X
সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪
৯ বৈশাখ ১৪৩১

বাংলাদেশে কথিত ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণা নিয়ে যা ভাবছে দিল্লি

রঞ্জন বসু, দিল্লি
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২৩:৫৯আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:০৪

মাসখানেক ধরে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলের একটি অংশে তথাকথিত ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণা চলছে। সেখানে তারা ভারতীয় পণ্য বয়কট করার ডাক দেওয়াসহ নানাভাবে ভারতবিরোধিতার কথা বলছেন। এই প্রচারণা নিয়ে বাংলাদেশে যেমন, সীমান্তের অন্য পারে ভারতেও এই মুহূর্তে চলছে আলোচনা।

প্রতিবেশী ভারত সঙ্গত কারণেই এই প্রচারণার দিকে সতর্ক নজর রাখছে। দিল্লি মনে করছে, এখনও এই প্রচারণা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধী দল বিএনপি এই প্রচারণা থেকে যতই প্রকাশ্যে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করুক, ভারত এটাও বিশ্বাস করে, প্রচারণার নেপথ্যে বিএনপি-জামায়াতেরই প্রচ্ছন্ন ও সক্রিয় মদত আছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত এখনও বাংলাদেশে ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণা নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। তবে দিনকয়েক আগে মুম্বাইয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে যখন তাকে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি হাসতে হাসতে জবাব দেন, ‘মিডিয়ায় আপনারা যা দেখবেন, তার সবটা বিশ্বাস করার দরকার নেই!’

জয়শঙ্করের কথা থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, দিল্লি এই প্রচারণাকে তেমন একটা গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। তবে একই অনুষ্ঠানে তাকে যখন মালদ্বীপের ‘ইন্ডিয়া আউট’ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি সেটা হেসে উড়িয়ে দেননি। বরং বলেছিলেন, ‘দিনশেষে প্রতিবেশীদের পরস্পরকে প্রয়োজন হবেই। ইতিহাস আর ভূগোল আসলে খুব শক্তিশালী ফোর্স, সেটা থেকে আমাদের পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই!’

আর ঠিক সেই ‘ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের’ কারণেই বাংলাদেশে তথাকথিত ইন্ডিয়া আউট কখনও সফল হতে পারবে না বলেই ভারতের দৃঢ় বিশ্বাস।

দিল্লিতে শীর্ষস্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে এই প্রচার যে একশ্রেণির লোকজন করছেন, সেটাকে বড়জোর চায়ের কাপে তুফান (‘স্টর্ম ইন আ টি কাপ’) বলা যেতে পারে, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়! এটা কিছু দিন পর আপনা-আপনি থিতু হয়ে যাবে!’

ভারত কেন এটা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সুরে কথা বলছে, তার কিছু নির্দিষ্ট কারণও আছে। প্রথমত, ওই প্রচারণায় ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক দেওয়া হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা কমার কোনও লক্ষণই নেই। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ এবং বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের আমদানিও প্রায় প্রতি মাসেই নতুন রেকর্ড গড়েছে। সামনেই শুরু হচ্ছে রমজান মাস। তার আগে ভারত থেকে পেঁয়াজ, আদা, এমনকি ভোজ্যতেল আমদানির চাহিদাও যথারীতি আকাশ ছুঁয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর সে দেশের যে লাখ লাখ নাগরিক চিকিৎসা, পর্যটন বা নিছক কেনাকাটার জন্য ভারতে আসেন, সেই সংখ্যাতেও কোনও ভাটার টান নেই। বস্তুত, বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনগুলোয় ভিসার আবেদনের সংখ্যা কোভিডের পর থেকে প্রতি বছরই নতুন রেকর্ড গড়ছে।

দিল্লিতে ওই কর্মকর্তা বলছিলেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ জানেন ভারতের মতো এত কম খরচে উন্নত মানের স্বাস্থ্য পরিষেবা, অল্প পয়সায় এত সুন্দর সব জায়গায় বেড়ানোর সুযোগ এবং নানান রকম পণ্য কেনাকাটার সুযোগ তারা দুনিয়ার আর কোথাও পাবেন না। তাছাড়া আমাদের ভাষা বা খাদ্যাভ্যাসগত সাংস্কৃতিক মিল তো ছেড়েই দিলাম!

তবে বাংলা ট্রিবিউন এটাও জানতে পেরেছে, বাংলাদেশে যেসব অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে তথাকথিত ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণা চালাচ্ছেন, ভারত তাদের স্যোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলোর ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ডেস্কের এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, যারা ভারতকে বয়কট করার ডাক দিচ্ছেন, সেটা অবশ্যই তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু কাকে আমরা ভিসা দেবো বা কাকে দেবো না সেটাও আমাদের অধিকার। ইন্ডিয়া আউটের ডাক দিয়ে কেউ নিজের বা প্রিয়জনের চিকিৎসার জন্য সেই ভারতেই যেতে চাইবেন, এটাও তো মেনে নেওয়া যায় না।

এই প্রচারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা তাদের নিকটাত্মীয়রা ভারতীয় ভিসার আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যাত হবে, সেই শঙ্কাও খুব বেশি বলে জানান তিনি।

ভারতের আরেকটা পর্যবেক্ষণ হলো, এই প্রচারণা মূলত পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশের বাইরে থেকে এবং সে দেশের অভ্যন্তরে এটার তেমন কোনও জনভিত্তিও নেই। কাজেই এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ খুবই দুর্বল।

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির ঘনিষ্ঠ ফরেন পলিসি এক্সপার্ট শুভ্রকমল দত্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যতদূর জানতে পেরেছি, এই প্রচারণার মাথা হলেন লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা বিএনপি নেতা তারেক রহমান ও তার জামায়াতের বন্ধুরা। আর ফ্রান্স, সুইডেন বা মালয়েশিয়ায় থাকা হাতেগোনা কয়েকজন ভারতবিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট তাতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন। কিন্তু এভাবে কি আর কোনও আন্দোলন দানা বাঁধতে পারে?

ড. দত্তর অভিমত, বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলামে থাকা এসব অ্যাক্টিভিস্ট বাংলাদেশের বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত নন বলেই এই ধরনের আজগুবি স্লোগান দিচ্ছেন। তাদের তো আর ভারতের পেঁয়াজ কিনে খেতে হয় না বা জরুরি কোনও অপারেশনের জন্য চেন্নাই ছুটতে হয় না। তাই তারা এসব বলেও পার পেয়ে যেতে পারেন, বলছিলেন তিনি।

এদিকে বিএনপি প্রকাশ্যে অন্তত দাবি করছে, এই প্রচারণার সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। ফলে বাংলাদেশে হাতে গোনা যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ‘ইন্ডিয়া আউট’র স্লোগান নিয়ে রাজপথে নেমেছে, সেগুলো হলো ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদ কিংবা জামায়াতে ইসলামী ভেঙে তৈরি হওয়া ‘আমার বাংলাদেশ’ পার্টি। এগুলোর কোনোটিরই একজন এমপি তো দূরে থাক, সামান্যতম কোনও জনভিত্তিও নেই।

এ কারণেই মালদ্বীপে যেভাবে ‘ইন্ডিয়া আউট’ একটা সময়ে সাড়া ফেলতে পেরেছিল, বাংলাদেশে অন্তত তার পুনরাবৃত্তির কোনও শঙ্কা দেখছে না দিল্লি।

বস্তুত গত বছরের শেষ দিকে ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের যে নির্বাচনে জিতে প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুইজু ক্ষমতায় এসেছেন, সেই ভোটে তার দলের প্রধান ইস্যুই ছিল ‘ইন্ডিয়া আউট’। মালদ্বীপের ওপর থেকে ভারতের প্রভাব খর্ব করার (দেশটিকে চীনের ঘনিষ্ঠ বলয়ে নিয়ে যাওয়া) প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি এবং তার অভিঘাত এখন দিল্লি ও মালের মধ্যকার তিক্ত কূটনৈতিক সম্পর্কেও চোখে পড়ছে।

গত ১৫ জানুয়ারি ‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইমস’ পত্রিকায় কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও ‘দ্য হংকং ফ্রি প্রেসে’র সাবেক সাংবাদিক জেনিফার হিকস এক নিবন্ধে জানান, বাংলাদেশেও মালদ্বীপের মতো ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণায় উসকানি দেওয়া হচ্ছে মূলত বিরোধী দল বিএনপির তরফ থেকে। এই পুরো ক্যাম্পেইনটা পরিচালিত হচ্ছে লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমানের নির্দেশে।

জেনিফার হিকস তখন বলেছিলেন, তারেক রহমানই তার দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন মালদ্বীপের অনুকরণে ভারতবিরোধী প্রচারণা চালাতে এবং ‘ভারত বাংলাদেশের বন্ধু নয়’ কিংবা ‘ভারতই ধ্বংস করছে বাংলাদেশকে’—এই জাতীয় স্লোগান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত পোস্ট করতে। তাদের পোস্টে ‘হ্যাশট্যাগ ইন্ডিয়া আউট’ও আজকাল ঘন ঘন ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিএনপির এসব অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারতের আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী নেপালেও এই ধরনের ভারতবিরোধী সাইবার প্রচারণা চালাচ্ছে বলে ওই নিবন্ধে বলা হয়েছিল।

১৮ জানুয়ারি রাতে ভারতের জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক পালকি শর্মা উপাধ্যায়ও তার নিজস্ব সিগনেচার প্রোগ্রাম ‘ভান্টেজ’-এ এই প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

ভারতের জাতীয় স্তরের শীর্ষস্থানীয় টিভি চ্যানেল সিএনএন-আইবিএনে প্রাইম টাইমে প্রচারিত সেই অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধী দল বিএনপি ও লন্ডন প্রবাসী ‘পলাতক নেতা’ তারেক রহমানের মদতে সেখানে জোরেশোরে ভারতবিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশে ও বাংলাদেশের বাইরে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করেই সুকৌশলে ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন পালকি শর্মা।

‘ভান্টেজ’ অনুষ্ঠানের শেষ বক্তব্যটিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে তারা বলেছে, ইন্ডিয়া আউট একটি (বিশেষ দলের) মরিয়া রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কখনোই মালদ্বীপ নয়। তারা একটি ১৭ কোটি মানুষের শক্তিশালী দেশ এবং বাংলাদেশের বড় প্রতিবেশীও কখনোই তাদের ওপর হস্তক্ষেপ করতে যাবে না।

ফলে দিল্লির এটাই বিশ্বাস যে মালদ্বীপ আর বাংলাদেশ এক নয়, দুই দেশের পরিস্থিতির মধ্যেও কোনও তুলনা হয় না। মালদ্বীপে যা-ই ঘটে থাকুক, বাংলাদেশে অন্তত তার পুনরাবৃত্তির কোনও সম্ভাবনা নেই।

/এনএআর/এমওএফ/
সম্পর্কিত
প্রথমবার পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে ভারতের নারী ট্রাকচালক
তিস্তাসহ ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবিতে বাসদের তিন দিনের রোডমার্চ
জনগণ এনডিএ জোটকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছে: মোদি
সর্বশেষ খবর
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে অটোরিকশাচালককে হত্যা: দুজনের মৃত্যুদণ্ড
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে অটোরিকশাচালককে হত্যা: দুজনের মৃত্যুদণ্ড
সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরাক থেকে রকেট নিক্ষেপ
সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরাক থেকে রকেট নিক্ষেপ
টিভিতে আজকের খেলা (২২ এপ্রিল, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (২২ এপ্রিল, ২০২৪)
তীব্র গরমে ঝরছে আমের গুটি, উৎপাদন নিয়ে চাষিদের শঙ্কা
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগানতীব্র গরমে ঝরছে আমের গুটি, উৎপাদন নিয়ে চাষিদের শঙ্কা
সর্বাধিক পঠিত
দারুল ইহসানের বৈধ সনদধারীদের এমপিওতে বাধা নেই
দারুল ইহসানের বৈধ সনদধারীদের এমপিওতে বাধা নেই
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস
আজকের আবহাওয়া: ৩ বিভাগে বৃষ্টির আভাস
ইউরোপে মানবপাচারের নতুন রুট নেপাল
ইউরোপে মানবপাচারের নতুন রুট নেপাল
১২ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে: থাকবে কতদিন?
১২ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে: থাকবে কতদিন?
যশোরে তীব্র গরমে গলে যাচ্ছে সড়কের বিটুমিন
যশোরে তীব্র গরমে গলে যাচ্ছে সড়কের বিটুমিন