X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ঈদসংখ্যা ২০২২

৫টি ফ্ল্যাশ ফিকশন

অনুবাদ : সৌম্য সরকার
০১ মে ২০২২, ০০:০০আপডেট : ০১ মে ২০২২, ০০:০০

রাতের খাবার ।। রাসেল এডসন

বুড়ো বসেছিল ডিনার টেবিলের পাশে―অপেক্ষায় বুড়ি তাকে কখন রাতের খাবার দেবে। রান্নাঘরে ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে ঠানঠুন শব্দ―বুড়ি বেধড়ক পেটাচ্ছে একটা কড়াইকে, হাত পুড়িয়ে দিয়েছে বলে। জঘন্য লাগে বুড়োর এইসব পিটাপিটির শব্দ―বাঁচাও বাঁচাও বলে চেঁচাতেই থাকে হাঁড়িপাতিলগুলো। বুড়োর নিজেরও ইচ্ছা করে ওগুলোকে আচ্ছামতো পিটিয়ে সোজা করে আসে। তাই সে নিজের মুখেই ঘুসি মারতে থাকে। আঙুলের গাঁটগুলো লাল হয়ে ওঠে তার। আঙুলের গাঁট লাল হয়ে যেতে দেখলে রাগে তার গা রিরি করতে থাকে―রংটা যেন ইচ্ছা করে বেশি জ্বলজ্বল করে―শো অফ!

বুড়ি পুরো ডিনারের বাসনপত্র রান্নাঘরের মেঝেতে ফেলে দিয়ে গালাগালির তুবড়ি ছুটিয়েছে ততক্ষণে―তার বুড়ো আঙুলে প্রচণ্ড ছ্যাঁকা লেগেছে। সব চামচ, কাঁটাচামচ, কাপ-পিরিচ একসাথে তারস্বরে চিৎকার করে ওঠে। একটা রাতের খাবার―একজনের হাত―টাত পুড়িয়ে শান্ত হয়নি, এখন আবার গলা সপ্তমে তুলে চেঁচাচ্ছে, গোঙাচ্ছে। ওহ রাগে পিত্তি জ্বলে যায়। পিটিয়ে ওদের তক্তা বানিয়ে ফেলতে পারলে কিছুটা রাগ কমত।

আবার মুখে-মাথায় ঘুসি মারে বুড়ো―মেঝেতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায় তারপর। জ্ঞান আসার পর এত রাগ হয় যে আবার কয়েকটা দমাদম ঘুসি বসায় চোয়ালে। এবারে কেমন মাথা ঘোরে। এতে তার আরও রাগ হয়―দেয়ালে ঢুশ দিতে থাকে মাথা দিয়ে : নে, মাথা যদি ঘুরবিই তো ভালো করে ঘুরা―বলতে থাকে সে, তারপর ধুপ করে বসে পড়ে মেঝেতে।

ওহ, পা কাজ করছে না, হাঃ!... পায়ে কিলের পর কিল বসায় বুড়ো এবার। মাথাকে একটা ভালো শিক্ষা দেওয়া গেছে, এবার পা দুটোকে একটা যথার্থ শিক্ষা দিতে হবে।

ওদিকে বুড়ি বাকি সব থালাবাটি হাঁড়ি-পাতিল সব আছড়ে আছড়ে ফেলছে―এ ঘর থেকে সব শোনা যাচ্ছে―বাসনপত্রের চিৎকার, গর্জন, গোঙানি...

বুড়ো দেয়ালে ঝোলানো আয়নায় নিজেকে দেখে। বাহ্! হাসো! ভারি মজা, না! দেখাচ্ছি―আয়নাটা নিয়ে সে আছাড়ে মারে চেয়ারটার ওপর। চেয়ারটা ভেঙে যায়। শাবাশ, আর চেয়ার হয়ে থাকতে শান্তি লাগছে না! কেউ তোমার ওপর বসবে ভাবতে ভালো লাগছে না বুঝি! চেয়ারের ভাঙা হাতলটা তুলে চেয়ারটাকে গুঁড়িয়ে দেয় সে।

বুড়ি ততক্ষণে হাতে কুড়াল তুলে নিয়েছে বোঝা যায়―স্টোভটার গায় গবাগব কোপ বসায়। বুড়ো চিৎকার করে বলে, খাব কখন আমরা? বলে মুখে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি পুরে দেয়।

―যখন আমি বলব যে সব রেডি, উল্টা ঝাঁঝানি মেরে বলে বুড়ি।

―তোমার রুটিগুলোকে একটু পিটিয়ে ভর্তা করে দিয়ে যাব? তুমি একা পারছ না মনে হয়!

―এখানে এলে তোর খবরই আছে―লাথি দিয়ে মাথার সকেট থেকে চোখ বের করে দেবো!

―আমি তোর কান কেটে কুত্তাকে দিয়ে খাওয়াব।

―ঘুসি মেরে মুখ ছাতু করে দেবো তোর

―তোর ভুঁড়িতে লাথি দিয়ে ভুঁড়ি ফাসিয়ে দেবো আমি

―তোকে দা দিয়ে কেটে দুই ভাগ করে ফেলব

বুড়ো অবশেষে নিজের একটা হাত খেয়ে ফেলে। বুড়ি বলে, এত বড় মূর্খ অসভ্য আমি কোথাও দেখিনি―আগে রান্না করে নেবে তো হাতটা! তুমি অসভ্যের মতো আচরণ করো সবসময়―জানো যে রান্নাঘরটাকে বাগে আনতে কত কষ্ট করতে হয় প্রতিদিন! নয়তো ও আমাকেই গুঁড়া মশলা দিয়ে কষিয়ে রান্না করে মাংস সবচেয়ে চকচকে চিনামাটির প্লেটে বেড়ে খেতে দেবে ইঁদুরগুলোকে। কচকচ করে আমাকে চিবিয়ে খাবে ওরা। তারপর আসবে রাজ্যের যত মাছি। তুমি জানো আমার রান্নাঘরে আমি মাছি দেখতে পারি না : জঘন্য!

বুড়ো একটা চামচ খেয়ে ফেলে।

বেশ এবার আমাদের একটা চামচ কম পড়বে

লোকটা রাগে অন্ধ হয়ে নিজেকেই গিলে ফেলে এবার

খুব ভালো, বুড়ি হেসে বলে, শেষ পর্যন্ত ওটাও করে দেখালে!


সর্বমোট ।। গ্রেগরি বার্নহাম

যে কয়টা ফ্রিজের সাথে সংসার করেছি আমি : আঠারো। যে কয়টা পচা ডিম ফেলেছি : এক। যে কয়টা আংটি আমার নিজের ছিল : তিন। ভাঙা হাড়ের সংখ্যা : শূন্য। কয়টা পর্পল হার্টের চারা আছে আমার : শূন্য। স্ত্রী ছাড়া অন্য কারো... হ্যাঁ : দুইবার। একবারেই গলফে বল ফেলেছি : শূন্য। মিনিয়েচার গলফে : তিন। একটানা সর্বোচ্চ বুকডন : পঁচিশ। বুকের ছাতি : বত্রিশ। পাকা চুল : চার। আন্ডাবাচ্চা : চার। বিজনেস স্যুট : দুই। সুইমিং স্যুট : বাইশ। পুরো সিগারেট টেনেছি : তিরাশি। রাস্তার কুকুরকে লাথি মেরেছি : ছয়বার। কাজের মাঝখানে―যেকোনো কাজ―ধরা খেয়েছি : চৌষট্টি বার। পোস্টকার্ড পাঠিয়েছি : আটশ একত্রিশ। পোস্টকার্ড পেয়েছি : চারশ ষোলো। কয়টা স্পাইডার প্লান্ট মরেছে আমার হাতে : চৌত্রিশ। যার―তার সাথে ডেইট মেরেছি এমন সংখ্যা : দুই। জাম্পিং জ্যাক দিয়েছি : নয় লক্ষ বিরাশি হাজার তিনশ ষোলোটা। মাথাব্যথার সংখ্যা : একশ চুরাশি। চুমু খেয়েছি : একুশ হাজার ছয়শ দুই। আমাকে চুমু খাওয়া হয়েছে : বিশ হাজার একচল্লিশ। কোমরের বেল্ট : একুশটি। মারা খেয়েছি [বেশ ভালোরকম ] : ছয়বার। মারা খেয়েছি [মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে] : পনেরোশ বার। বাপ―মায়ের সামনে ঠোঁটের নিচ দিয়ে গালি দেওয়ার সংখ্যা : আটশ আটত্রিশ। চার্চ ক্যাম্পে গিয়েছি : একবার। নিজের বাড়ি : শূন্য। বাড়ি ভাড়া নিয়েছি : বারো। আন্দাজের ওপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি : এক হাজার একানব্বই বার। প্রশংসা পেয়েছি : চার হাজার একান্নটি। এর মধ্যে গ্রহণ করেছি : দুই হাজার দুইশ উনপঞ্চাশ। লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়েছি : দুই হাজার দুইশ আটান্ন বার। কয়টা জেলায় ঘুরেছি : আটত্রিশ। ট্রাফিক কেইস খেয়েছি : তিনটি। গার্লফ্রেন্ড [এ পর্যন্ত] : চার। খেলার মাঠে পড়ে গেছি―দোলনা থেকে : তিন; বানর―ঝোলা থেকে : দুই; টিটার―টটার থেকে : এক। স্বপ্নে ভেসেছি : আটাশ বার। সিঁড়ি থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়েছি : নয় বার। কুকুর পেলেছি : এক। বিড়াল পেলেছি : সাত। অলৌকিক কিছু দেখেছি : শূন্য। অপমান করেছি : দশ হাজার আটত্রিশ বার। অপমানিত হয়েছি : আট হাজার নয়শ তেষট্টি। ভুল নাম্বারে কল করেছি : তিহাত্তর বার। কথা বলার ভাষা খুঁজে পাইনি : তেত্রিশ বার। বিদ্যুতের সকেটে চাবি ঢুকিয়ে দিয়েছি : একবার। পাথর ছুড়ে পাখি মেরেছি : একটি। পেটে ঘুসি খেয়ে দম আটকে গেছে : বারো বার। কারো কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছি : একশ একাশি বার। কতবার ভেবেছি, ছাই, এর চেয়ে মরে গেলে ভালো হতো : দুই। কতবার আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছি : চারশ আটান্ন। বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছি : পাঁচশ তেরো বার। আবার জন্মাতে পেরেছি : শূন্য। চোখে সর্ষেফুল দেখেছি : আঠারো বার। দেজা ভু হয়েছে কতবার : তেতাল্লিশ। জীবনের সবকিছু ভেঙে পড়েছে : একবার। খাবার সময় গলায় আটকে গেছে―মুরগির হাড় : চার; মাছ : ছয়; অন্যান্য : তিন। বাপ-মাকে অবিশ্বাস করেছি : তেইশ হাজার নয়শ আটাত্তর বার। মেশিনে বাগানের ঘাস কেটেছি : মোট তিন হাজার পাঁচশ সাতাত্তর মাইল। বাল্ব পরিবর্তন করেছি : দুইশ তিয়াত্তরটি। ছোটোবেলার বাসার টেলিফোন নম্বর : ৩৮৪৬২১৫৮৪৪। ভাইয়ের সংখ্যা : সাড়ে তিন। মেয়েদের কাছ থেকে পাস মার্ক পেয়েছি : পাঁচবার। সিঁড়ি বেয়েছি : সাত লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার আটশ একুশটি। সিঁড়ি ধরে নেমেছি : সাত লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার ছয়শ নয়টি। টুপি হারিয়েছি : নয়টি। ম্যাগাজিন সাবসক্রাইব করেছি : একচল্লিশ। সমুদ্র ভ্রমণে বমন এবং ইত্যাদি : একবার। নাক দিয়ে রক্ত পড়ার ঘটনা : ষোলো। যৌনতার সংখ্যা : চার হাজার তেরো। মাছ ধরেছি : এক। জাতীয় সংগীত শুনেছি : দুই হাজার চারশ দশ বার। কতটি শিশুকে কোলে নিয়েছি : নয়। কতবার কী বলতে চাচ্ছি ভুলে গেছি : ছয়শ একত্রিশ


কর্নেল ।। ক্যারোলিন ফোরচি

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। আমি তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। তার স্ত্রী একটা ট্রেতে করে কফি আর চিনি দিয়ে গেল। তাঁর মেয়ে ফাইল দিয়ে নখ ঘষে ঘষে সমান করছিল আর ছেলেটা রাতে বাইরে থাকবে বলে চলে গেল। আশপাশে দৈনিক পত্রিকা, কয়েকটা পোষা কুকুর আর তাঁর সোফার পাশে একটা পিস্তল। চাঁদটা কালো সুতোর সাথে গাঁথা যেন―ঝুলছিল বাড়িটার ওপর। টেলিভিশনে কী একটা ধারাবাহিক চলছিল―পুলিশদের নিয়ে―ভাষা ইংরেজি। বাড়ি ঘিরে যে দেয়াল তার সারা গায়ে কাচের টুকরা গাঁথা : লোকজনের হাঁটুর চাকতি যাতে খুলে যেতে পারে কিংবা হাতগুলো ছিঁড়ে ফাতা ফাতা হয়ে যেতে পারে। জানালায় ভারী গরাদ―অনেকটা মদের দোকানের মতো করে। একসাথে ডিনার করলাম আমরা―ভেড়ার বুকের ঝলসানো মাংস আর আর অসাধারণ ওয়াইন। সোনার তৈরি একটা ঘণ্টা ছিল টেবিলের ওপর―কাজের মেয়েকে ডাকার জন্য। মেয়েটা ফালা-ফালা করে কাটা কাঁচা আম, লবণ আর এক ধরনের রুটি রেখে গেল। আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো, কেমন লাগছে তাঁর দেশ। স্প্যানিশ ভাষায় একটা বিজ্ঞাপন চলছিল তখন। তার স্ত্রী এসে সব নিয়ে গেল। দেশ চালানো কত কঠিন সেটা নিয়ে টুকটাক কিছু কথা হলো। তোতাপাখিটা ‘হ্যালো’ বলে উঠল চাতাল থেকে। কর্নেল চিৎকার করে বললেন, এই চুপ, এবং উঠে গেলেন। আমার বন্ধু চোখ দিলে বলল আমাকে, কিছু বলার দরকার নেই। কাঁচাবাজার করার একটা ব্যাগ নিয়ে ফিরলেন কর্নেল। ব্যাগটা উপুড় করে ঢেলে দিলেন টেবিলের ওপর―ছিটকে ছিটকে পড়ল মানুষের একগাদা কান। দেখে মনে হচ্ছিল বড় বড় করে কাটা শুকনো আমের ফালি। আর কোনো তুলনা মাথায় এলো না আমার। একটা কান হাতে নিয়ে একটু লোফালুফি করে আমাদের মুখের সামনে ঝুলাতে লাগলেন তিনি। তারপর এক গ্লাস পানির মধ্যে ছেড়ে দিলেন টুপ করে। কানটা জীবন্ত হয়ে গেল পানি পেয়ে। এইসব ভাঁড়ামো করতে করতে আমি ক্লান্ত, বললেন তিনি। নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে―তোমার দেশের লোকজনকে গিয়ে বোলো তারা যত খুশি চিল্লাফাল্লা করতে পারে। নাগরিক অধিকারের নিকুচি করি আমি। হাত দিয়ে সব কান তিনি ঝেড়ে ফেলে দিলেন মেঝেতে। তারপর শেষ ওয়াইনটুকু তুলে ধরলেন মাথার ওপর। কবিতা লেখার ভালো মসলা, কী বলো?―আমার উদ্দেশে বললেন তিনি। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কানগুলোর কানে এই শেষ কথাটুকু ঢুকল কেবল। আর কিছু কান থ্যাঁতা মেরে থাকল কঠিন মেঝেতে।


চোখের এক কোনা দিয়ে দেখা ।। লুইসা বালেনসুয়েলা

সে আমার পা―মানে নিতম্বে হাত দিলো―সত্যি! একটা ভয়ানক চিৎকার দিয়ে বাসের লোকজনের মাথা খারাপ করে দিতে গিয়েও থেমে গেলাম। বাসটা তখন একটা চার্চ পার হচ্ছিল। ডান হাত দিয়ে বুকে ক্রস আঁকল সে। বাম হাতটা তখনও আমার...। একদম লোক খারাপ না―মনে মনে বলি। হয়তো তার ডান হাত জানেই না বাম হাত কী করছে। আমি বাসের অন্য দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম―কোনো কিছুর উত্তর খোঁজা, মানে সে কতটুকু ভালো বা কতটুকু খারাপ, আর পা― মানে পশ্চাৎদেশে থাবা খাওয়া এক জিনিস না। ততক্ষণে বাসে আরও লোকজন উঠে গেছে, গুঁতিয়ে-গাতিয়ে পথ করে ওর নাগালের বাইরে যাওয়ার এই চেষ্টায় বরং ওর আরও লাভই হলো―শরীরের অন্যান্য জায়গায়ও হাতানোর সুযোগ পেয়ে গেল। এত বিরক্ত আর নার্ভাস লাগছিল―কষ্ট করে হলেও সরে গেলাম। সেও অবশ্য সরে এলো আমার সাথে। আমরা আরেকটা চার্চ পার হলাম, এবার তার চোখে পড়ল না―যখন হাত উঠল তখন দেখলাম কপালের ঘাম মুছতে। চোখের এক কোনা দিয়ে তাকে দেখছিলাম আমি, কিছুই ঘটছে না এমন ভান চালিয়ে গেলাম; অথবা সে ভেবে বসতে পারে আমার হয়তো ভালোই লাগছে―সেটাও তাকে ভাবতে দেওয়া যায় না। বাসের মধ্যে একচুলও আর সরার জায়গা ছিল না। কায়দা পেয়ে সে আমার শরীরের ওখানে ওখানে ধরে দোলাতে ঝাঁকাতে শুরু করেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিই আমাকেও সমান ভাবে খেলতে হবে। আমি তার পোঁ―মানে পশ্চাৎদেশে হাত দেই। কয়েক ব্লক পরে বাসস্টপে ওর থেকে আলাদা হয়ে যাই আমি। এত এত লোকজন আমাকে ভাসিয়ে অন্য দিকে নিয়ে যায়। আমার এবার খারাপ লাগতে থাকে যে ওকে আমি হঠাৎ হারিয়ে ফেললাম। তার মানিব্যাগে কত ছিল―মোটমাট সাত হাজার চার পেসো। একটু একসাথে একা থাকতে পারলে আরও অনেক হাতানো যেত। আহারে লোকটা কত ভালো আর দিলদরিয়া ছিল!


করপোরাল ।। রিচার্ড ব্রাউটিগান

একবার আমি জেনারেল হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টাকোমাতে, আমি তখন গ্রেইড স্কুলে পড়ি। আমেরিকাজুড়ে তখন বিরাট কাগজ সংগ্রহ অভিযান চলছে―মিলিটারিতে ক্যারিয়ার করার এক দারুণ সুযোগ।

দারুণ সুযোগই; ব্যাপারটা ছিল এমন : পঞ্চাশ পাউন্ড কাগজ আনলে তুমি পাবে প্রাইভেট র‌্যাংক; পঁচাত্তর পাউন্ড আনলে পাবে করপোরালের ব্যাজ; একশ পাউন্ড মানে সার্জেন্ট। এভাবে কাগজ বাড়বে, তোমার র‌্যাংক বাড়বে―একদম উপরে জেনারেল। হয়তো একটন কাগজ দিতে পারলে জেনারেল অথবা এক হাজার পাউন্ড হতে পারে। সঠিক পরিমাণটা মনে নেই কিন্তু প্রথমে ভেবেছিলাম একজন জেনারেল হওয়ার মতো কাগজ জোগাড় করা কোনো ব্যাপারই না।

বাড়ির আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাগজগুলো দিয়ে শুরু করে দেই। তিন বা চার পাউন্ড―মতো হলো তাতে। হতাশই হলাম বলতে হবে। আমার কেন যেন ধারণা ছিল বাসাভর্তি শুধু কাগজ ঠাসা থাকবে। আসলেই আমি ভেবেছিলাম যেখানেই যাব সেখানেই কাগজ পড়ে থাকতে দেখব―আর টপাটপ তুলে নিয়ে জেনারেল হয়ে যাব। কাগজও এত ধোকা দিতে জানে―হায়রে!

যা হোক পুরোটা ভেঙে না পড়ে আমার শক্তি ও সাহস যেটুকু ছিল গুছিয়ে নিয়ে নেমে পড়লাম। লোকজনের দরজায় দরজায় গিয়ে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম তাদের বাসায় কোনো কাগজ বা পত্রিকা এমনি পড়ে আছে কি না যা তারা আমাকে দিয়ে দিতে পারে। তাদের এই ডোনেশন আমাদের যুদ্ধে জিততে সাহায্য করবে―খারাপের বিরুদ্ধে ভালো চিরজীবনের জন্য জিতে যেতে পারে... ইত্যাদি। রিহার্সেল দিয়ে শেখা কথাগুলো সব ঝেড়ে দিলাম।

এক বৃদ্ধ মহিলা আমার ভাষণ ধৈর্য ধরে শুনলেন তারপর ঘরে ঢুকে লাইফ ম্যাগাজিনের শেষ সংখ্যাটা আমাকে দিলেন। তাঁর কেবল পড়া শেষ হয়েছে। দরজা বন্ধ হলেও আমি বোকার মতো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম―ম্যাগাজিনটার দিকে তাকিয়ে। ওটা তখনও উষ্ণ।

পরের বাড়িতে কোনো কাগজ ছিল না―এমনকি একটা ব্যবহৃত চিঠির খামও না। অন্য একটা ছেলে আমাকে বিট করে আগে এসে নিয়ে গেছে।

পরের বাড়িতে কোনো লোকই ছিল না।

এভাবে এক সপ্তাহ : এক দরজা থেকে আরেক দরজা, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, এক গলি থেকে আরেক গলি। অবশেষে প্রাইভেট হওয়ার মতো কাগজ হলো আমার।

ফালতু ব্যাজটা পকেটের একেবারে তলানিতে ফেলে বাড়ি ফিরলাম। আমার গলিতে ততদিন কয়েকজন কাগজ―লেফটেন্যান্ট ও কাগজ―ক্যাপ্টেন গজিয়েছে। ব্যাজটা ড্রয়ারের চিপায় ফেলে রাখলাম একটা পুরনো মোজা দিয়ে ঢেকে―কোটের সাথে সেলাই করা তো দূরের কথা।

পরের কয়েক দিন কিছু পাব না জেনেও যেন―তেন ভাবে খোঁজা চালিয়ে গেলাম। আর কী ভাগ্য―একজনের বেইজমেন্টে এক বস্তা কলিয়ের’স―এর পুরনো সংখ্যা পেয়ে গেলাম; করপোরালের ব্যাজ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই ব্যাজটাও আমি আগেরটার সাথে ড্রয়ারে মোজার নিচে রেখে দিলাম।

যেসব বাচ্চারা সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় পরে, যাদের হাতে অনেক আলগা টাকা, প্রতিদিন গরম লাঞ্চ খায়, তারা ততদিনে জেনারেল। ওরা জানত কোথায় গেলে অনেক অনেক ম্যাগাজিন পাওয়া যাবে আর ওদের বাপ-মায়ের গাড়িও আছে, সুতরাং... মিলিটারি গর্বে বুকের ছাতি ফুলিয়ে তারা স্কুলের খেলার মাঠ দাপিয়ে বেড়াল, বাতাসে ভেসে ভেসে বাড়ির পথে চলল।

কিন্তু এর অল্পকিছু পরেই আমি আমার মহান মিলিটারি ক্যারিয়ারের ইতি ঘটিয়ে আমেরিকার মোহমুক্ত কাগজের ছায়ার তলে ঢুকে গেলাম―সেখানে ব্যর্থতার মাপকাঠি নির্ধারিত হয় ব্যাংক থেকে ফেরত আসা চেকে বা একটা খারাপ রিপোর্ট কার্ডে অথবা প্রেম ভেঙে দেওয়া একটা চিঠিতে : এসবের প্রতিটা শব্দ আপনার বুকে গিয়ে বেঁধে।

/জেড-এস/
নারীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহিংসতাই অন্যতম বাধা
নারীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহিংসতাই অন্যতম বাধা
যেভাবে জানা যাবে এসএসসি ও সমমানের ফল
যেভাবে জানা যাবে এসএসসি ও সমমানের ফল
সড়কে প্রাণ গেলো মা-বাবা-মেয়ের
সড়কে প্রাণ গেলো মা-বাবা-মেয়ের
দুদক রাঘববোয়ালদের নয়, চুনোপুঁটিদের ধরতে ব্যস্ত: হাইকোর্ট
দুদক রাঘববোয়ালদের নয়, চুনোপুঁটিদের ধরতে ব্যস্ত: হাইকোর্ট
সর্বাধিক পঠিত
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী