গুলশান হামলা: শেফের জবানবন্দি

আমরা ৫ জন কমান্ডো অভিযানের আগেই দরজা ভেঙে পালিয়ে যাই

আমানুর রহমান রনি ও চৌধুরী আকবর হোসেন
০৩ জুলাই ২০১৬, ২১:৫০আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৬, ২৩:২৯


শিশির বৈরাগী ‘রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকেই এলোপাতাড়ি গুলি করছিল জঙ্গিরা। এ সময় রেস্টুরেন্টের ভেতরে  সবাই টেবিলের নিচে মাথা লুকিয়ে প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। আর আমরা ৯ জন একসঙ্গে টয়লেটে লুকাই। সারারাত সেখানেই ছিলাম। রাত ৩টার দিকে হামলাকারীরা আমাদের টয়লেট খুলে বের করে। তারা আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিল, আমাদের ভেতরে কেউ বিদেশি আছে কিনা। কোনও বিদেশি না থাকায় তারা আবার আমাদের টয়লেটের  ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়।’  গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলার বর্ণনা দিয়ে শেফ শিশির বৈরাগী বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন। রবিবার বিকালে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে তার সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের কথা হয়। তিনি জানান, বরিশালের আগৈলঝড়া উপজেলায় তার গ্রামের বাড়ি।


শিশির বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, দেড় বছর ধরে তিনি ওই রেস্টুরেন্টে বাবুর্চির কাজ করছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি রান্নাঘরে প্রতিদিনের মতো ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রধান বাবুর্চি দৌড়ে রান্না ঘরে যান। এ সময় শিশির মনে করেছিলেন, খাবার তৈরিতে কোনও সমস্যা হয়েছে। এরপরই গুলির শব্দ পান তারা। সঙ্গে শেফ ও শেফের সহকারীরা দৌড়ে টয়লেটে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। তারা এক সঙ্গে ওই টয়লেটে ৯ জন ছিলেন।  তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা ঢুকেই হামলা চালায়। আমরা টয়লেটে বসে শুধু গুলির শব্দ পেয়েছি। আর কী হয়েছে, তা আমরা বলতে পারব না। আমাদের শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল বিদেশি আছে কি না? এ ছাড়া আর কোনও কিছু করেনি।’
কিভাবে বের হলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে শিশির বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৭টার দিকে টয়লেটের ভেতরে আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এ সময় টয়লেটের শাওয়ারের ইস্পাতের পাইপ ভেঙে আমরা দরজা ভেঙে ফেলি। চিৎকার করি। আমরা গরিব, পেটের দায়ে এখানে এসেছি। আমাদের ছেড়ে দাও। তখন হামলাকারীরা রেস্টুরেন্টের এক স্টাফকে আমাদের কাছে পাঠায়। তিনি গিয়ে আমাদের বলেন, তোমাদের সবাইকে যেতে বলছে। তখন চারজন ওর সঙ্গে সামনে যায়। আমরা পাঁচজন দৌড়ে বাউন্ডারি ওয়াল ডিঙিয়ে বের হয়ে আসি। আমরা সেনাবাহিনীর অভিযানের আগেই বের হই। এরপর পুলিশ আমাদের নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়।’

জঙ্গিদের মধ্যে কী ধরনের কথোপকথন হয়েছিল? এর উত্তরে শিশির বলেন, ‘রেস্টুরেন্টের টয়লেটটি অনেক দূরে। আমরা গুলির শব্দ ছাড়া আর কোনও কিছু শুনতে পাইনি।’

রবিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, ৭৯ নম্বর সড়কটির যে মাথায় রেস্টুরেন্টটি, সেই অংশে পুলিশের ব্যারিকেড। কড়া পাহারায় ১৬ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। ভেতরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ব্যারিকেডের দুই পাশে কয়েকটি বাড়ি থাকলেও তার ভেতরে লোকজনের আসা-যাওয়া করতে তেমন দেখা যায়নি। যারা যেতে চেয়েছেন, তাদেরও কড়া তল্লাশি করে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। দুপুর ১২টার দিকে সিআইডির ক্রাইম সিন একটি গাড়িতে প্রবেশ করে। তারা আলামত সংগ্রহ করে বিকেল ৪টা ১৭ মিনিটে বের হন। তবে কোনও কথা বলতে রাজি হননি তারা। দ্রুত তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। দুপুর সাড়ে ১২টায় পুলিশের বোম্ব ডিস্পোজাল টিম প্রবেশ করে। তারা দেড়টার দিকে বের হয়ে যায়। এছাড়া দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তারা।

বিকেল ৫টার দিকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, আইজিপি একেএম শহীদুল হক ও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ পুলিশ কর্মকর্তারা। পরে হাসপাতালের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘হামলাকারীরা সব দেশি জঙ্গি। দেশের কারও পরামর্শেই এই হামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে জানা যাবে এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত আছে কিনা।’

আইজিপি একেএম শহীদুল হক বলেন, ‘এই ঘটনায় মামলা হবে। মামলা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) তদন্ত করবে।’

রবিবার সাড়ে ৫টার দিকে ৭৯ নম্বর সড়কে মাসুদা বেগম নামে এক মধ্যবয়সী নারী তার ছেলে  শাওনকে (২৪) খুঁজতে ছিলেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত এক বছর ধরে বড়ছেলে শাওন ওই রেস্টুরেন্টে কাজ করত। শুক্রবার রাত ৮টার সময় শাওনের সঙ্গে কথা হয়।’ তিনি বলেন, ‘শাওন আমাকে জানিয়েছিল, সে বোনাস পেয়েছে। বেতন পেলে রবিবার বাড়িতে চলে যাবে। তার কাছে সুবিধার মনে হচ্ছে না। এরপর আমরা টিভিতে এই ঘটনা দেখে এখানে ছুটে আসি। কিন্তু তারপর আর শাওনের নম্বর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

তার সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে হাজির হন শিশির বৈরাগী। তিনি জানান, ‘শাওন রেস্টুরেন্টে বাসনকোসন ধোয়ার কাজ করত। শুনেছি সে আহত অবস্থায় মেডিক্যালে ভর্তি আছে। তার কথা শুনে শাওনের মা ইউনাইটেড হাসপাতালে ছেলের সন্ধানে দ্রুত ছুটে যান।’

পহেলা জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশান-২ নম্বর সেকশনের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় কয়েকজন বন্দুকধারী। সেখানে তারা দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে রাখে। সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে রাতেই নিহত হন বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন এবং গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম।
শনিবার সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালিয়ান, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয় এবং দু’জন বাংলাদেশি রয়েছেন। হামলাকারী ছয়জনসহ মোট ২৮ জন নিহত হয় এ ঘটনায়।


/এআরআর/এজে/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে