X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ছোটগল্প

ইমান একটি সাদা জবা ফুল

মামুন অর রশীদ
১৪ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪১আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১১:০১

ঢাকায় আসার পরও আরফাতুল তার নামের প্রথমে থাকা মোহাম্মদ শব্দটির ব্যবহার করত। তখন তার দাদির কাছে শেখা কাঁচাসুপারির পানও খেত মাঝে মাঝে। কিন্তু শীঘ্রই মফস্বলের গন্ধ মুছে ফেলার জন্য পান খাওয়া ছেড়ে দিলো, আর কাঁচাপাতির রংচা ধরল। আর তাতেও যখন নাটকের মহড়া দলে তার অবস্থান পোক্ত হলো না তখন সে রেড ওয়াইন যে মেয়েলি পানীয় তা বলা শুরু করল। বিষয়টি টনিকের মতো কাজ করল এবং রুদ্র আরাফাত কিছু দিনের মধ্যে বুঝতে পারল রেড ওয়াইনের রং যে জাম রঙ না সিঁদুর রঙের মতো সে সম্পর্কে দলের কারোই ধারণা নাই। আরাফাতুলেরও সে সম্পর্কে ধারণা কম। সে নিজেও এই জিনিস একবারই খেয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তার কথাবার্তা এমন পর্যায়ে তুলে রাখল যে, শুধু নিজের দল না, ক্লাসের বন্ধুরা না, শিল্পসাহিত্যের লোকজনও তাকে সমীহ করতে শুরু করেছিল। বরং ইতালি ও স্প্যাইনের ভাইন ইয়ার্ডগুলা পাকা আঙুরে কেমন মোঁ মোঁ করে, সেখানে সেই আঙুর ছিঁড়তে থাকা সুন্দরীদের নিপল, আর তাদের সঙ্গে লতানো গাছের ছায়ায় খুনশুটি শুরুর সঙ্গে শুয়েপড়ার আনন্দের গল্পগুলো এমনভাবে বলতে শুরু করল, কেউ অন্তত এটা ভাবল না যে, আরাফাতুল মূলত একবারই রেড ওয়াইন খেয়েছিল।
আবার বহুবছর পর, ফ্লাইটের পুরো সময় রেড ওয়াইন খেয়ে যখন ঝিমুচ্ছিল, তখন ঢাকাগামী মোহাম্মদ নামের যে সর্বশেষ যাত্রীর মাইকে খোঁজ চলছে, তখন ঝিমুনির মধ্যেও আরফাতুল বুঝতে পারল, এই মোহাম্মদ সে নিজে ছাড়া কেউ নয়। পাসপোর্টে এখনও নামটি রয়ে গেছে। রোম থেকে ইস্তাম্বুলের ফ্লাইট ভরে যে রেড ওয়াইন নিয়েছে, তাতে বিমানবালাদের কোনো প্ররোচনা নেই। আরফাতুলের কাছে এরা সবাই ভেনাসের মতোই সুন্দরী, হাসি দিয়ে রেড ওয়াইন ঢেলে দেয়, তবু কেন জানি এরা আনন্দ মাটি করতে একদম পেশাদার। বিষণ্ণতার আরো কারণ আছে। আরফাতুল ভেবেছিল ইতালির আঙুর খেতগুলোতে প্রচুর সুন্দরীদের দেখা যাবে এবং এরা প্রচুর উদার হবে, তাদের কারও সঙ্গে হয়তো ভাব হয়ে যাবে এবং পুরনো একটা বোতল খুলতে চাইতে পারে, আর সন্ধ্যা হয়ে বলতেও পারে, চল নাচি। কনফারেন্সের আয়োজকেরা এমন একটা ট্যুর করেওছিল সবচেয়ে বড় ভাইন ইয়ার্ডে। আসলে ট্যুর না, ঘুরতে গিয়েও বক্তৃতা। বাংলাদেশের পুরনো ঐতিহ্য কনফারেন্সের সব কথাই হচ্ছিল ফরাসি বা ইতালীয়তে। তবে আরফাতুল এ বিষয় যতটুকুই বুঝুক মনসামঙ্গলের পুথি আর আদিনা মসজিদের ছবি সে ঠিকই চিনেছিল। ইতালির এই আঙুরখেতে মনসামঙ্গলের আলোচনার ছবি অলরেডি ফেইসবুকে আরফাতুল দিয়ে দিয়েছে। যদিও তার নিজের বক্তৃতার ছবি দেওয়া যায়নি, এরা ছবি তুলতে অতটা উৎসাহী নয়। আরফাতুল পটের গানের ওপর বক্তৃতার অর্ধেক ছিল মূলত দেখে পড়া, বাকিটা তার পরিচিত প্রফেসর ইটালীয়তে বলে দিয়েছিলেন। যাকে ঢাকায় আরফাতুল গাইড করে থাকে। নিজের বক্তৃতার ছবি ফেইসবুকে দিতে না পারার জন্য মনটা খচখচ করছিল। তবে এর চেয়েও বেশি মন খারাপ কনফারেন্সে তার বয়সী কোনো মেয়ে নাই। এছাড়াও এমন ঝকঝকে রোদের মধ্যে জলরঙের মতো সবুজ আঙুর বাগানে একটি মেয়েও আঙুর তুলছে না। কয়েকটি ট্রাকের মতো মেশিন আঙুর তোলার সব কাজ করে দিচ্ছে। তবে সেখানে ডিনার হয়েছিল রাজকীয়। তখন স্থানীয় মেয়র এসেছিল। তার কন্যারা সত্যিই রাজকন্যার মতোই। খাবারও ছিল একেবারে বত্রিশ পদের। বাতি জ্বলছিল তেত্রিশ রকম । আর এমন মিউজিক বাজছিল যেন শত বছর এমন অর্কেস্ট্রায় জীবন পার করে দেওয়া যাবে। এমন ভালো খারাপের মধ্যে আয়োজকদের একজন আরফাতুলের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। বিস্ময়কর ভাবে বাংলাতেই কথা বলতে থাকে। বাংলাদেশের জাদুঘরের অবস্থা জিজ্ঞেস করেন তিনি। তিনি জানান মহরম নিয়ে নব্বয়ের দশকে পুরান ঢাকায় কাজ করেছিলেন। মাস ছয়েকের মতো ছিলেন। নেত্রকোনায় গিয়েছিলেন জারি গান নিয়ে কাজ করতে। ভদ্রলোকের মুখ থেকে হুইশকির গন্ধ আসছিল। এই গন্ধ ক্যারুর হুইশকি নেওয়া অ্যারামের মাতালদের মতো নয়। মেয়েরা যে বেনসন খাওয়া ছেলেদের ভালোবাসে তার কারণ বেনসন ক্রয়ের পৌরুষ নয়, আমিষ পচা গন্ধ ঢাকতে পারার ক্ষমতা। ভদ্রলোকের মুখের গন্ধটা আরও অমৃত লাগলো যখন তিনি বলে বসলেন আরফাতুল চাইলে তার সঙ্গে একটা গ্রন্থ সম্পাদনায় সাহায্য করতে পারে, যেটা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুচ্ছে। সাহায্য মানে, নেত্রকোনায় এক কাজী বাড়িতে একটা দেড় ইঞ্চির কোরান শরিফ দেখে এসেছিলেন তিনি। সেটা দিয়ে বইয়ের একটা চ্যাপ্টার হবে। সেটা সংগ্রহ করে দিতে পারলে ভালো, না হলে অন্তত ডিজিটাল কপি দিতে হবে। কোরান শরিফটা কিন্তু অন্তুত সাতশ বছরের পুরনো। কিন্তু কাজীরা জানো কোরান শরিফটা একশ বছর আগের, আদতে এর লিপি বলছে এটা সাতশ বছর আগের রীতি। ফলে অমূল্য কাজ হবে। এটা কোনো ব্যাপারই না। অধ্যাপকের সঙ্গে তার ছবি ফেইসবুকে দিয়ে দিয়েছে। ওখানে এ পর্যন্ত ছিয়ানব্বইটা কমেন্টস হয়ে গ্যাছে, অনেকে তাকে এযুগের ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলছেন, তবে তার বন্ধুদের কেউ এখনও লাইকও দিলো না। আরফাতুলের সেদিকে মন নেই। নেত্রকোনার ওইদিকে বাড়ি পিম্পির। পিম্পি তার সঙ্গে থিয়েটারে একটা কোর্স করেছিল। ওর কাছ থেকে খবর নেওয়া যাবে কাজীবাড়ির। গ্লাসের রেড ওয়াইনগুলা টকটকে লাল হয়ে উঠছে। আরফাতুলের পুরো রাতটা রঙিন মনে হলো।
টার্কিশ এয়ারের ফিরতি ফ্লাইট অনেক লম্বা সময় লাগাচ্ছে। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে বিমান ঢাকায় নামতে দেরি করল। সকাল স ছয়টা বেজে গেল বের হতে হতে। এই এয়ারপোর্টাকে যারা দোজখের দ্বার বলে, তারা আসলে দেশকে ভালোবাসে না। আরফাতুল একটা সিএনজি নিয়ে নিল পিম্পির বাড়ির দিকে। দামদর বিষয় না। পিম্পির হেল্প ছাড়া নেত্রকোনা যাওয়া যাবে না। এর জন্য ইস্তাম্বুলের চকোলেটটা আলাদা ব্যাগে রাখল। আর চাচাতো বোনের জন্য ছাড়ে কেনা পারফিউমটাও পিম্পিকে দিয়ে দিলে ভালো। ওকে সাথে নিয়ে যাওয়া যাবে। ইন ফ্যাক্ট, ওর হেল্প ছাড়া এই কোরান উদ্ধার সম্ভব না।
 
দুই
ঠিকানামতো কাজীবাড়িতে একটা মসজিদ আছে। মসজিদের পুবপাশেই ইবাদাত কাজীর বাড়ি। তবে পিম্পিদের গ্রামের বাড়ি থেকে এই গ্রামে যাওয়াটা সহজ মনে হচ্ছে না। বন্যায় রাস্তা ভেঙে গেছে। সকাল সাতটায় চারটায় একটা ডিঙি নৌকা ভাড়া করে দুপুর এগারোটায় মসজিদ ঘাটে পৌঁছুনো গেলে। এই গ্রামে কারেন্ট নাই, মোবাইলের চার্জও শেষ। শব্দহীন পানিবন্দি একটা গ্রাম। মাছের লেজের বাড়ি দেওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই। বাড়িতে কারোও সাড়াশব্দ নেই। বাড়িতে ঢোকার সময় বড় একটা গরুর গোয়াল। তবে মূল ঘরটি দেখে মনে হবে এরা গিরস্থ নয়। টিনের ঘরে বারান্দামতো আছে, বারান্দায় এটা টিয়া পাখির খাঁচা। ঘরের পাশে সামনে কয়েকটি সাদা জবার গাছ। অনেক দিনের বনেদি পরিবার বোঝা যাচ্ছে, আরফাতুল পিম্পিকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। যিনি বেরিয়ে এলেন তিনিও আরফাতুলের বয়সী। জানা গেল, ইবাদাত কাজী তিরিশ বছর আগে মারা গিয়েছেন, তিনি তার নাতি নাম মাহবুব কাজী। আরফাতুলের হাতের ক্যামেরা, পিম্পির হাতে একট খাতা। সাংবাদিক বা গবেষক টাইপ সাজ না দিলে গ্রামে তেমন গুরুত্ব পাওয়া যায় না। পুথি নিয়ে আলাপ করতে তো নয়ই। আরফাতুলের এই পথটি অনেক দিন চেনা। মাহবুব কাজী দুটো কাঠের চেয়ার নিয়ে এলেন, ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ষাটোর্ধ্ব একজন। তিনি মাহাবুব কাজীর পিতা। বোঝা গেল, এই কোরান শরিফের খোঁজে অনেকেই আসেন, এরা এমন আগন্তুকে অভ্যস্ত। পানিবন্দি বাড়িতে আগন্তুক পেয়ে এরা খুশিই। চাও চলে এল, তবে বিরক্তিকর টাইপের মিষ্টি। এরা মিশুক। কাজ হবে মনে হলো। মাহবুব কাজীর বাবা হাসি-খুশি। কোরান শরিফের গল্পটি তিনি তার বাবার হজযাত্রার গল্প দিয়ে শুরু নেত্রকোনা থেকে কীভাবে গোয়ালন্দ, সেখান থেকে স্টিমারে কলকাতা। কলকাতা থেকে বোম্বে, বোম্বে থেকে করাচি। করাচি থেকে সফিনা আরব জাহাজে করে জেদ্দা। সফিনা আরবের বিশালত্ব বলতে গিয়ে কাজী সাহেব যতটা গৌরবান্বিত হচ্ছিলেন। জেদ্দা যাওয়ার পর যখন উটের কাফেলা পনেরো দিন পর আসবে সেই অপেক্ষার বিষণ্ণতায় গল্পের আসরও চুপ হয়ে গেল। ফিরতি পথে কী করে হায়দারাবাদের নিজাম নিজ হাতে দেড় ইঞ্চি অমূল্য সম্পদ ইবাদাত কাজীকেই দিয়েছিলেন সেটা বিরাট অলৌকিক বিষয়। এই লম্বা গল্প শুনতে শুতে বিকেল হয়ে গেল। দুপুরে যে টেংরা পুঁটি ঝোলের যে স্বাদ তা কাজীর গল্পের সকল গৌরবকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো। কিন্তু কোরানের ছবি তোলার কথা বলতেই আসর শেষ হয়ে গেল, সাফ জানিয়ে দিলেন। এ জিনিস দেখানোর নয়। অনেক অনুরোধ করার পরও তারা জানাল, পারিবারিকভাবে এটা ওয়াদা করা আছে। ফেরার সময় পিম্পি একটা সাদা জবা নিয়ে ফিরছে, মাহবুব কাজী তাকে দিয়েছে। পিম্পির কোনো বিকার নেই, সে এমন আচরণে অভ্যস্ত। মাস দুয়েক লেগেছিল আরফাতুলের এই ট্রমা ভাঙতে। এত কাছে গিয়েও কিছু হলো না, প্যারিস থেকে সেই অধ্যাপক আরফাতুলকে মেইল করেই যাচ্ছে। সেও আরও কয়েকদিন সময় চেয়েছে। লেগে থাকতে হবে, এটা আরফাতুল জানে।
 
তিন
গতকাল ভোরে আরফাতুল আমার বাসায় হাউমাউ কান্না, পুলিশ তাকে খুঁজতে পারে। কাউকে বলা যাবে না শর্তে আরফাতুল ভাঙা ভাঙা ঘটনাগুলো জানাল। মাহবুব কাজী গত সপ্তাহে লুকিয়ে ছবি পাঠিয়েছিল পিম্পিকে। আরফাতুল সেটা মেইলে ফরোয়ার্ড করে দেয় প্যারিসের সেই অধ্যাপককে। কিন্তু তিনি নাকি পেয়েছেন কোরানের সাদা পাতার ছবি। আর মাহবুব কাজীর বাবাও পড়তে গিয়ে দেখেন কোরান থেকে নাকি লিপি উধাও। কামেরার ফ্ল্যাশ থেকে এমনটা ঘটেছে কিনা পিম্পিও আমাকে ফোন করে যাচ্ছে। শুধু তাই না একসাথে সব জবাগাছগুলোও নাকি মরে গিয়েছে। আমি এর একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

/জেডএস/
তিনবার রিহ্যাবে যেতে হয়েছে অনুরাগ কাশ্যপকে!
তিনবার রিহ্যাবে যেতে হয়েছে অনুরাগ কাশ্যপকে!
হত্যা মামলার ১৭ বছর পর তিন আসামির যাবজ্জীবন
হত্যা মামলার ১৭ বছর পর তিন আসামির যাবজ্জীবন
সরকারের কাছে ১১০টি শিশুবান্ধব শ্রেণিকক্ষ হস্তান্তর করলো ইউনিসেফ
সরকারের কাছে ১১০টি শিশুবান্ধব শ্রেণিকক্ষ হস্তান্তর করলো ইউনিসেফ
পুরস্কার হিসেবে আর মন্ত্রী নয়: আনোয়ার ইব্রাহিম
পুরস্কার হিসেবে আর মন্ত্রী নয়: আনোয়ার ইব্রাহিম
সর্বাধিক পঠিত
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী