সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীর কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের সচ্ছলতা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে ‘ন্যাশনাল সামিট অন ইয়াং উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের নারীদের প্রয়োজন ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি অন্যান্য স্তরের নারীদেরও মানসম্মত শিক্ষা ও আধুনিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও রূপকল্প তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের কাছে তাদের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। সরকারের স্পষ্ট নীতিগত পরিকল্পনা ও প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দিষ্ট রূপকল্প রয়েছে। একই সঙ্গে এই সরকারের একটি গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশে নারীর উন্নয়নে অতীতের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, নারীদের সার্বিক উন্নয়নে পৃথক মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম ক্ষেত্র তৈরি পোশাকশিল্পের সূচনা হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। পরবর্তী সময়ে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার দ্বাদশ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়ে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে বলে জানান তিনি।
খেলাধুলা ও শিক্ষায় সরকারের উদ্যোগ
খেলাধুলা ও শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী খেলাধুলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক স্তর থেকেই খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ শ্রেণির জন্য নতুন বই চালু করা হচ্ছে।
তিনি জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলাকে উৎসাহিত করতে এ বছর প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাধুলার পাশাপাশি বিতর্ক, শিল্প-সাহিত্য ও কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য রয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল টুর্নামেন্টের সাফল্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সম্প্রতি প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্টে ১১ লাখ ছাত্র ও সমানসংখ্যক ১১ লাখ ছাত্রী অংশ নিয়েছে, যা বিশ্বের বুকে বিরল দৃষ্টান্ত। খেলাধুলা শুধু শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না; এটি পারস্পরিক যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি, সাম্য প্রতিষ্ঠা ও সমাজে বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ
নারীদের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়া এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের কথা উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন—এটাই সরকারের প্রত্যাশা।
এ জন্য তারুণ্য ও নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সহজ শর্তে জামানতবিহীন স্বল্প সুদের ঋণ, উদ্ভাবনী ধারণার জন্য প্রাথমিক তহবিল এবং সরকারি অনুদানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জনগণের ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, জনগণের ক্ষমতায়নই রাষ্ট্রের শক্তির মূল ভিত্তি। এ ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে তরুণ প্রজন্ম ও নারীদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে হবে। তরুণ ও নারীদের আধুনিক বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে সার্বক্ষণিক সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কাজের প্রত্যয়
বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকার প্রশংসা করে মাহ্দী আমিন বলেন, এসব সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী বছরের পর বছর ধরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি ও কার্যক্রম বর্তমান সরকারকে অনুপ্রাণিত করে। সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে তাদের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আগামী দিনগুলোতে সব উন্নয়ন অংশীদারকে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্মে এনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে বাংলাদেশকে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে সরকার বিশ্বাস করে।
সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এ এস এম রহমত উল্লাহ ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শংকর, ‘আর্ন’ প্রকল্পের অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক কাজী মোখলেছুর রহমান এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মাহফুজুল আলম খানসহ অন্যরা।
গরু-ছাগল ছেড়ে মরুর দুম্বা পালন, নতুন সম্ভাবনা দেখছেন খামারি