ডিজিটাল বাংলাদেশে উল্টো পথে হাঁটছে ইউজিসি

Send
এসএম আববাস
প্রকাশিত : ১৭:৪৬, এপ্রিল ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫২, এপ্রিল ১৪, ২০২০

ইউজিসি

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম গত ৬ এপ্রিল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্ধের আহ্বান জানায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এর মাত্র চারদিন পর গত ১০ এপ্রিল আবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অনলাইনে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন বন্ধ রাখার নতুন সিদ্ধান্ত জানায় ইউজিসি। অথচ এর আগে গত ২৩ মার্চ ইউজিসি এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিল। এভাবে একের পর এক ইউজিসির একতরফা ও স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চলমান শিক্ষা কার্যক্রমে যেমন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের সেশনজটের ঝুঁকি বেড়েছে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন— এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক এবং ডিজিটাল বাংলাদেশে উল্টো পথে হাঁটার মতো।

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধে ইউজিসির সিদ্ধান্তের ঘটনায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হাবিব বলেন, ‘অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে লাভ হবে না, ক্ষতি হবে শিক্ষার্থীদের। অনলাইনে আমাদের যেসব কোর্স করানো হয় তার প্রায় সবক’টি ৭০ শতাংশ করা হয়ে গেছে। দুটি বিষয়ে ৬৫ শতাংশ মার্কিংও করা হয়েছে। এখন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হলে এর সঙ্গে পরবর্তী ক্লাসগুলোর সমন্বয় করে নম্বরসহ গ্রেডিং করা সমস্যা হবে। এছাড়া ছুটি দীর্ঘ হলে আমাদের সেশনজটে পড়তে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে পরীক্ষা সাধারণ পরীক্ষার চেয়ে বেশি স্বচ্ছ ও বেশি কঠিন। অনলাইনে পরীক্ষা ও ওপেন বুক সিস্টেম একই রকম। তাই স্বচ্ছতা যত বেশি তত কঠিনও।’

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহিন প্রিতু বলেন, ‘অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম আরও উন্নত করা উচিত। আমরা গুগল ক্লাসরুমের মাধ্যমে ক্লাস করতাম, সেটি চলছে। তবে, মূল্যায়ন ও পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ আছে। ছুটি দীর্ঘ হলে অনলাইন কার্যক্রম না থাকলে সময় নষ্ট হবে। ফিল্ড ভিজিট ছাড়া অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রজেক্টসহ কিছু কাজ তো হতোই। যেগুলো অনলাইনে করা যায় সেগুলো করা উচিত। ভালোভাবে ভিডিও করে অনলাইন ক্লাস আপলোড করা উচিত। ছুটির সময় অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধে ক্ষতি তো হবেই, সময়ও নষ্ট হবে আমাদের।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি বলছে, করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে সরকার অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকারের নিজস্ব পোর্টাল ছাড়াও ইউটিউব চ্যানেল ব্যবহার করছে। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করছে ইউজিসি।

অনলাইনে শিক্ষা হঠাৎ বন্ধের পক্ষে দু’দফায় ইউজিসি কয়েকটি কারণ দেখিয়েছে। প্রথমেই বলা হয়েছে করোনাকালে স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা। এছাড়া দুর্যোগকালে শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও মানসিক চাপের প্রসঙ্গও উল্লেখিত হয়েছে। অনলাইনে শিক্ষার মান ও পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এসব যুক্তির বিপরীতে ড. এইচ এম জহিরুল হকসহ একাধিক ভিসি বলেন, বিরাজমান ভাইরাস সংক্রমণকালে অনলাইনই শিক্ষাক্রম চালু রাখার অন্যতম নিরাপদ উপায়। অনলাইনে শিক্ষার মান ও পরীক্ষার স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা সম্ভব বলেই হাভার্ড-অক্সফোর্ডসহ বিশ্বে সব সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ও অনলাইন নিয়মিত ব্যবহার করে এবং এখন আরও বেশি করছে।

ইউজিসির বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও আর্থিক কষ্টের কথা বলা হলেও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম মেহবুবউল হক বলেন, ‘দীর্ঘ ছুটি থাকলে সেশনজট সৃষ্টি হবে। আর এতে শিক্ষার্থীদেরই কষ্ট বাড়বে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় তিন দশকের ইতিহাসে এর আগে কখনও সেশনজট ঘটেনি। দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলে সেশনজট সৃষ্টি হবে।’

অনলাইন শিক্ষা বন্ধ প্রসঙ্গে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলী নকী বলেন, ‘কেন বন্ধ করা হয়েছে তা বোধগম্য নয়। অনেক আগে থেকেই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ছুটির এই সময় শিক্ষার্থীরা যাতে বাইরে ঘোরাঘুরি না করে, কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডে না জড়ায়, তারা যেন লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তবে যারা অনলাইনের সুযোগ নিতে পারবে না, তাদের সরাসরি ক্লাস নোট দিয়ে সহযোগিতা করে ছুটির সময় লেখাপড়া অব্যাহত রাখতে বলা হয়েছিল।’

সব শিক্ষার্থীর সমানভাবে ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার যে সুযোগ নেই, এ প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. এইচ এম জহিরুল হক বলেন, “এ ব্যাপারে আমরাও সচেতন। অনলাইনে শুধু ইমেইল থেকে শুরু করে লাইভ-ভিডিও পর্যন্ত নানা পর্যায়ে প্রাযুক্তিক সুবিধা আছে। এসব বিবেচনা করেই আমাদের অনলাইন শিক্ষাক্রম বিন্যাস করা হচ্ছে। তবে এরকম সময়ে টেলিকম কোম্পানিরা শিক্ষার্থীদের জন্যে কিছু বিশেষ ‘শিক্ষা প্যাকেজ’ চালু করলে ভীষণ উপকার হতো।”

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসন চালাতে যেখানে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্স করছেন, সেখানে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে সমস্যা কোথায়? অনলাইনে অ্যাসেসমেন্ট, গ্রেডিং ও পরীক্ষা নেওয়া হয় পৃথিবীর সব জায়গায়। তাই শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এটি ইউজিসির নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সফলভাবে চলমান শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ করার মনোভাব আদৌ বোধগম্য নয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ট্রাস্টি বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেলায় অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই একতরফা সিদ্ধান্ত দেওয়া ইউজিসির বহুদিনের অভ্যাস। কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর সঙ্গে যারা দৈনন্দিনভাবে জড়িত সেই অংশীজনদের উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া বাস্তবতা বিবর্জিত। বিশ্বের সব সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। ইউজিসি কেবল সেই রীতির বিপরীতে নয়, ডিজিটাল বাংলাদেশেরও উল্টো পথে হাঁটছে।’

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর উপাচার্য অধ্যাপক ড. এইচ এম জহিরুল হক বলেন, ‘বিদেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম চালানো হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে থেকেই শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইনের ব্যবহার ছিল। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে এর প্রয়োজন আরও বেড়েছে। এটা নিষেধ করে ইউজিসি সেশনজটের ঝুঁকি তৈরি করছে।’

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোফিজুর রহমান বলেন, ‘ক্লাসটেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট অনলাইনে নেওয়া যাবে না-এটা ইউজিসির আগেই বলে দেওয়া উচিত ছিল। ঢালাওভাবে বলে দিয়েছিল অনলাইনে ক্লাস নাও। আবার ঢালাওভাবে বলে দেওয়া হলো অনলাইনে ক্লাস নেওয়া যাবে না। এখন আবার বলছে শুধু ক্লাস নিতে। ক্লাস টেস্ট না নিলে শুধু ক্লাসে অংশ নিতে ছাত্ররা সাড়া দেবে না।’

ইউজিসি যে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা তুলেছে সেটাও যুক্তিযুক্ত নয় বলে মনে করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এইচএম জহিরুল হকসহ একাধিক শিক্ষক।

সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে ইউজিসি ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কথা বললেও এ উপ-উপাচার্য বলেন, ‘কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রেখেছে বলেই আমাদের অনলাইন কার্যক্রমও ঢালাওভাবে বন্ধ করতে হবে, এটা কোনও যুক্তি হতে পারে না।’

ইউজিসির সিদ্ধান্তের বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করে ইউজিসি একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হতে পারে তাদেরটাই ঠিক বা আমাদেরটাই ঠিক। কিন্তু আমাদের তো বিষয়টি জানাতে পারতো। আমরা শিক্ষামন্ত্রী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে এ বিষয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু ইউজিসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও আলোচনা করেনি। সচিব আমাকে বলেছেন তার সঙ্গে কথা হয়নি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, ‘এই দুর্যোগের সময় একটি সেমিস্টার বন্ধ থাকলে সমস্যা কোথায়? আগে সেশনজট থাকতো বছরের পর বছর। আমরা এখন বেঁচে থাকার চিন্তা করছি। শিক্ষার্থীদের এখন লেখাপড়া করার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি নেই। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পক্ষ থেকে ইউজিসিকে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্যে ৯ এপ্রিল চিঠি দিয়ে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কোনও আলাপ ছাড়াই ইউজিসি ছুটির দিন শুক্রবারেই একতরফা চিঠি ও প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের ৬ এপ্রিলে জারিকৃত নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে বলে জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায় যে গত ১২ এপ্রিল তারা পত্র মারফত শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অংশীজনের সঙ্গে মতালাপের ভিত্তিতে বিষয়টি সুরাহা করার অনুরোধ জানান।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ট্রাস্টি বলেন, করোনা সংকটে প্রতিষ্ঠান ও  চলাচল বন্ধ রাখার বিষয়টি কতদিন ধরে চলবে এটা কেউ বলতে পারছেন না।

অতএব, ইউজিসি কেবল একটা নিষেধাজ্ঞা ঠুকে দিয়ে বসে থাকবে, এটা হতে পারে না। যদি এ ধরনের বন্ধ মধ্য মেয়াদেও চলতে থাকে তখন অবশ্যই পাবলিক- প্রাইভেট এবং সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অনলাইনের আশ্রয় নিতে হবে। তার জন্যে প্রয়োজনীয় নীতি-পদ্ধতি কী হতে পারে সেটা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ করেই ঠিক করতে হবে এবং সেই উদ্যোগ অবিলম্বে নেওয়া উচিত।

/এফএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ