‘কিছু না জেনে’ জিপিএ ফাইভ পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা, বিষয়টি প্রমাণ করতে গিয়ে এসএসসিতে সদ্য জিপিএ ফাইভ পাওয়া কিছু শিক্ষার্থীকে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে এনে হেয় করা হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, ওই টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদক সমাজের এই দিকটি তুলে ধরতে গিয়ে ওই শিশুদের চেহারা দেখিয়ে ঠিক কাজ করেননি। কেননা এতে তারা যদি সম্মানহানি ঘটেছে মনে করে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে অপ্রীতিকর কোনও সিদ্ধান্ত নেয়, সেটার দায় সাংবাদিক এবং তার প্রতিষ্ঠানকেই নিতে হবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এ ধরনের অবমাননাকর উপস্থাপনের জন্য শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের এক প্রতিবেদনে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়, শিক্ষার্থীরা কিছু না জানলেও জিপিএ ফাইভ পাচ্ছে। প্রতিবেদনে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ক্যামেরার সামনে হাজির করে সাধারণ কিছু প্রশ্ন করা হয় এবং তারা সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়। প্রতিবেদনে সরাসরি ওই শিক্ষার্থীদের চেহারাও দেখানো হয়।
প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে। সমাজের সচেতন মানুষ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সাংবাদিক সমাজও বিষয়টির নিন্দা জানিয়েছে, জানাচ্ছে। উঠছে সাংবাদিকতার এথিকস (নীতি-নৈতিকতা) নিয়ে প্রশ্ন। তবে কেউ কেউ এ প্রতিবেদনকে শিক্ষার বর্তমান অবস্থার প্রকৃত চিত্র বলেও উল্লেখ করেছেন।
প্রতিবেদনে জিপিএ ফাইভপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জিপিএ অর্থ, রণসংগীত জাতীয় সংগীত রচয়িতা, অপারেশন সার্চলাইট অর্থ, শহীদ মিনার কোথায় এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়। সেসবের উত্তর তারা পারেনি এবং জবাব না দিতে পারায় তাদের লজ্জা এবং আড়ষ্টভাব প্রকাশ পেয়েছে। সামাজিক গবেষকরা বলছেন, ভিডিওতে আপত্তির মূল জায়গাটা হলো, দৃশ্যত যাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে তারা সবাই কিশোর বয়সী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন বলেন, এটা একেবারেই অনুচিত। কেননা এই ধরনের রিপোর্টের আগে শিক্ষাপদ্ধতি ও নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে শিক্ষার্থীদের হয়রানি করার কোনও মানে দাঁড়ায় না। কয়েকজন শিক্ষার্থীর জানা-না জানার পরিসর দিয়ে জিপিএ ফাইভ পাওয়া সব শিক্ষার্থীর মান নির্ণয় করার বিষয়টিও পদ্ধতি হিসেবে খুবই দুর্বল।
এদিকে গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নেতিবাচকভাবে দেখানোর বিষয়ে তাদের ব্যক্তিগত মতামতও যদি নেওয়া হয় তারপরও সাংবাদিকতার নীতিমালা মানলে সেটা প্রচার করতে কিছু সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। কেননা, এ ঘটনার পর তারা ক্লাসে ও পরিবারে হেয় হবে, এর মাধ্যমে তাদের জীবনে সংকট তৈরি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিউল আলম ভুঁইয়া মনে করেন, টেলিভিশন চ্যানেলটির উচিত হবে দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিবেদনটি প্রত্যাহার করা এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
কী ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতে পারে প্রশ্নে তিনি বলেন, যে ক্ষতি হয়েছে, তা এই শিক্ষার্থীরা কিভাবে পুষিয়ে নেবে তা আমার জানা নেই।
শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ হামিদা আলী এই প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞ মতামত দিলেও তিনি জানেন না প্রতিবেদনে শিশুদের হেয় প্রতিপন্ন করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবেদক আমাকে শিক্ষার মান নিয়ে কিছু প্রশ্ন করেছেন। আমি সেগুলোর জবাব দিয়েছি। প্রতিবেদনে কিছু শিক্ষার্থীকে ফোকাস করে তাদের কী ধরনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। যদি এমনটা করা হয়ে থাকে, তাহলে দুঃখজনক। এতে ওই শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কাজ করছেন জার্মানির হাইলব্রন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসিব মাহমুদ। তিনি বলেন, ভিডিওটি অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার কারণে অনুমান করা যায় ওই শিক্ষার্থীরা এখন প্রবল মানসিক ও সামাজিক চাপের মধ্যে রয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্করা সাধারণত মানসিক চাপ নিতে সক্ষম নয় বলে তাদের বিষয়ে খবর প্রচারে আলাদা সাবধানতা আবশ্যক। প্রচণ্ড মানসিক ও সামাজিক চাপের মধ্যে পড়লে তাদের মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। আমাদের কারও এরকম কোনও পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয় যেটা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশে বাধা হিসেবে কাজ করে।
সে ক্ষেত্রে করণীয় কী হতে পারে প্রশ্নে তিনি বলেন, স্পর্শকাতর বলে ভিডিওটিতে মুখগুলো ঝাপসা করে দেওয়া যেতে পারতো। নাম পরিচয় গোপন রাখা যেত। এছাড়া ভবিষ্যতে প্রেস কাউন্সিল বা তথ্য মন্ত্রণালয় একই ধরণের বিষয়গুলো একটি নীতিমালার আওতায় আনার কথা ভাবতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই বিষয়ে মিডিয়ার জন্য সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইংল্যান্ডে ১৮ বছরের নিচে এরকম বয়সীদের ‘শারীরিক, মানসিক কল্যাণ ও সম্মান’ রক্ষার জন্য নীতিমালা রয়েছে। তবে সবচাইতে ভালো হয় মিডিয়া হাউসগুলো যেন নিজেদের উদ্যোগেই এসবের গাইডলাইন তৈরি করে সেগুলো অনুসরণ করে।
প্রতিবেদনে দুজন মেয়ে শিক্ষার্থীকে হাজির করানো এবং প্রশ্ন নিয়ে হেনস্তা করার বিষয়ে জেন্ডার বিশ্লেষক চিররঞ্জন সরকার বলেন, এমনিতেই আমাদের সমাজে নারীকে অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। আমাদের পুরো সমাজেই নারীবিরোধী উপাদানে ভরপুর। সেখানে দুটি মেয়েকে এভাবে উপস্থাপন করায় তাদের পরবর্তী জীবনকে বিষিয়ে তোলার দায় কে নেবে? তাদের মধ্যে এরপর স্টিগমা তৈরি হতে পারে। আত্মবিশ্বাসহীনতা ও দ্বিধাও তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে হেরেও লাভ বিএনপির
ইউপি নির্বাচন দলীয় হওয়ায় এতো প্রাণহানি
এজে/








