X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯
দ্য ব্যাটল অব গরিবপুর

একাত্তরে যখন প্রথম বাংলাদেশে ঢোকে ভারতীয় ট্যাঙ্ক ও বিমান

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২১, ১৫:১৮

ইতিহাস বলে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্বে ডিসেম্বরের ৩ তারিখে পাকিস্তান যখন একযোগে ভারতের ১১টি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়—ঠিক তখনই ভারত ও পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তারও অন্তত ১২ দিন আগে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধবিমান নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছিল খুলনার বয়রার নিকটবর্তী গরিবপুর এলাকায়। ওটাই ‘ব্যাটল অব গরিবপুর’ নামে পরিচিত। 

মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় ২১ নভেম্বরের সেই যুদ্ধে পাকিস্তানকে পুরোপুরি পর্যুদস্ত করেছিল ভারতের ট্যাঙ্ক ও বিমানবহর। গরিবপুরের যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছিল পাকিস্তানের ১৩টি শ্যাফে ট্যাঙ্ক। ভূপাতিত হয়েছিল দুটি পাকিস্তানি স্যাবর যুদ্ধবিমান, মুক্তিবাহিনীর কমান্ডোদের হাতে যুদ্ধবন্দি হয়েছিলেন পাকিস্তানি এয়ারফোর্সের দুজন কর্মকর্তা। 

‘ব্যাটল অব গরিবপুরের’ অন্যতম প্রধান নায়ক, ভারতের তৎকালীন ৪৫ ক্যাভালরির সি স্কোয়াড্রনের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ব্রিগেডিয়ার বলরাম সিং মেহতা আজও বিশ্বাস করেন, সেদিন ভারতের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেলে গরিবপুরের যুদ্ধ জিতে তারা সটান পূর্ব পাকিস্তানের যশোর ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পারতেন অনায়াসে। 

‘কিন্তু আমাদের কাছে সেরকম কোনও নির্দেশ ছিল না। যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন আমাদের স্কোয়াড্রন কমান্ডার মেজর দলজিৎ সিং নারাং। নইলে যশোর দখল করে ১৬ ডিসেম্বরের অনেক আগেই হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানের পতনের পথ প্রশস্ত করে দিতে পারতো গরিবপুর’। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন এই বর্ষীয়ান সেনানী। 

গরিবপুরের ওই এলাকার তিন দিকেই ভারতীয় ভূখণ্ড। সেই অবস্থানের সুযোগ নিয়ে গরিবপুর থেকে ভারতীয় এলাকায় ও মুক্তিবাহিনীর শিবিরগুলোতে গোলাবর্ষণ করছিল পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক ও যুদ্ধবিমান। 

এরপরই ভারতীয় বাহিনী ঠিক করে, মুক্তিবাহিনীর সাহায্য নিয়ে পাল্টা অভিযান চালানো হবে গরিবপুর ফ্রন্ট দিয়েই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর তখনও আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু ঘোষণার প্রায় দুই সপ্তাহ বাকি।

 

গরিবপুরে কী হয়েছিল ১৯৭১-এর ২১ নভেম্বরে?

ওই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছেন কিংবা পরে তা নিয়ে লিখেছেন, গবেষণা করেছেন—এমন তিন জন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বাংলা ট্রিবিউন। তারা জানিয়েছেন ওই ঐতিহাসিক যুদ্ধ নিয়ে নানা অজানা কথা।  

যুদ্ধে নিহত মেজর দলজিৎ সিং নারাং, কর্নেল সিধুর ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে

ব্রিগেডিয়ার বলরাম সিং মেহতা

‘আমি তখন ৪৫ ক্যাভালরির স্কোয়াড্রনের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। আমাদের বহরে ছিল রাশিয়ান পিটি-৭৬ ট্যাঙ্ক। ১৪ পাঞ্জাব ব্যাটেলিয়নের সঙ্গে মিলে ২০ নভেম্বর রাতেই আমরা কাবাডাক নদী পেরিয়ে রাতের আঁধার ও ঘন কুয়াশার আড়াল নিয়ে গরিবপুরের সীমানায় ঢুকে পড়ি। তখন যুদ্ধ শুরু হবে হবে করছে। কথাবার্তা হচ্ছে কানে আসছে। কিন্তু শুরু হয়নি। আমরাই প্রথম ভারতীয় সেনাবহর, যারা আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়েছিল। 

ব্রিগেডিয়ার বলরাম সিং মেহতা

২১ তারিখ ভোরের আলো ফোটার একটু পর আমাদের ট্যাঙ্কগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক বহরের মুখোমুখি যুদ্ধ শুরু হয়। ওদের সঙ্গে ছিল ১৪টা মার্কিন শ্যাফে ট্যাঙ্ক। যুদ্ধের প্রায় শুরুতেই পাকিস্তানি গোলায় প্রাণ হারান আমাদের স্কোয়াড্রনের কমান্ডার, মেজর দলজিৎ সিং নারাং। ফলে তখন যুদ্ধ পরিচালনার ভার এসে পড়ে আমার ওপর।  

ঠিক তখনই আমার ট্যাঙ্কের কামানও গণ্ডগোল করতে শুরু করে। ওদিকে তিন-তিনটে পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক আমাদের ঘিরে ফেলে। প্রায় অলৌকিকভাবে আমরা তিনটি ট্যাঙ্ককেই ধরাশায়ী করতে সফল হই। একটা পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক থেকে ওদের গানার (গোলন্দাজ) যখন ছিটকে বেরিয়ে আসছেন, আমার ট্যাঙ্কের গানার তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে গেলে আমি নিরস্ত করি। পরে তাকে যুদ্ধবন্দি করে আমরা যখন চা-বিস্কুট খাওয়াচ্ছি, তিনি তখনও ধন্যবাদ জানিয়ে যাচ্ছেন। 

আমার ‘বার্নিং শ্যাফিস’ বইতে আমি বিশদে লিখেছি কীভাবে গরিবপুরের যুদ্ধে আমরা জিতেছিলাম। আমি এখনও বিশ্বাস করি, গরিবপুরের সাফল্যের পর আমাদের যদি সোজা যশোর অবধি যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো, তাহলে যুদ্ধ হয়তো সেদিনই শেষ হয়ে যেত।’

 

কর্নেল টি এস সিধু  

আমি তখন ছিলাম ৪৫ ক্যাভালরির সি স্কোয়াড্রনের অন্যতম ট্রুপ লিডার। গরিবপুরের যুদ্ধে আমার দুটো পা-ই মারাত্মক জখম হয়েছিল। পরে ভাগ্যক্রমে পা দুটো কেটে বাদ দেওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাই। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার আঘাতটা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং ওই যুদ্ধে ভারত ও মুক্তিবাহিনীর অভাবনীয় সাফল্যই ছিল বিরাট ব্যাপার। 

পৃথিবীর সামরিক ইতিহাসে এমন নজির আর একটিও নেই—যেখানে দুপক্ষের ১৪টা করে ট্যাঙ্ক মুখোমুখি লড়াই লড়েছে, আর এক পক্ষের সব ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়েছে, অথচ অন্য পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বললেই চলে। গরিবপুরের যুদ্ধে পাকিস্তানের ঠিক সেই শোচনীয় দশাই হয়েছিল। আমাদের শুধু দুটো ট্যাঙ্কের সামান্য ক্ষতি হয়েছিল। 

ওই যুদ্ধের সময়ই পাকিস্তানি ট্যাঙ্কের গোলা আমাদের ট্যাঙ্কে আছড়ে পড়লে আমার গানার প্রাণ হারান। আমি ও অন্যরা ছিটকে বাইরে এসে হামাগুড়ি দিয়ে নিজেদের পজিশনের দিকে যেতে শুরু করি। পকেটে একটা সাদা রুমাল ছিল, সেটা নাড়তে থাকি হামাগুড়ি দিতে দিতেই—যাতে আমাদের ইনফ্যান্ট্রি ভুল করে আমাদের ওপর গুলি চালিয়ে না বসে, কিন্তু এরইমধ্যে প্রায় শ’দুয়েক স্প্লিন্টার আমার পায়ে ঢুকে যায়, অসম্ভব যন্ত্রণা সয়েই চলতে থাকি। তবু শেষ পর্যন্ত যে আমরা ওই যুদ্ধে জিতেছিলাম, ভাবলে আজও রোমাঞ্চিত হই। 

গরিবপুর লড়াইয়ের পর ট্যাঙ্কের ওপর ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম, ছবি ব্রিগেডিয়ার মেহটার সংগ্রহ থেকে

মেজর জেনারেল অমৃত পাল সিং

গরিবপুরের যুদ্ধে লড়ার সৌভাগ্য না হলেও এই অবিস্মরণীয় লড়াই নিয়ে আমি পরে অনেক পড়াশোনা করেছি। গরিবপুরের যুদ্ধ যেমন মাটিতে লড়া হয়েছিল, তেমনি লড়া হয়েছিল আকাশেও। সেই প্রথম আকাশযুদ্ধে ভূপাতিত হয়েছিল পাকিস্তানের স্যাবর যুদ্ধবিমান। নিচে মাটি থেকে সেই দৃশ্য দেখে উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনার শত শত সদস্য, স্থানীয় গ্রামবাসী।

পাকিস্তানের মোট চারটি যুদ্ধবিমান সেদিন ভূপাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, অন্যদিকে ভারতীয় এয়ারফোর্সের একটি যুদ্ধবিমানেও আঁচড় লাগেনি। এই বিরাট ধাক্কাটা লেগেছিল বলেই বোধহয় পুরো যুদ্ধের সময়টা ওই সেক্টরে পাকিস্তান একবারও আর কোনও এয়ারক্র্যাফট ব্যবহার করেনি।  

ভূপাতিত পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান থেকে ‘বেইল আউট’ করে বেরিয়ে আসা দুজন পাইলট যুদ্ধবন্দি হয়েছিলেন মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের হাতে। তাদেরই একজন পারভেজ মেহদি কুরেশি সে ঘটনার প্রায় পঁচিশ বছর বাদে ১৯৯৬ সালে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর প্রধানও হয়েছিলেন। 

১৯৯৬ সালে এয়ার মার্শাল কুরেশি যখন পাকিস্তানি এয়ারফোর্সের প্রধান, তখন ভারতীয় বিমান বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন ডোনাল্ড ল্যাজারাস তাকে একটা অভিনন্দনসূচক চিঠি লিখে জানান, ‘আমাদের এর আগে একবারই দেখা হয়েছিল—সেটা কমব্যাট সিচুয়েশনে (যুদ্ধাবস্থায়), আর গরিবপুরের আকাশে’! অপ্রত্যাশিতভাবে সেই চিঠির উত্তরও এসেছিল। এয়ার মার্শাল কুরেশি জবাবে লিখেছিলেন, ‘ভারতীয় বাহিনীর সেই অসাধারণ ফাইটের কথা আজও আমার মনে আছে।’ 

 

বলিউডে গরিবপুর

গত বছর বলিউডও ‘ব্যাটল অব গরিবপুর’কে সেলুলয়েডে চিত্রায়িত করার কথা ঘোষণা করেছে। ঐতিহাসিক এই প্রকল্পে হাত মিলিয়েছেন দুজন বিখ্যাত প্রযোজক—রনি স্ক্রুওয়ালা আর সিদ্ধার্থ রায় কাপুর। ‘পিপ্পা’ নামের ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা মাস কয়েকের মধ্যেই।

ব্রিগেডিয়ার বলরাম সিং মেহতার লেখা ‘বার্নিং শ্যাফিস’ বইটির অনুসরণেই গাঁথা হচ্ছে ফিল্মের কাহিনি। আর ছবিতে বলরাম সিংয়ের ভূমিকায় অভিনয় করবেন ঈশান খাত্তার। ‘ধড়ক’ ও ‘আ স্যুটেবল বয়ে’র সুবাদে যে যুবক এখন পরিচিত নাম। 

ছবির নাম ‘পিপ্পা’ কেন? রাশিয়ার তৈরি যে পিটি ৭৬ ট্যাঙ্কের হাতে পাকিস্তান সেদিন গরিবপুরের রণাঙ্গনে পর্যুদস্ত হয়েছিল, সেই ট্যাঙ্কগুলোকে ভারতীয় সেনারা আদর করে ‘পিপ্পা’ নামেই ডাকতেন যে!

/এফএ/এমওএফ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ব্রিটেনের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর পদত্যাগ, চাপে বরিস জনসন
ব্রিটেনের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর পদত্যাগ, চাপে বরিস জনসন
পারিবারিক সহিংসতায় বেড়েছে মাদকসেবন ও আত্মহত্যার প্রবণতা: ফ্লাড
পারিবারিক সহিংসতায় বেড়েছে মাদকসেবন ও আত্মহত্যার প্রবণতা: ফ্লাড
বন্যাকবলিত মানুষের পাশে আমিরাত প্রবাসীরা
বন্যাকবলিত মানুষের পাশে আমিরাত প্রবাসীরা
ভিজিএফের চালে পাথর, সুবিধাভোগীদের মাঝে ক্ষোভ
ভিজিএফের চালে পাথর, সুবিধাভোগীদের মাঝে ক্ষোভ
এ বিভাগের সর্বশেষ