X
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২
১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দীর্ঘ কবিতা

পৃথিবীর প্রাচীনতম নেপথ্যসঙ্গীতের কথা

অরিত্র সান্যাল
১১ অক্টোবর ২০২১, ১৮:০০আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২১, ১৮:০০

অগ্রাহ্য করা যায় এত ছোট্ট—
তাই খানিকটা করুণও—
তাই সে পাহাড়ে এসেছে—
একটি গভীর খাদের তীরে দাঁড়িয়ে যখন নৌকো ভাবছি—
সেই ছোট্ট ব্যথা, তখন তার আর কোনো আধার নেই—
তখন সে নুড়ি পাথরের সুর—
ধরা দিলো। 
এই বিশাল পর্বত—শীর্ষ যার মুদে থাকে তুষারে—
তার একটি দীর্ঘ বক্তব্য আছে—
চোখ বন্ধ করলেই বোঝা যায়, সেটাও সুর—
উঠে আসছে অতল থেকে,
আর ক্রমাগত আমি ভয় পাচ্ছি—এই তো খালি পা—
যদি ক্ষতর কুঁড়ি তাতে ফুটে যায়—
ফিরে যাব কী করে—তারপরই মনে হলো
কয়েকটি তল ভেঙে যাচ্ছে—
মনে হলো জেগে থাকা বড় ওজনহীন
ওই ব্যথা ছাড়া—
তাই আপনি তারের ওপর স্পর্শের যে বৃষ্টি শুনছেন—
আমি জানি, আমাকে তার যথাযোগ্য ভয়ংকর একটি জীবন
সাজাতে হবে। কথা দিই,
তোমায়, শব্দ, উদ্দেশ্য ছাড়া আর ডাকব না। 

অন্ধকার নেচে গেছে সারা রাত মাথার ভিতর।
সারা রাত আমি দুটি পরিপূর্ণ পৃথিবী কল্পনা করেছি।
দুই হাতের সমস্ত ছোঁয়া ঢেলে দিয়ে তাদের সেবায় কেটেছে সারা রাত।
দিনের আলো এখন খুব ক্লান্ত লাগছে।
মনে হচ্ছে, বেলা বড় নির্মম ঘন করছে মধ্যাহ্নের ছায়া।   
দিগন্ত থেকে, রোজকার মতো, লক্ষ লক্ষ ভ্রূকুটি উড়ে আসছে
আজ সারা দিন বিদ্ধ হব—
তার আগে,
জীবন নামক তরলটিতে ভেসে আছি উপুড় হয়ে—
ভেবেছিলুম, শুরু হবে প্রবল ঝংকারে—
কিন্তু কই, জীবন শুরু তো হচ্ছে না!
শুধু একটি উদ্যত দশা, আর তা-ই অনিষ্ক্রমণীয়ভাবে স্বাভাবিক,
জড়িয়ে ফেলছে। শুয়ে আছি, সর্বত্রই শুয়ে আছি অপেক্ষায়।  
সুর আমাকে যা শিখিয়েছে, হে শব্দ—
বনচারী নিরীহ চতুষ্পদ হে—যখন হে অন্যমনস্ক তুমি—
শুনেছ হঠাৎ দূর বৃক্ষশিখরে ঝঞ্ঝার মতো পাখির বিঘ্ন
আঁচড়ে আকাশকে সতর্ক করছে—
বিপদ নিকটেই—
হয় মৃত্যু—নয়
বিস্মরণের মতো দীর্ঘ জীবন—
প্রশ্ন ছিল, যে শুধু লিখতেই চায়, 
প্রকৃতি তাকে অজস্র চিঠি লেখার সুযোগ দেয়,
কিন্তু সে করবেটা কী?
দেখি, খাদের, পথের, কাটা গুঁড়ির, ভগ্ন কুঁড়ের
কুশল জিজ্ঞাসায় সে রোপণ করে ‘আমি’ শব্দটি। 
লেখে, কিন্তু উত্তর এক অন্ধকার চুপ।
এতদুপলক্ষে জানা যায় যে, 
খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আমার বরাবর মনে হয়
মনে পড়ছে না বটে—
কিন্তু আছে মোড়ানো আমারও দুটি ডানা, বিশাল
আমারই শরীর থেকে মুক্ত হয়ে
যে হাঁটুর ব্যথাটি, নখের, চোখের যে ক্লেশ
সুর হয়ে ভাসছিল—
তার উপস্থিতি কীভাবে বুঝবে পাথরখণ্ড?
আমি তাদের কথা ভেবেই প্রকট হলাম—
নেমে এসেছি তাই এবার 
সমস্ত কিছু মূল্যবান হয়ে যাবে।

সুর এই মুহূর্তে যে উচ্চতায় পৌঁছল 
শীতল প্রাণবায়ু সেখানে ঝড়ের মতো বইছে—
এবার দরকার রৌদ্রে আলগা পতাকার মতো কিছু বেজে ওঠা,
এক লক্ষ বৎসর ধরে সে নীচু বাজনা আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে চাই, 
নইলে অধরা থেকে যাবে সুবিশাল স্পন্দনটি—
যাকে নিঃসাড় ভাবা হয়েছিল, তার—

আবাহন করি, অতীতের মতো কালো ও উজ্জ্বল একটি মঞ্চের,
একটি অন্ধকার চুপের,
আবাহন করি তাঁর
এক ছটাক আলো মায়ের সাদা মেঘের মতো
এসে পড়বে যাঁর ওপর—
সারা রাত মুদ্রা দুহাতে, মাথা ঝাঁকিয়ে—
শরীর অস্থির করে, দুচোখ তীক্ষ্ণ শানিয়ে
উনি দোহন করতে চাইছেন মহাকালকে—
অথচ কোথাও কোনো শব্দ নেই—
একমাত্র কল্পনাতেই দেখা যায়—
কালো সমুদ্র থেকে—তখন সবাই ঘুমিয়ে আছে—
অতিকায় জেগে উঠছে সুর—
একটিই ডাকবাক্স। তা আবার ছিল পাখির বাসা—
আমার সামান্য উচ্ছ্বাসেই যা প্লাবিত—
সে এখন কোথায় তলিয়ে গেল পাখিসুদ্ধ—
কোন গানের ভিতর তাকে খুঁজি?
আমি ফিরে আসছি একা।
কিন্তু পথ আড়াল করে দাঁড়াল তিনটি দৃশ্য।
একটি গোরস্থান, যার পুবদিকের পাঁচিলে
কংক্রিটের স্তূপ ফেলে গেছে রাধারানি বিল্ডার্স;
শোঁ শোঁ হাওয়া দিচ্ছিল এক সকালে।
একটি মরা কুমির, 
হাঁ থেকে দুটি সোনার জল করা চুড়ি।
আর গভীর শূন্য প্রত্যাশা করে
খাদের ধার থেকে ঝাঁপ দিতে গিয়ে
চেলোর আকস্মিক গম্ভীর টানে আছড়ে পড়ে আছি। 
সারা শরীর লাল—শুশ্রূষার খিদে ধকধক করছে—
ক্লান্ত বসে আছি কার একটা কবর ফলকে।
দূরে বড় বড় ঘাস। মাটি কেঁচোর চলাচলে 
অলক্ষ্যে চিত্রিত। আমি দেখলুম সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তে
আমার শরীরের ব্যথাটুকু ছাড়া পৃথিবীর কোথাও কোনো ঘটনা নেই। 
মনে হলো, গোটা পৃথিবী আচমকাই আমার অধীনে এসে
সে মুহূর্তে শুধু আমার দায়িত্বে সচল।
আজ রোববার। আজ জঞ্জালের ওপরে চাঁদও উঠবে না। 
নিজেকে আমার ভারী মনে পড়তে লাগল। 

সুর আমাকে এ যাবৎ যা শিখিয়েছে—
একটি ঝরে পড়া পাতা থেকে পিছিয়ে
পিছিয়ে সমগ্র গাছটির নির্বিকারতা 
অব্দি হলুদ পথ, সেই পথকে চিনতে পারা; 
জিরোনো দুদণ্ড।
লক্ষ লক্ষ বাঁশির আওয়াজে তৈরি জলবায়ু,
একটি তার টানলেই আকাশ মেঘলা হয়ে যায়,
রোদ চারদিকে শান্ত হাসির মতো আয়োজনহীন,
আমি গাছতলায় যে শুয়ে আছি—সুরের বিরতি
শুধুমাত্র সেখানেই। আমার গা থেকে কুলকুল বয়ে যাচ্ছে
ফিরে আসার আনন্দ ঘাম। 
আকাশ প্রায় ঢেকে যাবার উপক্রম—
এমন উচ্চগ্রামে বেহালার সুর, হঠাৎ। 
একটি মরা কুমির ভেসে উঠেছে,
দুটি চুড়ি তার হাঁ-এর ভিতর থেকে গড়িয়ে এল।
আমি এই গল্পেই ফিরে আসছি। সবাই উদগ্রীব।
দূর থেকে মায়ের ডাক—
তাতে মিশে যাচ্ছে শীর্ণ একটি বাঁশির আওয়াজ।
অপেক্ষা করি, এবার কি সেই পরম ঝংকার
যা দিয়ে জীবনের শুরু বোঝানো যায়?
দূর মাঠের শেষ প্রান্তে একটি বাড়িতে
সে রাত্রে একজনের স্বপ্নে এসেছেন মা মঙ্গলচণ্ডী।
চরম নৈঃশব্দ্য।
পুকুর কাটার পরও জল নেই—
এই অলুক্ষুণে ঘটনাকেও বিধাতা
কোনো সুরে ধরতে পারেননি।
চুপ।  
অথচ, কথা বলার সময় মঙ্গলচণ্ডী
খুব আশা করেছিলেন,
বড় বৌয়ের স্বপ্নে থাকবে ন্যুনতম নেপথ্যসঙ্গীত, 
যৎসামান্য একতারা হলেও—
বাণীর অমোঘতা তাতে ফুটে উঠত।
নৈঃশব্দ্য।
দ্রুত লয়ে সুর তখন শুরু হলো, যখন 
সকালে আঙিনা ভিজিয়ে জল উঠে আসছে পুকুরে।
আর, ছোটবৌ নিজের ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছে না।
একটি দ্রুত বেহালার ছড় তাকে খুঁজে যাচ্ছে। 
দালান, কুলুঙ্গি, ছাদ খুব দ্রুত একটি সুর ঘুরে বেড়াচ্ছে—
তা উৎকণ্ঠার হলেও অদ্ভুতভাবে করুণ। 
আমার শরীর থেকে স্বাধীন হয়ে
আমার ছোটখাটো ব্যথাগুলি তার মধ্যে 
নেচে বেড়াতে লাগল। নিঃশব্দ সে নাচ—
অধ্যয়ন করছে জীবনকে। মৃত্যুকে। 
জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী ছায়াময় বারবেলাটিকে। 
আমার ঘুম আস্তে আস্তে ভাঙছে 
শীর্ণ, শংকিত বাঁশির সুরে। 
গভীর জলতল থেকে আমি উঠে আসছি
আর খুঁজছি, যে শ্রবন-অন্ধকার,
যে চরম নৈঃশব্দ্য 
মাঝে মাঝে ফিরে আসছে
তার উৎস কোথায়।
আকাশ ছেয়ে আসছে শ্রাব্য ধারা—
তাকে দেখতে পাচ্ছি—
এ-ই কি তবে শিরোধার্য মর্মার্থ?

গভীর রাত। সে সময় আমাদের উঠোনে 
উন্মাদের ছায়ার মতো একজন
নেমে আসেন।
হাতে মুদ্রা, উত্তাল দেহভঙ্গী, 
দু চোখ তীক্ষ্ণ শানিয়ে
উনি বাজিয়ে তুলতে চাইছেন অন্ধকারকে।
তাঁর ব্যর্থতা আমাদের জীবন দেবতা জেনে
নিশ্চিন্তে ফিরে যাই জলতলে

/জেডএস/
ইউক্রেনের পুনর্গঠনে প্রয়োজন ১ ট্রিলিয়ন ডলার
ইউক্রেনের পুনর্গঠনে প্রয়োজন ১ ট্রিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের দায়িত্ব পেলেন মেজবাউল হক
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের দায়িত্ব পেলেন মেজবাউল হক
কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে এলো মৃত ডলফিন
কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে এলো মৃত ডলফিন
সাভারে বিএনপির ৩০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ১
সাভারে বিএনপির ৩০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ১
সর্বাধিক পঠিত
১১ মাসে নাগরিকত্ব ছাড়লেন ৪০১ বাংলাদেশি
১১ মাসে নাগরিকত্ব ছাড়লেন ৪০১ বাংলাদেশি
মেসি-আলভারেজের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
মেসি-আলভারেজের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
‘পুলিশ প্রটোকলে’ বিদায় নিলেন রাঙ্গাবালীর ইউএনও
‘পুলিশ প্রটোকলে’ বিদায় নিলেন রাঙ্গাবালীর ইউএনও
হাসপাতালে কী হয়েছিল মাইশার সঙ্গে?
আঙুলের অপারেশন করতে গিয়ে মৃত্যুহাসপাতালে কী হয়েছিল মাইশার সঙ্গে?
সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিনের তোলা বিল ৬ মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ
সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিনের তোলা বিল ৬ মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ