ছোটবেলায় বাবার এক বন্ধু, যিনি একসময় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, একদিন আড্ডায় বলেছিলেন, “শিক্ষা নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট বই নয়; আমরা জানিই না কেমন মানুষ গড়তে চাই।”
সেই বয়সে কথাটির গভীরতা বুঝিনি। আজ শিক্ষা নিয়ে যখন একের পর এক নতুন শিক্ষাক্রম, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি আর নতুন বিতর্কের জন্ম হয়, তখন বারবার মনে হয়—সম্ভবত এটাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন এক অদ্ভুত চক্রে আটকে গেছে। সরকার বদলায়, শিক্ষা নীতি বদলায়। শিক্ষাক্রম বদলায়, বই বদলায়, মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলায়। কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনা হয়। তারপর আবার নতুন সংশোধন, নতুন সংযোজন, নতুন ঘোষণা। এক বছরে একটি ব্যাচ নতুন শিক্ষাক্রমে পড়ে, পরের বছর সেই শিক্ষাক্রম বদলে যায়। কোনও বছর মূল্যায়ন পদ্ধতি পাল্টায়, কোনও বছর নতুন বিষয় যুক্ত হয়, আবার কোনও বছর সংশোধিত সংস্করণের নতুন বই হাতে পায় শিক্ষার্থীরা।
এদিকে কোনও বছর এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়, কোনও বছর ফলাফলে বড় ওঠানামা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। শিক্ষকরা একটি পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার আগেই আরেকটি পরিবর্তনের মুখোমুখি হন। অভিভাবকরাও বুঝে উঠতে পারেন না, সন্তানের শেখার লক্ষ্য আসলে কী। শেষ পর্যন্ত অনেকের কাছেই সাফল্যের একমাত্র ভাষা হয়ে দাঁড়ায় সিজিপিএ।
এসব ঘটনাকে চাইলে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু সবগুলো একসঙ্গে দেখলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—বাংলাদেশ কি সত্যিই জানে সে কেমন মানুষ গড়তে চায়?
সম্প্রতি ঘোষণা এসেছে, ২০২৭ সাল থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন চারটি বই যুক্ত হবে। ২০২৮ সালে চালু হবে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, কারিগরি শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স—এসব বিষয় সময়ের দাবি। এগুলো নিয়ে আপত্তির সুযোগ নেই। আপত্তি অন্য জায়গায়।
এই পরিবর্তনের পেছনে কি কোনও গবেষণা রয়েছে? কোনও বিদ্যালয়ে কি পরীক্ষামূলকভাবে এটি বাস্তবায়ন করে দেখা হয়েছে? কতজন শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, শিশু মনোবিজ্ঞানী, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীর মতামত নেওয়া হয়েছে? পরিবর্তনের আগে কি শেখার ফল মূল্যায়ন করা হয়েছে? পরিবর্তনের সাফল্য কি শুধু পরীক্ষার ফল বা সিজিপিএ দিয়েই মাপা হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনসমক্ষে থাকা উচিত। কারণ শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ভুল নীতির প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে না। তার মূল্য দিতে হয় দশ থেকে পনেরো বছর পরে—বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, কর্মক্ষেত্রে, এমনকি রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতায়।
পৃথিবীর সফল দেশগুলো আগে ঠিক করে নেয়, তারা কেমন নাগরিক গড়তে চায়। তারপর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী পাঠ্যক্রম, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষানীতি সাজায়। আমরা প্রায়ই উল্টোটা করি। আগে বই বদলাই, পরে গন্তব্য খুঁজি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) বহু দেশের শিক্ষা সংস্কার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, সফল পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের ভিত্তি পাঁচটি—গবেষণালব্ধ প্রমাণ, অংশীজনের অংশগ্রহণ, পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন, শিক্ষকদের প্রস্তুতি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা। শুধু নতুন বই ছাপানো বা নতুন বিষয় যোগ করাই শিক্ষা সংস্কার নয়, পুরো ব্যবস্থাকে সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করাই প্রকৃত সংস্কার। বিশ্বের সফল শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোও সেই পথেই এগিয়েছে।
ফিনল্যান্ডে জাতীয় পাঠ্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তনের আগে দীর্ঘ গবেষণা, জনপরামর্শ এবং শিক্ষক-শিক্ষাবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। সিঙ্গাপুরে নতুন বিষয় বা নতুন শিক্ষণপদ্ধতি আগে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়, এরপর বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়। জাপানেও পাঠ্যক্রম সংশোধনের আগে দীর্ঘ প্রস্তুতি, বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং জনপরামর্শের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই—পাঠ্যক্রম যেন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নয়, গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্য অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তে কেবল পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তনকে সংস্কার বলে ধরে নিই। অথচ শিক্ষক প্রস্তুত নন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো প্রস্তুত নয়, মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রস্তুত নয়, এমনকি অনেক সময় পরিবর্তনের যৌক্তিকতাও জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। ফলে নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে একটি অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়।
গত কয়েক বছরে এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও ধারাবাহিক বিতর্ক হয়েছে। এর পেছনে মহামারি, জনমিতিক পরিবর্তন, আর্থ-সামাজিক কারণে ঝরে পড়া বা মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট বড় নীতিগত সিদ্ধান্তের পর তার বাস্তব প্রভাব নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে মূল্যায়নের একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি।
এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ সাম্প্রতিক শিক্ষা বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, বাংলাদেশে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ও প্রবেশাধিকার বেড়েছে, কিন্তু শেখার মান, ঝরে পড়ার হার এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। নীতি ও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার মধ্যে একটি দৃশ্যমান ব্যবধান রয়ে গেছে।
আরও বড় সমস্যা হলো—আমরা শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করি মূলত ‘ইনপুট’ নিয়ে। কতটি বই ছাপা হলো, কতটি নতুন বিষয় যুক্ত হলো, কতটি পরীক্ষা নেওয়া হলো—এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়।
কিন্তু পঞ্চম শ্রেণির কত শতাংশ শিক্ষার্থী একটি লেখা পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে, অষ্টম শ্রেণির কতজন বাস্তব জীবনের একটি গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে পারে, কতজন যুক্তি দিয়ে লিখতে পারে কিংবা কতজন তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এই প্রশ্নগুলো আমাদের আলোচনায় খুব কমই আসে।
ইউনেস্কো, ইউনিসেফ ও বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে—বিদ্যালয়ে উপস্থিতি আর শেখার ফল এক বিষয় নয়। শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ধারণ করে লার্নিং আউটকামস, অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী বাস্তবে কী শিখছে এবং সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কতটা প্রয়োগ করতে পারছে।
শিক্ষা নীতি শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প, শ্রমবাজার এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতেরও বিষয়। ২০৪১, ২০৫০ কিংবা তারও পরের বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে আজকের শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিশুরাই। তাই পাঠ্যক্রম নির্ধারণের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত বইয়ের নয়—এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, নাগরিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রশ্ন।
আমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যা প্রতিটি সরকারের সঙ্গে নতুন করে সংজ্ঞায়িত হবে? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে একটি জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে টিকে থাকবে?
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন অন্তত ১৫ থেকে ২০ বছরের একটি জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ। আমাদের আগে ঠিক করতে হবে, আমরা কেমন মানুষ গড়তে চাই। শুধু পরীক্ষায় ভালো করা শিক্ষার্থী নয়—এমন নাগরিক, যারা সমালোচনামূলক চিন্তা করতে পারে, তথ্য যাচাই করতে পারে, প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করতে পারে, সহমর্মী হতে পারে, দলবদ্ধভাবে সমস্যা সমাধান করতে পারে এবং সারা জীবন নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
একইসঙ্গে একটি স্বাধীন জাতীয় কারিকুলাম কমিশন গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। সেখানে শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষক, শিশুমনোবিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, শিল্প খাতের প্রতিনিধি এবং অভিভাবকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে। বড় ধরনের পরিবর্তনের আগে গবেষণা, পাইলট প্রকল্প, শেখার ফল মূল্যায়ন এবং জনপরামর্শকে বাধ্যতামূলক করা দরকার। শিক্ষা মানুষ গড়ার জন্য, তাই এর সিদ্ধান্তও হওয়া উচিত স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রমাণভিত্তিক।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়ার নীতিগুলো যদি পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়া নির্ধারিত হয়, তাহলে সেই কথাটি কেবল একটি স্লোগান হয়ে থাকে। একটি শিশুর শৈশব দ্বিতীয়বার ফিরে আসে না। তার শেখার প্রতিটি বছর অমূল্য। সেই সময়ে ভুল নীতির মূল্য পরে আর শোধ করা যায় না।
পাঠ্যবই বদলাবে। পাঠ্যক্রমও বদলাবে। বদলাতেই হবে। কারণ পৃথিবী বদলাচ্ছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনেরও একটি বিজ্ঞান আছে। একটি প্রক্রিয়া আছে। একটি জবাবদিহি আছে। যে রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গন্তব্য ঠিক করতে পারে না, সে রাষ্ট্র যতবারই পাঠ্যবই বদলাক, শিক্ষার প্রকৃত রূপান্তর ঘটাতে পারে না। প্রশ্নটি নতুন বইয়ের নয়—নতুন প্রজন্মের। আর সেই কারণেই প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত একটাই—আমরা কি সত্যিই জানি, আমরা কেমন মানুষ গড়তে চাই?
লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত
