মানবপাচার বেশি হওয়া জেলাগুলোতে বাড়ছে নজরদারি

Send
শেখ শাহরিয়ার জামান
প্রকাশিত : ২৩:৫৯, জুন ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫৯, জুন ০৩, ২০২০

লিবিয়ায় মানবপাচারের অভিযোগে এ চক্রের মূলহোতা কামাল হোসেনকে ১ জুন গ্রেফতার করে র্যা ব।

মানবপাচারের মতো মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি বন্ধে গোটা সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন সরকারের নীতি-নির্ধারকরা। মানবপাচার ঠেকাতে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি  পাচারকারী বা পাচারের শিকার হওয়াদের ঠেকানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত অভিবাসন বিভাগ, এয়ারপোর্ট বা অন্য বন্দরের লোকজন, দূতাবাস, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আরও সতর্ক থাকার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ  করেছেন তারা।  বুধবার (৩ জুন) মানবপাচার প্রতিরোধে একটি উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে এসব আলোচনা হয়।

 বৈঠকে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে আরও নজরদারিতে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যেসব অঞ্চল থেকে বেশি মানবপাচার হয় সেসব এলাকার ওপর বাড়তি মনোযোগ দেওয়া এবং যারা জেনেশুনে অবৈধপথে যাচ্ছে ওইসব ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের পরিবারকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনার বিষয়েও চিন্তা করছে সরকার।

উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। বৈঠক শেষে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেকে জেনেশুনেই যায়। একদম কিছু জানে না এটি মনে হয় ঠিক না।’

মানবপাচার আইনকে শক্ত করা এবং বিচার প্রক্রিয়া আরও দৃঢ় করার জন্য বৈঠকে আলোচনা হয় জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘যে পরিবার থেকে এসব লোক যায় তাদের দায়দায়িত্ব আছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনা যায় কিনা সেটি খতিয়ে দেখছি। অনেকে মনে করে আমি বিদেশে যাওয়ার পরে সমস্যা হলে সরকার আমাকে উদ্ধার করবে। কিন্তু, এই গোটা প্রক্রিয়ায় ওই ব্যক্তি দেশের সুনাম নষ্ট করে, নিজের এবং পরিবারের বিপদ ডেকে আনে।’

জাপানের উদাহরণ টেনে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ওইদেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি এবং অনেকে বুলেট ট্রেন বা সাবওয়ের নিচে ঝাঁপ দেয়। এর ফলে সরকারের যে ক্ষতি হয় সেটি ওই আত্মহননকারীর পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয়, যাতে করে আত্মহত্যার ইচ্ছা যার মনে জাগছে সে নিজের পরিবারের আর্থিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে এই ধরনের পদক্ষেপ না নেয়।

লিবিয়ায় একটি অভিবাসন সেন্টারে বিশ্রামরত বাংলাদেশি অভিবাসীরা।

ইতালিতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে মাসুদ বলেন, আমার কাছে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত তাদের দুর্দশার বর্ণনা মৌখিকভাবে দিয়েছে। কিন্তু, আমি লিখিত অভিযোগ দিতে বললে প্রায় শতভাগই পিছিয়ে যেত। এর পেছনে ভয় বা লোভ দুটিই কাজ করে বলে তিনি জানান।

লিবিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, লিবিয়াতে গত ৪-৫ বছর ধরে কোনও ভিসা দেয় না এবং সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থাও এত ভালো নয় যে সেখানে মানুষ কাজ করতে যাবে।

তিনি বলেন, ‘লিবিয়াতে কাজ করার জন্য যাচ্ছে সেটি কেউ দাবি করলেও তা বিশ্বাসযোগ্য না। লিবিয়া কারও গন্তব্য নয়।’

মাসুদ বিন মোমেন

যারা মারা গেছে তারা মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লাসহ আরও কয়েকটি জেলার লোক জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের লোকজন বেশি আছে ইতালিতে এবং বোঝাই যায় এর মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে।’

তারা ওইদিকে যেতে চায় এবং মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত সমুদ্র শান্ত থাকার কারণে তারা সমুদ্র পাড়ি দেয় বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ‘এই বিপজ্জনক জেলা ও অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে ওইসব জায়গায় বেশি করে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।’

জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই এবং এই সমস্যা সমাধানে গোটা সমাজকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে হবে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মে লিবিয়ার মিজদা শহরে মানবপাচারকারীদের হাতে ২৬ বাংলাদেশি নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশি একটি দালালচক্র উন্নত জীবনের প্রলোভন ও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে করোনার মধ্যেই তাদের লিবিয়ায় নিয়ে যায়। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তাদের ইতালি হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করানোর আশ্বাস দিয়েছিল তারা। কিন্তু, লিবিয়াতে পাচারকারী স্থানীয় চক্রটি তাদের মারধর করে মুক্তিপণ চাইলে পাচারকারীদের স্থানীয় হোতা প্রথমে নিহত হয়। এরপর তাদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার পেলে আহতদের উদ্ধার ও নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি দায়ীদের ব্যাপারে কোনও ছাড় না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরইমধ্যে লিবিয়ায় পাচারকারী চক্রের মূল হোতা সন্দেহে হাজী কামাল ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এ ঘটনায় ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। আর মানবপাচারের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কর্ম পদ্ধতি নিয়ে বৈঠক চলছে। 

/টিএন/

লাইভ

টপ