কিছুটা নীরবে আর সন্তর্পণেই যেন গত বুধবার (১০ মে) রাখাইনের সিতওয়েতে ভারত ও মিয়ানমারের যৌথ প্রচেষ্টায় চালু হয়ে গেল নতুন বন্দর ও টার্মিনাল। বহু বছর বাদে সেদিন কলকাতা থেকে সিতওয়ে পণ্য চলাচল আবার শুরু হলো, একযোগে যার উদ্বোধন করলেন ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল ও মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাডমিরাল তিন অং সান। কলকাতা থেকে রওনা হয়ে একটি কার্গো জাহাজ সেদিনই সিতওয়ে গিয়ে পৌঁছাল, যাকে স্বাগত জানান দুই দেশের দুই মন্ত্রী।
সদ্য চালু হওয়া সিতওয়ে পোর্ট টার্মিনাল
সিতওয়েতে নতুন পোর্ট টার্মিনালকে ভারত ও মিয়ানমারের সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে সংগত কারণেই। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ওই অঞ্চলের আরেকটি দেশ বাংলাদেশের জন্যও এই পদক্ষেপের গুরুত্ব কম নয়। তাদের মতে, আঞ্চলিক কানেকটিভিটি বা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন–নানা ইস্যুতেই প্রভাব ফেলতে পারে নতুন বন্দরটি।
সিতওয়ে হলো মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রাজধানী, যেখান থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে। কালাদান, মায়ু ও লে ম্রো নদীর মোহনায়, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই সিতওয়ে এককালে সমৃদ্ধ বন্দরনগরী হলেও, ক্রমেই তার গুরুত্ব হারিয়েছে। বড় বড় জাহাজ বহুকালই আর সিতওয়ে বন্দরে ভিড়তো না, আর কয়েক শ কিলোমিটার উত্তরে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সঙ্গে সিতওয়ের তো কোনও তুলনাই চলে না।
অথচ উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে বিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কলকাতা থেকে আকিয়াব (সিতওয়ের পুরনো নাম) পর্যন্ত বড় বড় জাহাজ চলাচল করতো। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির সেই সার্ভিসও বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় সত্তর-আশি বছর হলো।
অটলবিহারী বাজপেয়ি যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন এই বন্দরটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি মিয়ানমার সরকারকে প্রস্তাব দেন। তাতে সাড়া মিললে ২০০৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ‘রাইটস’ সিতওয়ের ওপর একটি সমীক্ষা করে। তারও প্রায় ২০ বছর বাদে ভারতের অর্থায়নে অবশেষে সিতওয়ে বন্দর আবার নতুন করে আলোর দেখা মিললো।
কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্টের রুট
ভারতের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদ ভিল্লুর এস শেষাদ্রি দীর্ঘদিন মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মনে করেন, রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ করে তুলতে নতুন এই বন্দরটি বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। বন্দর পুরোদমে চালু হলে যথারীতি বাণিজ্য বাড়বে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে এবং তাতে রাখাইনের ভূমিপুত্রদের ফিরিয়ে আনার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়বে বলেও তিনি আশাবাদী।
এস শেষাদ্রি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘খুব সম্প্রতি আমরা দেখেছি বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারা গিয়ে রাখাইনে ফেরার মতো পরিবেশ আছে কি না, সেটা নিজের চোখে দেখে এসেছে। এখন সিতওয়েতে নতুন বন্দর ও তার সূত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ হলে হয়তো তারা নিজ দেশে ফেরার মতো ভরসা পাবে। আর এটা যেহেতু ভারতের তৈরি প্রকল্প, সেখানে ভারতের অনুরোধও মিয়ানমার খুব সহজে ফেলতে পারবে না।’
বস্তুত বাংলাদেশের মতো ভারতেরও ঘোষিত অবস্থান হলো, মিয়ানমারকেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। রোহিঙ্গারা ফিরে এলে যাতে উন্নত মানের আবাসনে থাকতে পারে, এ জন্য ভারত নিজের খরচে উত্তর রাখাইনে শত শত বাড়িও বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি বলে আজও সেসব বাড়িঘর খালিই পড়ে আছে। এখন সিতওয়ে বন্দর চালু হওয়ার পর রোহিঙ্গারা সেসব বাড়িঘরে এসে থাকতে পারবে, এটা দিল্লিরও প্রত্যাশা।
সিতওয়ে বন্দরের আরেকটা বড় দিক হলো, এটি ভারতের ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টে’রও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কানেকটিভিটি যখন অনিশ্চয়তায় মোড়া ছিল, তখন এই কালাদান প্রজেক্টটিকে ভারত খুবই গুরুত্ব দিচ্ছিল।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেই প্রয়োজন হয়তো অনেকটাই মিটেছে, তারপরও কালাদান প্রজেক্টের গুরুত্ব ভারতের কাছে একটি বিকল্প রুট হিসেবে থেকেই গেছে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের (উত্তর-পূর্বের সঙ্গে) যে কানেকটিভিটি, তার গেটওয়ে (প্রবেশপথ) যদি চট্টগ্রাম বন্দর হয়, তাহলে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে যে কানেকটিভিটি, তার গেটওয়ে হবে এই সিতওয়ে। বিশেষ করে মিজোরাম আর ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলো এই সিতওয়ের মাধ্যমে উপকৃত হবে।
সিতওয়ে শহরের বাজারের একটি দৃশ্য
আঞ্চলিক কানেকটিভিটির বিশেষজ্ঞ প্রবীর দে বলছিলেন, ‘কালাদান প্রজেক্টে মিয়ানমারের ভেতরে পালেতোওয়া থেকে জোরিনোওরি পর্যন্ত ১০৯ কিলোমিটার ডাবল লেন মহাসড়ক এখনও ভারত বানিয়ে উঠতে পারেনি। সেই কাজ শেষ হলে তবেই সিতওয়ে বন্দরের ফায়দা ভারত পুরোপুরি তুলতে পারবে। আর সেই কাজ শেষ হলে সিতওয়ে কিন্তু চট্টগ্রামের সঙ্গেও পাল্লা দেওয়ার মতো জায়গায় চলে আসবে।’
ফলে সিতওয়ের নতুন পোর্ট টার্মিনাল বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন আশার খবর, তেমনি আবার আগামী দিনে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতারও।







