রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে প্রতিনিয়ত চুরি, ছিনতাই, মারধর, ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধে জড়িতদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। হরহামেশাই তাদের সঙ্গে করা হচ্ছে অসদাচরণ।
শিক্ষার্থীদের এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকে জড়িয়ে যাওয়া, অপরাধের শাস্তি না হওয়া, এমনকি অভিযোগ করে পরে সমঝোতার মাধ্যমে তা প্রত্যাহার করে নেওয়াকে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ মাসে কেবল প্রক্টর দফতরে লিখিত অভিযোগ পড়েছে ৪৬টি। এর মধ্যে আবাসিক হলে ছাত্র নির্যাতন, ছিনতাই, চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি সংক্রান্ত অভিযোগ ১৫টি, চুরি ও হারিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত ১৯টি, যৌন হয়রানি সংক্রান্ত চারটি, শিক্ষকের সঙ্গে অসদাচরণ তিনটি এবং সাইবার সংক্রান্ত পাঁচটি। যার একটিরও বিচার হয়নি।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আটটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে ১৪টি। শৌকজ করা হয়েছে পাঁচটি। এছাড়া মাদক সেবনকালে গত পাঁচ মাসে অন্তত ১০০ জনকে আটক করেছেন প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা। পরে তাদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসহাবুল হক বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা আরও বেশি। অনেকে ভয়ে, আত্মসম্মানের কথা ভেবে অভিযোগ দেন না। আমরা অনেক ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। শৃঙ্খলা কমিটির সভায় এসব প্রতিবেদন উঠবে। আশা করছি, অনেকে শাস্তির মুখোমুখি হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন অপরাধে জড়াচ্ছেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো বলছে, অপরাধে জড়িতদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে তারা জড়িয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন অপরাধে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বিষয়ে নীরব। যার কারণে উৎসাহ পান তারা।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অপরাধে জড়াচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাকিল হোসেন। তিনি বলেন, ‘অভিযুক্তদের পরিচয় খুঁজলে দেখা যায়, তারা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বিচার না হওয়ায় চুরি, ছিনতাই ও যৌন হয়রানির মতো ঘটনা ঘটাতেও দ্বিধা করেন না তারা।’
তবে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মেহেদি হাসান মুন্না মনে করেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের অপরাধে জড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘একজন ছাত্রলীগ কর্মী প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে অপরাধে যুক্ত হয় না। কিন্তু সে যখন দেখে তার সিনিয়র কোনও ভাই কিংবা বন্ধু সিট বিক্রি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ করছেন, সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সম্মান দেখাচ্ছে। তখন ওই ছাত্রলীগ কর্মী অপরাধে জড়াতে উৎসাহ পান। এর সম্পূর্ণ দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।’
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাষ্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম মনে করেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যে নৈতিক শিক্ষা পাওয়ার কথা ছিল, সেটি পাচ্ছি না। ছাত্র সংগঠনের পরিচয় দিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব অপরাধের বিচার করে না। এতে জুনিয়ররাও জড়িয়ে পড়েন অপরাধে।’
যা বলছেন দায়িত্বশীলরা
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একরাম উল্ল্যাহ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বাইরের কোনও প্রতিষ্ঠান নয়। দেশব্যাপী যে নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে, তারই প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছে। এখানকার শিক্ষকদের কাজ শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া। ভালো মন্দের পার্থক্য বোঝানো। কিন্তু সেই জায়গাটি এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মোটিভেশন না দিয়ে উল্টো শেল্টার দিচ্ছে। ফলে ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে। তারা চুরি, ছিনতাই বা মারধর করতে ভাবে না। কারণ তারা জানে, নেতারা শেল্টার দেবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাইলে কাউকে শাস্তি দিতে পারি না। শাস্তি দেওয়ার জন্য শৃঙ্খলা কমিটি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ওই কমিটির বৈঠক না হওয়ায় অভিযুক্তদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে আমরা একটি উদ্যোগ নিয়েছি, দ্রুত শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









