্ন, মহামারি নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো নৃ-বৈজ্ঞানিক গবেষণার কথা শুনতে চাই।

শাহাদুজ্জামান : মহামারি নিয়ে ঐতিহাসিক অনেক বই আছে। ইতিহাসের জায়গা থেকে অনেক চমৎকার কাজ আছে। ম্যাকনিল দেখিয়েছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক কালে বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকা, ল্যাতিন আমেরিকায় উপনিবেশ বিস্তার করেছে সেখানে মহামারি একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। কারণ বহু লাতিন আমেরিকান যারা নেটিভ আমেরিকান, তাদের বহু রোগের কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিলো না। তো এই ইউরোপিয়নরা গিয়ে, স্প্যানিশরা প্রথম গিয়েছিল, তারা গিয়ে নানা রোগ ছড়িয়ে দেয়ায় ওখানে মিজলস, স্মল পক্সে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এতে তাদের ভূমি দখল করতে সহজ হয়। এরকম আরও ঐতিহাসিক অনেক কাজ আছে। নৃ-বিজ্ঞানের কাজ খুব বেশি নেই কিন্তু ইবোলা মহামারির সময় বেশ কিছু নৃ-বৈজ্ঞানিক কাজ আছে। জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে ইবোলাকে মোকাবেলা করার জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছিল তাতে দেখা গেল যে, সাধারণ মানুষ তাতে সহযোগিতা করছে না। অনেক ক্ষেত্রে বেশ প্রতিবাদ হয়েছে। তখন নৃ-বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেছেন যে, এই বিরোধটা কেন হচ্ছে। মানুষের কাছে মৃত্যু তো একটা সাংস্কৃতিক বিষয়, ভীষণরকম কালচারাল একটা ব্যাপার। একটা মানুষের জীবন শেষ হচ্ছে সেই জীবনটা শেষ হওয়ার যে কত রিচুয়াল আছে, সেই আচারগুলোকে পালন করা একটা পরিবার-পরিজনের জন্য খুবই জরুরি ব্যাপার। এক ধরনের ক্ষত হয়ে থাকবে সারাজীবন, যদি সে তা পালন করতে না পারে। ইবোলার সময় দেখা যাচ্ছিল যে মানুষের এসব সাংস্কৃতিক আবেগকে একেবারে উপেক্ষা করে মৃত ব্যক্তিদের সৎকার করা হচ্ছে। মানুষকে একপ্রকার জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, হাসপাতালে মৃত্যুর পরে তাদের পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছিল, কোনো রকম আচার-অনুষ্ঠান করতে দেয়া হচ্ছিল না। তো পরে নৃ-বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভেতর দিয়ে এই সংকটগুলোকে বোঝা যায় এবং তারা এমন একটা পদ্ধতি ব্যবহার করেন যাতে সাধারণ মানুষের আবেগকে সম্মান জানানো যায়। যেমন একটা মুসলমান এলাকা ছিল, তাদের না পুড়িয়ে একটা নির্দিষ্ট এলাকায় দূরে একটা কবরস্থানে তাদের কবরস্থ করা যায় সেটার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে জানাজায় মানুষ যাতে অংশগ্রহণ করতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা হয়।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : ‘লকডাউন’, ‘কোয়ারেন্টাইন’, ‘বাড়িতে থাকা’, ‘হাত ধোয়া’ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক শব্দের স্থানীয়করণ না-করা নিয়ে কথা বলছিলেন একটু আগে। এ নিয়ে আপনি ও আরও কয়েকজন মিলে একটা নৃ-বৈজ্ঞানিক গবেষণাও করেছেন তা উল্লেখ করেছেন। এ সময়ের প্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে দারুণ একটি কাজ হয়েছে এটি। এতে আপনারা সুপারিশ করেছেন যে, সঠিক তথ্যের পাশাপাশি তথ্যের পরিবেশনা যেন আর্থ-সামাজিক, বয়স, শ্রেণি, শহর, গ্রাম ভেদে সেসব সংস্কৃতির উপযোগী হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই সময়ে যখন তা গ্রাম, শহর, পেশা, শ্রেণি ভেদে সকলেই ব্যবহার করে তখন পৃথক পৃথক শব্দের ব্যবহার কি একটু বিশৃঙ্খল হয়ে যায় না? ব্যাপারটা শুধুমাত্র আমার সন্দেহের জায়গা থেকে বলা। এ নিয়ে আপনার বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ জানতে চাই। যেমন, এই তথ্য পরিবেশনার/ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কারা নিতে পারে? সরকারি বা বেসরকারি না-কি সমন্বিত কোনো উদ্যোগ? কীভাবে তা হতে পারে? অথবা এ ব্যাপারে কি তথ্য কমিশন কোনো ভূমিকা নিতে পারতো?

শাহাদুজ্জামান : মূল পয়েন্টটা হচ্ছে লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, বাড়িতে থাকা, হাত ধোয়া, এগুলো  কনটেক্সচুয়ালাইজ করা জরুরি, আগের একটা প্রশ্নের উত্তরে তা বলেছি। দৈনন্দিন জীবনের পরিপ্রেক্ষিতের সাথে বার্তাগুলোকে মেলানো। গ্রাম, শহর, পেশা, শ্রেণি ভেদে উপযোগী বার্তা দেয়া দরকার। অনেকে ভাবতে পারে তাতে বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে কি-না। আমি তা মনে করি না। যারা কমিউনিকেশন ম্যাটেরিয়াল তৈরি করেন, যারা যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, তারা যার যার জীবন-যাপন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বার্তা এবং তথ্যগুলি তৈরি করতে পারতেন। যে তথ্যটা একটা বস্তির জন্য প্রয়োজন, সেটা মধ্যবিত্তের প্রয়োজন নাই, সেটা গ্রামের জন্য প্রয়োজন নাই। যোগাযোগ জীবনের সাথে মিলিয়ে করতে হবে এবং সেভাবে করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। এখন করোনার ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে হাত ধুতে হলে দুই হাত ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়। এক হাত সাবান দিয়ে ধুলে হবে না, সেটার একটা প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু আমাদের এটা ভাবতে হবে যে, দুই হাত রানিং ওয়াটার দিয়ে ধুতে হলে আমার কলের পানি লাগবে। গ্রামের মানুষ, বস্তির মানুষ, যারা বালতির ভেতর এক হাতে মগ ধরে আরেক হাত ধোয়। সে কীভাবে দুই হাত ধোবে। তাহলে, সেটা বিবেচনা করে আমাদের নির্দিষ্ট উপদেশ দিতে হবে যে, এরকম প্রেক্ষিতে গ্রামে যিনি থাকেন তিনি এভাবে হাত ধোবেন। অনেক উদ্ভাবনী উপায়ে সেটা করা যাতে পারে। সুতরাং আমি মনে করি না যে, এটা অসম্ভব, সমন্বিত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ যারা আছেন, কনটেন্ট তৈরি করেন, তারা যদি বসেন তাহলে একটা ডেডিকেটেড তাহলে এটা বের করা সম্ভব।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ বা ‘মুমূর্ষু রোগীর সেবা’ আপনার গবেষণার আরেকটি ক্ষেত্র। সারাবিশ্বে নানা চেহারায় ‘ভালো মৃত্যু’র যে ধারণা তা একেবারেই বদলে দিয়েছে কোভিড-১৯। ভালোভাবে মৃত্যুর যে একটা ধারণা পশ্চিমের প্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠেছিলো যে, স্বাস্থ্যকর্মীরা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাশে থেকে নিবিড়ভাবে দেখভাল করবে, করোনা রোগীদের প্রাধান্য দিতে গিয়ে এইসব মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা না পাওয়া, কোভিড-১৯-এ মৃতের সৎকার করতে গিয়ে অব্যবস্থাপনা, ফিউন্যারেল ইনডাস্ট্রি নানা কারণে হিমশিমও খাচ্ছে। আমাদের দেশে দেখছি অন্য চেহারা। মৃত্যুর আগে নিজ বাড়িতে আপনজনের পাশে থেকে শেষ বিদায় নেয়া তো দূরের কথা, জানাযার মতো মৃত্যুপরবর্তী আনুষ্ঠানিকতাগুলো পর্যন্ত সম্পন্ন করতে পারছে না। আমার বাবা কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ‘আমি যদি কোনোভাবে এই করোনাতেই আক্রান্ত হয়ে মারা যাই, তবে আমার পাশে তোরাই তো থাকতে পারবি না, কোনো আত্মীয়স্বজনও না। আমার জীবনের সব চাওয়া, অর্জন তো বৃথাই যাবে।’ কোভিড-১৯-এর প্রেক্ষিতে ‘ভালো মৃত্যু’র বদলে যাওয়া এই প্রবণতাগুলোকে কীভাবে দেখেন?

শাহাদুজ্জামান : এটা একটা বড় আলোচনার বিষয়। নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে ‘মৃত্যু’ বিষয়টা একটা নতুন রূপে দেখা দিচ্ছে। মৃতদেহ সৎকার নিয়ে তো একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। মৃতদেহ থেকে করোনা ছড়ায় কী ছড়ায় না, সেটা নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক বিভ্রান্তিও আছে। তো সেইখানে এজন্য একটা ভীতির ব্যাপার ছিল শুরুর দিকে, পরবর্তীকালে কিছু ডেডিকেটেড মানুষ সৎকার ও জানাযার ব্যবস্থা করেছেন, পিপিই পরে তারা করছেন, সেরকম হয়েছে। আর অন্য যেটা প্রশ্ন, ভালো মৃত্যু বা গুড ডেথ বলে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে যে ধারণা সেটা ভিন্ন আলোচনার ব্যাপার। ইউরোপের ক্ষেত্রে ভালো মৃত্যু বলতে তারা যেসব সংজ্ঞা তৈরি করেছিল সেটা যেমন একটা ‘পেইনলেস মৃত্যু’, আরেকটা অটোনমাস মৃত্যু, প্রিয়জনের উপস্থিতিতে মৃত্যু, সেগুলোতো এ ধরনের মহামারি বা ইমার্জেন্সি পরিস্থির মধ্যে হচ্ছে না। যেটা বিশেষ করে দাঁড়াচ্ছে যে, যেহেতু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রস্তুত না এখন, যে পরিমাণ আইসিইউ দরকার, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট দরকার সে পরিমাণ আইসিইউ’র ব্যবস্থা নেই। ইউকেতে তো নেই, জার্মানিতে নেই, ইটালিতে নেই, তখন তারা অনেকটাই বাধ্য হচ্ছেন এক ধরনের ঘোষণা দিতে যে, যারা বয়স্ক মানুষ, ধরা যাক যারা আশি বছরের ঊর্ধ্বে, যাদের অন্য সমস্যা আছে, আমরা তাদের আসলে মৃত্যু ঠেকাতে পারব না। বরং যাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি আমরা তাদেরকেই চেষ্টা করব বাঁচিয়ে রাখার। বাকিদের মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দেবো। এটা সমাজবিজ্ঞানের একটা টার্মে আছে যে, নেক্রোপলিটিক্স। রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যে, কে মারা যাবে আর কে বেঁচে থাকবে, বা কাকে আমরা বাঁচিয়ে রাখব। তো এটা এক ধরনের স্ব-বিরোধীতা। পশ্চিমা সমাজ এই অবস্থাতে পড়েছে কারণ তারা সারাজীবন জীবন দীর্ঘায়িত করারই চর্চা করেছে এবং যতদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকা সে চেষ্টা করেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে সেটাই এখন তাদের একটা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের আয়ু বেশি এখন তাদেরকে এক ধরনের মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দিতে হচ্ছে। তো এই স্ব-বিরোধীতা আছে, এটার দার্শনিক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটছে।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : ইন্টারডিসিপ্লিনারি কার্যক্রম আপনার আগ্রহের একটা জায়গা। পেশাগত কারণে এ ধরনের নানা কাজও করেছেন। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে গবেষণার জগতে ইন্টারডিসিপ্লিনারি প্রজেক্টের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে যদি বলতেন। বিশেষ করে কোভিড-১৯-এর প্রভাব সমাজের সর্বস্তরেই সমানভাবে পড়েছে। এমন প্রেক্ষিতে চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞানের মতো বিষয় নিয়ে যদি বিশেষভাবে বলতেন।

শাহাদুজ্জামান : আগেও বলেছি যে, মহামারিটা শুধু একটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় না, এই মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসকের দরকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দরকার, জেনেটিক বিশেষজ্ঞও দরকার, ভারোলজিষ্ট দরকার। কারণ ভাইরাসটি তার চরিত্র বদলাচ্ছে, বাংলাদেশে তার চরিত্রটা কেমন সেটা বোঝার জন্য ভাইরোলজিস্টের দরকার। টেস্ট করার জন্য মাইক্রোবায়োলজির মানুষ দরকার। এবং নিঃসন্দেহে সমাজবিজ্ঞানীও দরকার কারণ এর সামাজিক প্রভাব আছে, সমাজের উপরে যে অভিঘাতগুলো হচ্ছে সেটা বোঝার জন্য সমাজবিজ্ঞানের দরকার। এটা একটা মাল্টিডিসিপ্লিনারি ওয়েতে মোকাবেলা করা খুবই জরুরি।

 

ইলিয়াছ কামাল রিসাত : সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শাহাদুজ্জামান : তোমাকেও ধন্যবাদ।

//জেডএস//
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের