বিদেশে কর্মী যাওয়া কমছে, ধাক্কা আসতে পারে রেমিট্যান্সে

সাদ্দিফ অভি
০৯ জুন ২০২৬, ২৩:৫৯আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ২৩:৫৯

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অশান্ত পরিস্থিতিতে কর্মী যাওয়া বন্ধ হয়নি। কিন্তু যাচ্ছে কম গতিতে। অপরদিকে প্রবাসী কর্মীদের একটি বড় অংশ অবস্থান করছেন মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানে অনেকেরই আয় রোজগার কমে গেছে কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কর্মী যাওয়ার তুলনায় সেভাবে রেমিট্যান্স পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এছাড়া বিদেশে সীমিত সংখ্যক শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত থাকার প্রভাবও পড়েছে অভিবাসন খাতে। সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে রেমিট্যান্সের ওপর একটা বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্টরা।

পরিসংখ্যান কী বলছে

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ২৩ হাজার ৪৯৬ কর্মী বিদেশ যেতে ক্লিয়ারেন্স নিয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ জন। কিন্তু মাসের হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের প্রথম ৫ মাসে কর্মী গেছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৭২৯ জন এবং চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে কর্মী গেছে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৬২ জন। 

বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শ্রমিক যান সৌদি আরবে। ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় সাত লাখ ৫২ হাজার গেছেন শুধু সৌদি আরবে। এর বাইরে কাতারে যান এক লাখ ৬৯ হাজার, কুয়েতে যান ৪২ হাজার ৪৯৬ জন।

অন্যদিকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ জুন পর্যন্ত বিদেশে গেছেন তিন লাখ ১৪ হাজার ৩৬২ জন বাংলাদেশি কর্মী। এর মধ্যে সৌদি আরব গেছেন এক লাখ ৯০ হাজার ৭২ জন, কাতারে গেছেন ২৩ হাজার ৭৮০ জন, কুয়েতে আট হাজার ৭৫৩ জন, জর্ডানে সাত হাজার ৩৫৩ জন, আরব আমিরাতে সাত হাজার ১২১ জন এবং ইরাকে তিন হাজার ৯১ জন। এ থেকেই বেরিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার তুলনামূলক চিত্র।

এর আগের বছরগুলোতে অর্থাৎ করোনার পর ২০২২ সালে মোট ১১ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৮ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন। এর মাঝে সৌদি আরব ছিল সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার, যেখানে গেছেন তিন লাখ ৯১ হাজার ৩০২ জন কর্মী। ওমানে একলাখ ৬৩ হাজার ২১ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ৭৭ হাজার ৪৭৬ জন, কুয়েতে ২৯ হাজার ৯ জন এবং কাতারে ২৭ হাজার ৬৬৩ জন।

২০২৩ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। সরকারি হিসাবে ১৩ লাখ পাঁচ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী বিদেশে যান। এর মধ্যে সৌদি আরবে চার লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৪ জন, ওমানে এক লাখ ২৭ হাজার ৮৮৩ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯৮ হাজার ৪২২ জন, কাতারে ৫৬ হাজার ১৪৮ জন, কুয়েতে ৩৬ হাজার ৫৪৮ জন, জর্ডানে আট হাজার ৬২৬ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।

২০২৪ সালে মোট ১০ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ জন শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন ৬  লাখ ২৭ হাজার ৮১২ জন, কাতারে ৭৪ হাজার ৪৬৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ৪৭ হাজার ১৫৮ জন, কুয়েতে ৩৩ হাজার ১৫ জন, জর্ডানে ১৫ হাজার ৪১০ জন এবং লেবাননে চার হাজার ২৩০ জন।

পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা

গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) বলছে, যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের বহুল আলোচিত ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নিওম সিটি, রেড সি টুরিজম ডেভেলপমেন্ট ও কিদ্দিয়া এন্টারটেইনমেন্ট সিটির মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেলে কিংবা অবকাঠামোগত ক্ষতি হলে এসব প্রকল্পে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে চলে এসেছে। ফলে দেশটি ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে আমিরাতে অবস্থানরত প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রামরু আরও জানায়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অভিবাসী কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে। ফ্লাইট ও চলাচল সংকটে কর্মী পাঠানো বিলম্বিত বা বাতিল হচ্ছে। এতে নিয়োগ ব্যয় ও অর্থ ফেরত নিয়ে এজেন্ট ও বিদেশগামী কর্মীদের মধ্যে বিরোধ বাড়ছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকীর্ণ শ্রমবাজার, নতুন বাজার খোঁজার পরামর্শ

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে অভিবাসন করেছেন। তবে এর ৯০ শতাংশই গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। ১৪টি দেশে গেছেন মোট অভিবাসীর ৮ শতাংশ। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর দেওয়া তথ্যমতে, গত ১২ বছরে বন্ধ হয়েছে বেশ কয়েকটি বড় শ্রমবাজার। বাংলাদেশ থেকে ওমান, বাহরাইন, ইরাক, লিবিয়া, সুদান, মালয়েশিয়া, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাইয়ে শ্রমিক রফতানি স্থগিত রয়েছে। এর বাইরে ইতালির শ্রমবাজারে ওয়ার্ক পারমিট যাচাইয়ের কাজে ধীরগতি চলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ভিসা ইস্যু বন্ধের কারণে কর্মী যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। লিবিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মী যাওয়া শুরু হয়নি। এছাড়া মরিশাস বাংলাদেশিদের খুব কম সংখ্যক ভিসা দিচ্ছে। যদিও সম্প্রতি মরিশাস নতুন চুক্তি করে কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, যেসব দেশে বর্তমানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ বা সীমিত রয়েছে, সেসব দেশের শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত ও সম্প্রসারণের জন্য মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের সঙ্গে সরকারের কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলমান রয়েছে। 

রেমিট্যান্সে কেমন  প্রভাব পড়তে পারে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৩.১৩ বিলিয়ন ডলার। এর আগের মাস মার্চে তা ছিল রেকর্ড ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলার, যা মূলত ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের বাড়তি অর্থ পাঠানোর প্রভাব হিসাবে দেখা হচ্ছে। এরও আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ৩.০২ বিলিয়ন ডলার, জানুয়ারিতে ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার এবং ডিসেম্বরে ৩.২২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে পাঁচ মাস রেমিট্যান্স তিন বিলিয়ন ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। তবে ঈদের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. জালাল উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘‘যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রেমিট্যান্সে এর প্রভাব পড়বে। তাই এখনই পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশ্বে অনেক শ্রমবাজার থাকলেও দেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারলে সেগুলো ধরা সম্ভব হবে না। মধ্য এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকার সঙ্গে সরকারি চুক্তি করতে হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চল জিসিসি’র ওপর নির্ভর ৬০ শতাংশ নিচে নামিয়ে আনতে হবে। আমরা যদি স্ট্যাটিস্টিক্যালি ভাষাটাকে  কাউন্ট করি, ইংলিশের পাশাপাশি আরবি, রুশ এবং জার্মানকে—তাহলে হিসাব করে দেখেছি, টোটাল ২৭টি দেশে মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কাররা শুধু ভাষার কারণে কাজ পাবে। সরকারকে এটা চিন্তা করতে হবে যে এগুলোকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়।’’

শ্রম এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে শ্রমবাজার স্থিতিশীল করতে কাজ করছে সরকার। মালয়েশিয়া, জাপানসহ অন্যান্য শ্রমবাজার আবার সচল করার চেষ্টা চলছে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষার মতো কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ‘‘সরকার কত লাখ কর্মী পাঠালো, সেই হিসাব বন্ধ করে তারা কতটুকু দক্ষ এবং কতটুকু রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছে, সেই হিসাব করতে হবে। আমাদের সামনে আগামী ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা সুবর্ণ সময় রয়েছে, এরপর আমাদের জনসংখ্যা প্রবীণ হতে শুরু করবে। তাই শিক্ষা ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের মতো নতুন পুনর্গঠন বাজারে কর্মী পাঠানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।’’

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
‘বিদেশের শ্রমবাজার হারানোর উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’
রাশিয়ায় এক লাখ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা
আগামী অর্থবছরে ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠাতে চায় সরকার
সর্বশেষ খবর
ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ
ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ
তামিমের বোর্ডে ফাহিম সিনহা বিপিএলের গভর্নিং বডিতে, অন্যরা যে দায়িত্বে
তামিমের বোর্ডে ফাহিম সিনহা বিপিএলের গভর্নিং বডিতে, অন্যরা যে দায়িত্বে
পল্টনে স্টেডিয়ামে উড়ছে ৬ দেশের পতাকা
পল্টনে স্টেডিয়ামে উড়ছে ৬ দেশের পতাকা
দেশে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হচ্ছে আজ
দেশে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হচ্ছে আজ
সর্বাধিক পঠিত
বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম
বাড়তে পারে যেসব পণ্যের দাম
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
‘শর্ত মানলে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা’
‘শর্ত মানলে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা’
ঋতুপর্ণার বাড়ি নির্মাণে আর্থিক অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী
ঋতুপর্ণার বাড়ি নির্মাণে আর্থিক অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী
প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন দিলে করছাড়
প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন দিলে করছাড়