নবম পে-স্কেলের পথে নতুন বাধা!

জামাল উদ্দিন
২৭ জুলাই ২০২৬, ২১:১৫আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ২১:১৫

ঘোষণা হয়েছে। বাজেটে অর্থও রাখা হয়েছে। কার্যকরের তারিখ ধরা হয়েছে ১ জুলাই। সচিব পর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি একের পর এক বৈঠক করেছে। তবু নবম জাতীয় পে-স্কেল এখনও কাগজেই আটকে আছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জুলাই শেষ হতে চললেও গেজেট আসেনি। ফলে নতুন বেতনও পৌঁছায়নি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে।

নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় রয়েছেন প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। সঙ্গে আছেন প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও নতুন কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

সরকার বর্তমানে বেতন ও পেনশন বাবদ বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১১ বছর ধরে পুরোনো বেতন কাঠামোয় রয়েছেন। কিন্তু বাজার একই জায়গায় থাকেনি। বেড়েছে খাদ্যপণ্যের দাম। বাসাভাড়া। চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়। পরিবহন খরচও।

ফলে নবম পে-স্কেল এখন আর শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি লাখো কর্মজীবী পরিবারের জীবনযাত্রা এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বড় পরীক্ষা।

শেষ ধাপে ধীরগতি

অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রস্তাবটি এখন আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সচিব পর্যায়ের কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হলে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে তা মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর শুরু হবে আইনি প্রক্রিয়া। প্রয়োজনীয় ভেটিং শেষে প্রকাশ করা হবে গেজেট। গেজেটের আগে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী অর্থ ছাড় কিংবা বেতন পরিশোধের সুযোগ নেই।

সচিব পর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রস্তুত পৃথক সুপারিশ পর্যালোচনা করেছে। সেগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার কাজও হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানোর উপযোগী পর্যায়ে এলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।

আইএমএফের প্রশ্নে নতুন চাপ

এবারের পে-স্কেলের পথে নতুন উপাদান হিসেবে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ। গত ১৩ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, আইএমএফ নতুন পে-স্কেলের বিরোধিতা করেনি। সংস্থাটি জানতে চেয়েছে, কত ধাপে এটি বাস্তবায়িত হবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে। সরকার তখন আইএমএফ প্রতিনিধিদলকে জানায়, বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ রাখা হয়েছে। মন্ত্রিসভা বাস্তবায়নের ধাপ নির্ধারণ করবে।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আইএমএফ অন্তত দুই বছর পে-স্কেল বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি সরকারি ব্যয়, বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে— এমন উদ্বেগও জানিয়েছে সংস্থাটি।

অবশ্য সরকার পে-স্কেল পিছিয়ে দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত এখনও জানায়নি। সরকারের অবস্থান হচ্ছে, নতুন বেতন কাঠামো বাতিল কিংবা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হবে না। বরং বাস্তবায়নের কৌশল ও আর্থিক প্রভাব আরও পর্যালোচনা করা হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে রয়েছে। আইএমএফও রাজস্ব বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিক করা এবং সতর্ক আর্থিক নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে আসছে। ফলে নতুন পে-স্কেলের ব্যয় এখন আর শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হিসাবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।

অর্থ আছে, হিসাবও বড়

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন পে-স্কেল আংশিক বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে বলে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ‘নেট পাবলিক সার্ভিস’ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। এই খাতের অর্থ সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়, পেনশন এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধায় ব্যয় হওয়ার কথা।

তবে পে-স্কেল বাস্তবায়নের হিসাব শুধু মাসিক বেতন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মৌলিক বেতন বাড়লে এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ইনক্রিমেন্ট ও করের হিসাবও বদলে যায়। পরিবর্তন আনতে হয় আইবাস প্লাসভিত্তিক ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থায়ও। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন করে বেতন নির্ধারণ করতে হয়। বরাদ্দ দিতে হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে। এই ব্যয় এককালীন নয়। প্রতিবছরই সরকারকে বাড়তি অর্থের সংস্থান করতে হবে। এ কারণেই বাস্তবায়নের প্রথম বছর এবং পরবর্তী বছরগুলোর সম্ভাব্য ব্যয় আলাদাভাবে হিসাব করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

প্রথমে মূল বেতন

শুরুতে তিন অর্থবছরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আলোচনা ছিল। প্রথম বছরে সংশোধিত মূল বেতনের অর্ধেক দেওয়ার কথাও বিবেচনায় এসেছিল। পরে ওই পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রথম ধাপেই সংশোধিত মৌলিক বেতন পুরোপুরি কার্যকর করা। বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা পরবর্তী অর্থবছরে সমন্বয় করা হতে পারে।

অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলও দুই ধাপে কার্যকর হয়েছিল। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে সংশোধিত মূল বেতন কার্যকর ধরা হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়তি অর্থ পেয়েছিলেন কয়েক মাস পর। পরবর্তী অর্থবছরে ভাতাগুলো সমন্বয় করা হয়। নবম পে-স্কেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

কর্মচারীদের প্রত্যাশা

সচিবালয় সংযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিষদের সভাপতি নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে খুব শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের আলোচনা হতে পারে। তিনি বলেন, “সরকার নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা দিয়েছে। এখন কর্মচারীদের প্রত্যাশা, দ্রুত গেজেট প্রকাশ করে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। বিলম্ব যত কম হবে, ততই ভালো।”

সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

পুরো প্রক্রিয়া এখন তিনটি ধাপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে সচিব পর্যায়ের কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন। সবশেষে আইনি পরীক্ষা শেষে গেজেট প্রকাশ। তবে গেজেট প্রকাশ হলেই সঙ্গে সঙ্গে নতুন বেতন হাতে পৌঁছাবে— এমন নিশ্চয়তা নেই। সফটওয়্যার হালনাগাদ, বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।

সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের সামনে এখন দুই ধরনের চাপ। একদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য প্রত্যাশা। অন্যদিকে অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা। কিন্তু কর্মচারীদের সংকটও বাস্তব। সরকারি ফাইলের গতি কমানো যায়। বাজারের গতি থামানো যায় না।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
লাইসেন্স ফিরে পেলো আদদ্বীন হাসপাতাল, মানতে হবে তিন শর্ত
প্রাথমিকের কারিকুলাম ও পে স্কেল নিয়ে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী
নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের বাজেট১১৬ কোটির বাজেট এক লাফে ১৪১৭ কোটি টাকা
সর্বশেষ খবর
আগের সিদ্ধান্ত স্থগিত, এবার এইচএস‌সি পরীক্ষা শে‌ষে কু‌ড়িগ্রামে টানা ৭ দিন লোডশেডিং
আগের সিদ্ধান্ত স্থগিত, এবার এইচএস‌সি পরীক্ষা শে‌ষে কু‌ড়িগ্রামে টানা ৭ দিন লোডশেডিং
ইরান কথা না শুনলে বড় হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
ইরান কথা না শুনলে বড় হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা ইউজিসির
সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা ইউজিসির
জুলাই-নেতাদের যত বিভাজন, নেপথ্যে কী
জুলাই-নেতাদের যত বিভাজন, নেপথ্যে কী
সর্বাধিক পঠিত
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
এক মিনিটেই মিলবে ৫ লাখ টাকা, চার দিনে ২ কোটি
এক মিনিটেই মিলবে ৫ লাখ টাকা, চার দিনে ২ কোটি
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, নির্বাচন কর্মকর্তা বরখাস্ত
নির্বাচন অফিসে পরীক্ষা ছাড়াই ১৪৩ জনকে নিয়োগ, নির্বাচন কর্মকর্তা বরখাস্ত
একসঙ্গে ছাত্রদলের ৪ নেতার পদত্যাগ
একসঙ্গে ছাত্রদলের ৪ নেতার পদত্যাগ
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সম্মানি ভাতা বাড়লো
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সম্মানি ভাতা বাড়লো