নিউক্লিয়ার বোমা দিয়ে ভাইরাস মারা যায় না: শহীদুল হক

Send
শেখ শাহরিয়ার জামান
প্রকাশিত : ১৮:৪৬, এপ্রিল ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০৯, এপ্রিল ১১, ২০২০

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানি যখন যুক্তরাজ্য আক্রমণ করেছিল, তখনও ওই দেশের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল আহত হয়নি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে অদৃশ্য এক ক্ষুদ্র ভাইরাসের আক্রমণে নিউক্লিয়ার বোমার অধিকারী যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমান মিলিটারি শক্তিকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা আর কাজ করছে না। ধারণা করা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে হয়তো নতুন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার উদ্ভব হতে পারে— এমনটাই মনে করেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক।

সাবেক এই সচিব বলেন, ‘নিউক্লিয়ার বোমা বানিয়ে শত্রুকে ঘায়েল করার যে কৌশল, সেটি এখন কাজ করছে না। কোটি কোটি ডলার খরচ করে যুদ্ধাস্ত্র বানানো হয়েছে, কিন্তু একটি মহামারি ঠেকানোর প্রস্তুতি নেই। যে সাবমেরিনে নিউক্লিয়ার বোমা রাখা আছে, সেখানেও ভাইরাস আক্রমণ করেছে।’

যুদ্ধ ছাড়াই একটি নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার উদ্ভব হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি একটি অজানা শত্রু। এখন মনে হচ্ছে ভাইরাসের কাছে সন্ত্রাসবাদ কিছু না।’

এম শহীদুল হক

করোনাভাইরাস সব সমাজকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে জানিয়ে শহীদুল হক বলেন, ‘ধনী বলে এর প্রকোপ থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছেন না।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকা প্রথম’ এই নীতি গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু এটি আর থাকছে না। কারণ, এখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই অন্যদের কাছে সাহায্য চাইছে বলেও তিনি জানান।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্ম হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক কল্যাণটি দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ছিল এবং সেটি এখন ফেরত আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ধরেই নেওয়া হয়েছিল ক্ষমতা ও অর্থ থাকলে কল্যাণ নিশ্চিত হবে। কিন্তু এখন ধনী দেশগুলোতে অসুস্থ রোগীর জন্য অক্সিজেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ভোগ্যপণ্য ও উৎপাদনের বিষয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের এত দ্রুত যাওয়ার দরকার আছে কিনা।’

এজেন্ডা ২০৩০

২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা যখন গৃহীত হয়, তখন অনেকে মনে করেছিল এটি শুধু উন্নয়নশীল দেশের জন্য, উন্নত বিশ্বের জন্য নয়। কিন্তু বিষয়টি এখন পরিষ্কার যে এটি সবার জন্য প্রয়োজন।

এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, ‘এজেন্ডা ২০৩০-এর অন্যতম মূল ভিত্তি হচ্ছে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। যে সমাজে যত বেশি সাম্য আছে, সেই সমাজ কঠিন পরিস্থিতি তত ভালো মোকাবিলা করতে পারে।’

এখন চিন্তা করার সময় এসেছে বৈশ্বিক নীতিগুলোর মধ্যে মানুষের মঙ্গল এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের বিষয়গুলো জোরালোভাবে বিবেচনা করার বলে জানান তিনি।

শহীদুল বলেন, ‘‘প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের বিষয়টি ‘এজেন্ডা ২০৩০’-এ খুব সুন্দর করে বলা হয়েছে। প্রকৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, মানবকল্যাণ, সবার সঙ্গে সহযোগিতা, মূল্যবোধ—এই বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তির করে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা হওয়া উচিত।’’

কে নেতৃত্ব দেবে

ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে কে নেতৃত্ব দেবে সেটি এখনও পরিষ্কার নয় বলে মনে করেন সাবেক এই সচিব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব তৈরি হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার যে সক্ষমতা দেশগুলোর থাকে, সেটি যে কমে গেছে তা বর্তমান সমস্যা প্রমাণ করে দিয়েছে।’

বৈশ্বিক শক্তি কোথায় থাকবে, অর্থাৎ এটি দেশভিত্তিক হবে নাকি অন্য কোনও ব্যবস্থার উদ্ভব হবে, নাকি একটি হাইব্রিড হবে, সেটি সামনের দিনগুলোতে বোঝা যাবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘এখানে বড় কোম্পানি ও বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, যেমন- বিল গেটস সামনের দিকে চলে আসবেন।’

বাংলাদেশের অবস্থান

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যে নীতি গ্রহণ করেছে, সেটি তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে করেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে কৃষির ওপর জোর দিয়ে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেটি যথাযথ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।’

গাড়ি না চালিয়ে বা ফ্যাশন কাপড় না কিনে বেঁচে থাকা সম্ভব। কিন্তু খাবার না থাকলে মানুষ বাঁচবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দিনশেষে খাবার লাগবে এবং যারা এটি নিশ্চিত করতে পারবে, তারাই টিকে থাকবে।’

টিকে থাকতে হলে মানবকল্যাণ ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া ও সবার মাঝে সহযোগিতা।’

/এসএসজেড/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ