যে বাংলাদেশি কূটনীতিককে ‘মিস’ করবে দিল্লি

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি
প্রকাশিত : ২০:১৫, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২৪, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীস্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত। এই দীর্ঘ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ভারতে বাংলাদেশের কোনও রাষ্ট্রদূতের পাঁচ বছরের বেশি সময় চূড়ান্ত সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ঘটনা বিরল। পূর্বসূরি তারিক করিমের মতো সেই বিরল কূটনৈতিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেই দিল্লি থেকে বিদায় নিচ্ছেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী।
আগামী মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) দিল্লি ছাড়বেন তিনি। তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) নিযুক্ত বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ ইমরান।
অসম্ভব প্রজ্ঞার অধিকারী, রসিক, সাহিত্যপ্রেমী, মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বোপরি নিপুণ এই কূটনীতিবিদ একটা কথা প্রায়ই বলতেন। একান্ত আলোচনায় বা ঘরোয়া বৈঠকে তাকে বহুবার বলতে শুনেছি, ‘ব্যক্তিগতভাবে একজন রাষ্ট্রদূতের পারফরম্যান্সে ভালো-মন্দ বলে আসলে কিছু হয় না। দুটো দেশের মধ্যে সম্পর্ক যতটা ভালো বা যতটা খারাপ, সেই ডিপ্লোম্যাটের পারফরম্যান্সও আসলে ততটাই ভালো বা খারাপ।’
সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর দেওয়া সেই সংজ্ঞা ধার করেই বলা যায়, গত পাঁচ বছরে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কও যেহেতু শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছে, তাই রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাকে ফুল মার্কস দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তিনি অবশ্য রসিকতা করে বলতেন, ‘আসলে দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই ভালো ছিল যে আমার ভুল করার কোনও অবকাশই ছিল না। আমি স্রেফ ওটাকে অটো-ক্রুজ মোডে রেখে চুপচাপ বসে ছিলাম!’
তবে বাস্তবতা এটাই যে, তার পাঁচ বছরের মেয়াদে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি সই হয়েছে, সম্ভব হয়েছে ছিটমহল বিনিময়ের মতো জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। নিষ্পত্তি হয়েছে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের। তিস্তা চুক্তি হয়তো অধরা থেকে গেছে ভারতের কারণে, কিন্তু রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে ভারতকে তিনি বারবার সতর্ক করতেও দ্বিধা করেননি। আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) মতো সংবেদনশীল ইস্যুতেও ভারত বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘এটা পুরোপুরি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, বাংলাদেশের এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই।’
আবার তার সময়েই দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় গোটা দশেক ভিভিআইপি সফর হয়েছে, সেটাও একটি রেকর্ড। গন্তব্য দিল্লি কিংবা গোয়া, শান্তিনিকেতন বা কলকাতা যা-ই হোক— এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই ভারতে এসেছেন অন্তত ছয়বার!
সে কারণেই গত মঙ্গলবার রাতে দিল্লির চাণক্যপুরীতে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রদূত আলীর বিদায় সংবর্ধনায় সব কাজ ফেলে চলে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বস্তুত প্রথমে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও পরে মন্ত্রী হিসেবে জয়শঙ্করের সঙ্গেও রাষ্ট্রদূত আলীর ব্যক্তিগত স্তরে যে হৃদ্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, বাংলাদেশ বহুবারই তার কূটনৈতিক সুবিধা পেয়েছে।
সচরাচর আবেগের খুব একটা বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় না পোড়খাওয়া ডিপ্লোম্যাট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের চোখেমুখে। সেই মানুষটিও সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর দুটো হাত জড়িয়ে ধরে না-বলে পারলেন না, ‘আপনাকে সত্যিই খুব মিস করবো।’
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ অন্যদের সঙ্গে সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীঅথচ বাংলাদেশের ফরেন সার্ভিস থেকে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে অবসর নিয়ে সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বিশ্রামের জীবন কাটাচ্ছিলেন সুদূর আমেরিকায়। ২০১৪ সালে ভারতে ক্ষমতার পালাবদলে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলো, তার কিছুদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তাকে দিল্লিতে দূতাবাসের দায়িত্ব নিতে বলেন। ‘না’ করতে পারেননি অভিজ্ঞ এই কূটনীতিবিদ। যদিও ততদিনে তার এক যুগ অবসর জীবন কাটানো হয়ে গেছে।
দিল্লিতে তার আগে দীর্ঘ এক দশক ধরে কংগ্রেস ছিল ক্ষমতায়। ভারতের এই রাজনৈতিক দলটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা সুবিদিত। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরও বাংলাদেশ-ভারতের সুসম্পর্ক বজায় রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে এতটুকুও ভাবেননি সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণ। ‘কেরিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংসে এসে এত কঠিন উইকেটেও এতটা লম্বা সময় ধরে খেলতে পারবো কখনও ভাবিনি’, মেয়াদের শেষ দিকে মাঝে-মাঝেই হাসতে হাসতে বলতেন তিনি।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বার্থরক্ষায় তার নিরলস প্রচেষ্টা ও দৃঢ়তা প্রশংসা কুড়িয়েছে ভারতের সরকারি মহলেও। সোজা কথা সোজা করে বলতে কখনও কুণ্ঠিত হননি তিনি। বছর দুয়েক আগে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ যদি ভারত এই সমস্যার দিকে চোখ বুজে থাকে, তাহলে তারা বিরাট বোকামি করবে। কারণ, এই রোহিঙ্গা জনস্রোত বাংলাদেশেই আটকে থাকবে না। মিয়ানমারের অত্যাচার-নিপীড়ন চলতে থাকলে একদিন তার ধাক্কা অবধারিতভাবে ভারতকেও সামলাতে হবে।’
এমনকী মাত্র কয়েকদিন আগে দিল্লির জাতীয় প্রেসক্লাবেও তার বিদায় অভ্যর্থনার আসরে যখন কথিত অনুপ্রবেশ নিয়ে কথা উঠলো, হাইকমিশনার আলী তখন বলেছিলেন, ‘ভারতের চেয়েও আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এখন অনেক বেশি, ৮ শতাংশের ওপর ঘোরাফেরা করছে। তো বাংলাদেশিরা তাদের চেয়ে কম আয়ের দেশে কোন দুঃখে আসতে যাবে, বলুন তো?’
সেদিন দৃঢ়তা আর রসবোধের অনবদ্য মিশেলে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশিরা ভূমধ্যসাগর সাঁতরে ইউরোপ যেতে গিয়ে বরং ডুবে মরতে পারে, কিন্তু তবু ভারতে আসতে চাইবে না।’ তার এই বাক্যটি খবরের শিরোনাম হিসেবে ‘পিক’ করেছিল ভারতের একাধিক গণমাধ্যম।
এক অনুষ্ঠানে সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীহাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর সহধর্মিনী তূহফা জামান আলীও ছিলেন দিল্লির কূটনৈতিক মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুপরিচিত মুখ।
‘দিল্লি কমনওয়েলথ উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনে’র (ডিসিডব্লিউএ) সক্রিয় সদস্য হিসেবে তূহফা জামান বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের জামদানি কিংবা কাচ্চি বিরিয়ানিকে তুলে ধরেছেন অক্লান্তভাবে। তিনি দিল্লিকে বাংলাদেশের সংগীতশিল্পীদের গান শুনিয়েছেন, নামি চিত্রশিল্পীদের আঁকা ছবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। বাংলা নববর্ষে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অসামান্য নিদর্শন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র আয়োজন পর্যন্ত করেছেন দিল্লিতে!
দিল্লি থেকে রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর বিদায়লগ্নে সম্ভবত একটাই আক্ষেপ, ভারতের সংসদ বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস করেছে, এটাও তাকে দেখে যেতে হলো।
যে হাইকমিশনার দিল্লির শহরতলিতে দুর্গাপূজা উদ্বোধন থেকে শুরু করে আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির সেমিনারে প্রধান অতিথির ভাষণ— দুটোতেই সমান সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ, তাকেও এটা শুনতে হলো যে ভারতের পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন অব্যাহত বলেই নাকি ভারত এই বিল আনতে বাধ্য হয়েছে! বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত অসাম্প্রদায়িক সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী যার কাকা, ব্যক্তিগতভাবেও তার কাছে এটা আঘাত বৈকি!
দুদিনের মধ্যেই অবশ্য ভারতেরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, ওই সব ঘটনা আগেকার সামরিক শাসন বা বিএনপি আমলের। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের হিন্দু-বৌদ্ধরা অনেক নিরাপদ। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়েই গেছে।
পাঁচ বছরের অমলিন ট্র্যাক রেকর্ডে এই মৃদু অস্বস্তির ছায়াটুকু নিয়েই আগামী মঙ্গলবার দিল্লি থেকে বিদায় নিচ্ছেন হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী। 

/এইচআই/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ