ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব সাংস্কৃতিক তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। অনেক বাধা পেরিয়ে, অনেক জটিল প্রক্রিয়া অতিক্রম করে, সময়মতো আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। একইসঙ্গে ইউনেস্কোর তালিকায় স্থান পাওয়ায় চলতি বছর বর্ষবরণের আয়োজনে এ শোভাযাত্রা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যদিও সরকারের এ ঘোষণায় কওমিপন্থী আলেমরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হেফাজতে ইসলাম ও অন্য সংগঠনগুলো ওয়াজ-মাহফিলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রার সমালোচনা করে বক্তব্য রাখছেন। আর মঙ্গল শোভাযাত্রার এ যাত্রার শুরুটা ছিল রাজধানী ঢাকার বাইরে, পথটা ছিল বন্ধুর।
১৯৮৫ সালে তখন সামরিক স্বৈরাচার ক্ষমতায়। মাহবুব জামাল শামীম, হিরণ্ময় চন্দ নামের কয়েকজন তখন মাত্র চারুকলায় পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে গেছেন যশোর-নিজের শহরে। চারুকলা শেষ করে সেখানেই গড়ে তোলেন চারুপীঠ। রঙ, পেন্সিল আর কাদামাটি দিয়ে সেখানে শিশুরা মেতে উঠলো।
সে বছরই বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি। যশোর শহরে এই তরুণদের আয়োজনে চৈত্রের শেষ রাতে আল্পনা আঁকা হতে থাকে। আর শোভাযাত্রার জন্য মাহবুব জামাল পরী ও পাখি, হিরণ্ময় তৈরি করেন বাঘের মুখোশ। পরদিন ছেলেরা পাঞ্জাবি আর মেয়েরা শাড়ি পরে সানাইয়ের সুরে, ঢাকের তালে নেচে গেয়ে প্রদক্ষিণ করে যশোর শহর, আর এর মাধ্যমে সেদিনই জন্ম হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার, এই ইতিহাস জানালেন স্বয়ং মাহবুব জামাল। বলেন, জীবনের সব রূপ-রঙ যেন ফিরিয়ে আনতে পারি, সে চেষ্টাটাই করেছিলাম তখন। তখন তার নাম ছিল বর্ষবরণ শোভাযাত্রা।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, পরের বছর শহরের অন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও যোগ দেয় চারুপীঠের এই আয়োজনের সঙ্গে, গঠিত হয় বর্ষবরণ পরিষদ। সাড়ে তিন হাজার মুখোশ, বড় হাতিসহ অন্য সব কিছু তৈরি করা হলো। এখন যে শোভাযাত্রা হয় তার আদল তৈরি হলো সেবার।
সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্বে, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। যশোরের সেই শোভাযাত্রা কী করে সমগ্র বাংলাদেশের হয়ে উঠলো জানতে চাইলে মাহবুব জামাল বলেন, ‘১৯৮৮ সালে আবার পড়াশোনার জন্য আসতে হয় চারুকলায়, সঙ্গে চারুকলার অন্য বন্ধুরা যারা সহযোদ্ধা ছিল যশোরের চারুপীঠে, মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনে।’ পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৯ সালে চারুকলার শিক্ষার্থীদের মঙ্গল শোভাযাত্রা করতে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলাম বলেন তিনি। জানালেন, শিক্ষার্থীদের আয়োজনে সেবারই প্রথম ঢাকায় হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। তারপরের বছর চারু শিল্পী সংসদ, নবীন-প্রবীণ সব চারুশিল্পী এতে অংশ নেন। ছিলেন সালেহ মাহমুদ, ফরিদুল কাদের, ফারুক এলাহী, সাখাওয়াত হোসেন, শহীদ আহমেদ। সঙ্গে যোগ দেন তরুণ ঘোষ ও সাইদুল হক জুইস, তৎকালীন ছাত্ররা। পরে যুক্ত হয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সবার অংশগ্রহণে একটি জাতীয় উৎসবের পরিকল্পনা করেন তারা। এরপর ধীরে ধীরে সেটি ছড়িয়ে পরে পুরো বাংলাদেশে।
মাহবুব জামাল বলেন, সিদ্ধান্ত হয় চারুকলার শিল্পীরা তাদের তৈরি করা মুখোশ, ভাস্কর্য নিয়ে থাকবেন শোভাযাত্রার সামনের অংশে। কিন্তু এমন একটি অনুষ্ঠান করার মতো আর্থিক সক্ষমতা তখন চারুশিল্পী সংসদের কাছে ছিল না, তখন এগিয়ে আসেন সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ফয়েজ আহমেদ। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু টাকা এনে দেন। আর সে শোভাযাত্রার পুরো পরিকল্পনা ছিল শিল্পী ইমদাদ হোসেনের। প্রথমে বৈশাখী শোভাযাত্রা নামকরণ হওয়ার কথা থাকলেও যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রা নামই চূড়ান্ত হয় বলে জানান তিনি।
সাইদুল হক জুইস প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রর পোস্টার করেছিলেন। লক্ষ্মীসরা ছিল সেই পোস্টারের প্রতিপাদ্য। মুখোশ কী করে বানাতে হয়, বিদেশ থেকে শিখে এসেছেন তরুণ ঘোষ। এভাবেই নিজেরা নিজেদের কাজ করে আর পরিচিত-বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা এনে সেই শোভাযাত্রা হয়েছিল। এরপর থেকে সেটি পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ হতে থাকলো। আর এখন যশোরের সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, দেশ বিদেশের কত-শত মানুষ বৈশাখের প্রথমদিনে চারুকলার সামনের এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন। চারুকলার শিক্ষার্থীদের রাতদিন পরিশ্রমের ফলে শোভাযাত্রায় স্থান পায় নানা মুখোশ, হাতি ঘোড়া, মা ও সন্তানসহ নানা শিল্পকর্ম।
বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এ শোভাযাত্রা বাংলাকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্ব দরবারে এ আনন্দ বোঝানোর মতো কোনও ভাষা আমার জানা নেই বলেন মাহাবুব জামাল শামীম।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম
/এমএনএইচ/
আরও পড়ুন:
স্বাগত ১৪২৪
বাধা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর এবারই প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা
সেতার-সরোদ-তবলার লহরীতে ছায়ানটের বর্ষবরণ







