দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া তারেক-মিশুকের স্বপ্ন, বিচার হয়নি

উদিসা ইসলাম
১৩ আগস্ট ২০১৬, ১৭:০৪আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৬, ১৭:৫০

তারেক-মিশুক দুজন সম্ভাবনাময় মানুষের জীবন ও স্বপ্ন সড়কে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়ার নাম চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর। পাঁচ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় এ দুই কৃতিসন্তানের সঙ্গে নিহত হন আরও তিন সহকর্মী। অথচ পাঁচজনের মৃত্যুর পাঁচ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি মামলা। আসামি বাসচালক জামিনে মুক্তি নিয়ে দিব্যি ফিরেছেন মহাসড়কে।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার সালজানা গ্রামে গিয়েছিলেন ‘কাগজের ফুল’ ছবির শ্যুটিংয়ের জায়গা দেখতে। চলচ্চিত্রে কাজ করবেন এমন অনেকেই সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বটে! কিন্তু তাদের স্বপ্নে আজও তাড়া করে সেই দুর্বিষহ বন্ধু হারানো স্মৃতি। শ্যুটিং স্পট দেখে ঢাকা ফেরার পথে তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন নির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। হত্যা মামলার আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।

দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরকে বহনকারী মাইক্রোবাস
এদিকে, বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে ক্ষতিপূরণের একটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম গত ১৪ মার্চ শুরু হয়েছে। দুর্ঘটনায় নিহত তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ মোট সাত কোটি ৭৬ লাখ ২৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে এ মামলাটি করেন। দুর্ঘটনায় দায়ী বাসের মালিক, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিসহ তিনজনকে এ মামলার বিবাদী করা হয়েছে। ঘাতক চালকদের বিচার না হলে মহাসড়কে মৃত্যু রোধ করা কঠিন হবে বলে মনে করেন ‘নিরাপদ সড়ক’-এর জন্য আন্দোলন করা অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন।

পাঁচ বছরেও হত্যার ঘটনায় মামলার সুরাহা না হওয়া নিয়ে যখন অ্যাক্টিভিস্টরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, ঠিক তখন ক্ষতিপূরণের মামলা নিয়ে ঘোর আপত্তি জানিয়েছে খুলনা বিভাগীয় সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। তাদের দাবি, যানবাহন আইনে মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ হাজার টাকা ও অঙ্গহানির জন্য ১০ হাজার টাকা প্রদান করতে হবে। কিন্তু যে মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেটার রায় হলে তা আইনে পরিণত হবে, যা পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বৃহত্তর স্বার্থের বিপক্ষে যাবে। এ কারণেই মামলা দুটি প্রত্যাহারের দাবিতে এ আন্দোলন কর্মসূচি।

তারেক মিশুকের বন্ধুরা বলছেন, কোনও আর্থিক ক্ষতিপূরণে এদের অভাব পূরণীয় নয়। কিন্তু বিচারের এই দৃশ্যমানতা ভবিষ্যতের যেকোনও সড়ক দুর্ঘটনা ঠেকাতে ভূমিকা রাখবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।

ওই দুর্ঘটনায় আহত ঢালী আল মামুনের পরিকল্পনায় গাড়ির ধ্বংসাবশেষ দিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সড়ক দ্বীপে গড়ে উঠেছে ‘সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতি স্থাপনা’। তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরের মতো প্রতিভাবান আর কেউ যেন এমন মৃত্যুর শিকার না হন, সে বার্তা নিয়েই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাটি। কেবল সেই পাঁচজনই নেই; যারা ‘কাগজের ফুল’ হয়ে ঝরে গেছেন।

সাংবাদিক প্রভাষ আমিন বলেন, মিশুক মুনীর-তারেক মাসুদসহ পাঁচজনের হত্যার ঘটনায় পাঁচ বছরেও বিচার শেষ হয়নি। কবে হবে, তাও জানি না। ৩৯ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১৬ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার এই ধীরগতি আমাদের ক্ষুব্ধ করে! হতাশ করে। তিনি বলেন, সাক্ষীদের অনাগ্রহ, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের মধ্যে এক ধরনের অনাস্থার বোধ তৈরি করে। বিচার হলেও ঘাতক চালকের শাস্তি হবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। এটা আরও ক্ষুব্ধ করে আমাদের। কাউকে গুলি করে মারলে আপনার ফাঁসি হবে। আর সেই একই ব্যক্তিকে গাড়ি চাপা দিয়ে মারলে আপনার তিন বছরের কারাদণ্ড হবে! এ জন্য সড়ক দুর্ঘটনার শাস্তি বাড়ানোর দাবি করছি।

দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে প্রভাষ আমিন বলেন, একই সঙ্গে দাবি করছি দ্রুত বিচারের। দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই দুর্ঘটনার হার কমাতে পারে; স্বজনহারাদের দিতে পারে কিছুটা সান্ত্বনার বাণী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পী ঢালী আল মামুনের ‘সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতি স্থাপনা’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনার বিশেষত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও স্থাপন করেছেন সেই দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন যে শিল্পী, সেই ঢালী আল মামুন। আর এই স্থাপনায় ব্যবহার করা হয়েছে, দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া সেই মাইক্রোবাস, যার লাইসেন্স প্লেট নম্বর হচ্ছে ঢাকা মেট্রো চ-১৩-০৩০২।

অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন বলেন, শিল্পী ঢালী আল মামুন শুধু সেই গাড়িতেই সহযাত্রী ছিলেন না, তিনি দীর্ঘদিন ধরে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের জীবন ও কর্মেরও একজন সহযাত্রী। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। জ্ঞান যখন ফিরেছে, তখন জেনেছেন বন্ধুরা আর বেঁচে নেই। তারই আরেক যান্ত্রিক প্রতিচ্ছবি যেন এই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া মাইক্রোবাসটি। এর চারপাশে ছড়িয়ে আছে চাকা, আসন, তেলের ট্যাঙ্ক। এগুলো মূল দুর্ঘটনার ধ্বংসাবশেষ। এর সাথে শিল্পী যুক্ত করেছেন বাসের একধারে ঝুলন্ত কতগুলো অসহায় আর্ত হাত। ঠিক উপরেই কি থমকে গেছে একাকী একটি ময়না! এই স্থাপত্যটি হাহাকার তৈরি করে একজন দর্শকের মনে! এমন বেদনা তৈরি করে, যে বেদনার সে অবসানও চায়!

/ইউআই/এবি/

আরও পড়ুন

তারেক মাসুদ মিশুক মুনির স্মরণে স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ 

‘জঙ্গি হামলায় কারা জড়িত, শুনলে অবাক হয়ে যাবেন’

 

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী