দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এবার ঘটা করে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উদযাপন করছে বিএনপি। দিবসটি উপলক্ষে সাত দিনব্যাপী কর্মসূচির প্রথম দিনে শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হয় বিশেষ প্রদর্শনী। এতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি স্বাধীনতাযুদ্ধে তৎকালীন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বর্ণনা করা হয়। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথাও।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) ৩ হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন।
বিশেষ প্রদর্শনী উপভোগ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদ সদস্য, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষার্থী ও তরুণ, বিএনসিসি ও স্কাউটস সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের ধারাবিবরণীতে বলা হয়, ‘৭ নভেম্বরের মহানায়ক জিয়াউর রহমান ছিলেন অদম্য সাহসী, মেধাবী এবং বিচক্ষণ। ১৯৫৩ সালে মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে কমিশনপ্রাপ্ত হন। কর্মজীবনের শুরু থেকে সব ক্ষেত্রেই তার ভূমিকা ছিল বীরোচিত এবং সাহসিকতাপূর্ণ। যুদ্ধের ময়দানে অসীম বীরত্বের জন্য তিনি পেয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘হিলাল-ই-জুরাত’। সেনাবাহিনীতে জিয়াউর রহমান অসীম সাহসিকতা দেখালেও তিনি বাংলাভাষী অফিসার এবং সৈনিকদের প্রতি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের বৈষম্য নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করেছেন।’
এতে আরও বলা হয়, তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পান। মাতৃভূমি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পোস্টিং তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের মনে স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনাকে বেগবান করে তোলে।
১৯৭১ সালের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। সেই সময় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের সমাবেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি জোরালো কণ্ঠে চার দফা দাবি জানিয়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরুর হুমকি দিলেও সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি।
৭ মার্চের ভাষণের পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকায় দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে থাকে। আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানে লক্ষাধিক সৈন্য জড়ো করে। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। এটিকে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয় ধারাবিবরণীতে।
চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার খবর পান। এরপর সিদ্ধান্ত নিতে আর এক মুহূর্ত দেরি করেননি। গর্জে ওঠেন। আশপাশে থাকা পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের গ্রেপ্তার করেন। ক্যান্টনমেন্টের ব্যারাকে ফিরেই সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাংলাভাষী কর্মকর্তা ও জওয়ানদের ডেকে জড়ো করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দেন।
১৯৭২ সালের মার্চে তৎকালীন দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধের অংশবিশেষও তুলে ধরা হয় ধারাবিবরণীতে। এতে বলা হয়, ‘সময় ছিল অতি মূল্যবান। আমি ব্যাটালিয়নের অফিসার, জেসিও আর জওয়ানদের ডাকলাম। তাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলাম। তারা সবই জানতো। আমি সংক্ষেপে বললাম এবং তাদের নির্দেশ দিলাম সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। তারা সর্বসম্মতিক্রমে ভ্রষ্টচিত্তে এ আদেশ মেনে নিল। আমি তাদের একটি সামরিক পরিকল্পনা দিলাম। তখন রাত দুটো বেজে ১৫ মিনিট। ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে এই দিনটিকে তারা কোনদিন ভুলবে না। কোনদিন না।’
ধারাবিবরণীতে আরও বলা হয়, ‘স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘উই রিভোল্ট’ উচ্চারণ। ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের নির্দেশ এবং পরদিন ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল স্বাধীনতাকামী জনগণের সামনে তূর্যধ্বনির মতো। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ বাংলাদেশ।’