মুজিববর্ষকে সামনে রেখে অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হচ্ছে আজ

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৮:৩১, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৪৮, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০২০

মুজিববর্ষকে সামনে রেখে এবার অন্য আমেজে শুরু হতে যাচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। আজ  রবিবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকাল তিনটায় গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবারের মেলা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হয়েছে। মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি বলছে— সারাজাতি যখন বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করছে, তখন আমরাও বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ রেখে বেশকিছু আয়োজন রেখেছি। এবারের মেলায় নতুন বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে চলেছে উল্লেখ করে একাডেমি  জানায়, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে যে আয়োজন আমরা প্রতিবছর করি, সেটির পরিসর কেবল বাড়ছে তা-ই নয়, সেটি আরও  খ্যাতিসম্পন্ন হয়ে উঠছে।

অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ও বঙ্গবন্ধু রচিত তৃতীয় বই ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা। বঙ্গবন্ধু কন্যা,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী মেলা পরিদর্শনে যাবেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন— সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

৮৭৩ সিংগেল ইউনিট স্টল ও ৩৪ প্যাভিলিয়ন

এবারের গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হবে বরাবরের মতোই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং একাডেমির সামনের ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে। বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, এলাকাটি প্রায় ৮ লাখ বর্গফুটের। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭৯টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৯৪টি ইউনিট, অর্থাৎ মোট ৫৬০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৭৩টি সিংগেল ইউনিটের স্টল এবং বাংলা একাডেমি-সহ ৩৩টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৩৪টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ভাষাচিত্রের প্রকাশক খন্দকার সোহেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্বের যেকোনও মেলায় গিয়ে দেখবেন, দর্শনার্থীদের জন্য সুনির্দিষ্ট একটা গোছানো জায়গা ও পরিসরের ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের মেলায় ঢুকলে মনে হবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। এখানে একটু, সেখানে একটু। এবং কোথায় কী দেওয়া হয়েছে,. তার কোনও পরিচ্ছন্ন পরিকল্পনা নেই। এখানে আয়োজক প্রতিষ্ঠান প্রকাশকদের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলে না। ফলে অনেক স্টল এমন জায়গায় পড়ে যায়,যেখানে পুরো মাসে লোকজন যায়-ই না।’ গণমাধ্যম এগুলোর দিকে নজর দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

লিটল ম্যাগ এবার সোহরাওয়ার্দীতে

‘বটতলা’ আর ‘লিটল ম্যাগ চত্বর’ যেন এক সুতোয় বাঁধা। বইমেলা যখন সোহরাওয়ার্দীতে কিছু অংশ চলে আসে, তখন লিটল ম্যাগ চত্বর একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। এ নিয়ে কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভও ছিল উল্লেখ করেন বেশ কয়েকটি লিটল ম্যাগের সম্পাদক। তারা বলছেন, খুব ভালো সিদ্ধান্ত। এমনিতেই ক্ষয়িষ্ণু এই আন্দোলন। সেটি এবার হয়তো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মূল মেলা প্রাঙ্গণে স্থানান্তরিত হলে প্রাণ ফিরে পাবে। সেখানে ১৫২টি লিটল ম্যাগকে স্টল বরাদ্দের পাশাপাশি ছয়টি উন্মুক্ত স্টলসহ ১৫৮টি লিটল ম্যাগকে স্টল দেওয়া হয়েছে।

 মুজিববর্ষের আয়োজন

বাংলা একাডেমির পরিচালক ও অমর একুশে গ্রন্থমেলার সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এবারের মেলা উৎসর্গ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল চারটায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া, আমাদের আরও আয়োজন থাকবে। বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় বই ‘আমার দেখা গণচীন’ তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুবিষয়ক ২৫টি নতুন বই নিয়ে আলোচনা করা হবে। একুশে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী একুশে বক্তৃতা। এবারের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করছে নতুন ও পুনর্মুদ্রিত ১০৪টি বই।’’

এছাড়া, মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এই অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিদিনই রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ এবং আবৃত্তি। অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা এবং সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।


তথ্য পাবেন যেখানে

একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এর প্রচার কার্যক্রমের জন্য তথ্যকেন্দ্র থাকবে বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। সাংবাদিকদের অবাধ তথ্য আদান-প্রদানের সুবিধার্থে গ্রন্থমেলায় মিডিয়া সেন্টার থাকবে তথ্যকেন্দ্রের উত্তর পাশে-পশ্চিম পাশে। বর্তমান সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্তৃপক্ষ গ্রন্থমেলায় তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, তথ্যকেন্দ্রের সর্বশেষ খবরাখবর এবং মেলার মূল মঞ্চের সেমিনার প্রচারের ব্যবস্থা করবে। মেলায় ওয়াই-ফাই সুবিধা থাকবে।

জেনে নিন প্রবেশ পথ

গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিনটি পথ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার মোট ছয়টি পথ থাকবে। বিশেষ দিনগুলোতে লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক, বাংলা একাডেমির ফেলো এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপ্রাপ্ত নাগরিকদের জন্য প্রবেশের বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। গ্রন্থমেলার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে পর্যাপ্ত সংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা কর্মীরা। নিরাপত্তার জন্য মেলার এলাকাজুড়ে তিন শতাধিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

 

মেলা হবে পলিথিন-ধূমপানমুক্ত

বাংলা একাডেমির ঘোষণা মতে, এবারের গ্রন্থমেলা সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে। পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা এসডো’র মহাসচিব ড. হোসেন শাহরিয়ার সাধুবাদ জানিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলা একাডেমিকে আমরা অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তারা মেলাকে পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটা ভাল উদ্যোগ। পলিব্যাগ বন্ধের আন্দোলনের সময়ও বাংলা একাডেমিই প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিল পলিব্যাগমুক্ত মেলা। সবারই এটি অনুকরণ করা উচিত। প্রতিবছর বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মেলা হয় এবং মেলায় প্রচুর পলিথিনের ব্যবহার হয়। সেটা কমাতে পারলে আমরা বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবো।’ 

পুরস্কার ও সম্মাননা

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ২০১৯ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০১৯ গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থ প্রকাশের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এছাড়া, ২০১৯ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এ বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ