স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক রিজেন্টকে সুপারিশ করেন যার নির্দেশে

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৮:০৬, জুলাই ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫২, জুলাই ১৫, ২০২০

রিজেন্ট হাসপাতাল

 

সাবেক স্বাস্থ্য সচিব আসাদুল ইসলামের নির্দেশেই বেসরকারি হাসপাতাল রিজেন্ট কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হিসেবে অনুমোদন পায় বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক সূত্র এবং একাধিক চিকিৎসক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন। এ সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রিজেন্টকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে মূল ভূমিকা পালন করেছেন অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান। তিনিই হাসপাতাল পরিদর্শন করে একে কোভিড ডেডিকেটেড করার জন্য সুপারিশ করেন।

হাসপাতালটি যথাযথভাবে পরিদর্শন করেই এখানে কোভিড শনাক্তের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে চিঠিতে বলেছেন ডা. আমিনুল হাসান। অথচ এই হাসপাতালটি টেস্ট না করেই কোভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ ও ‘নেগেটিভ’ সনদ দিতো।

গত ২১ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদফতর ও বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয় কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে। চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, তৎকালীন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসানের উপস্থিতিতে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ তার মালিকানাধীন উত্তরা ও মিরপুরে অবস্থিত রিজেন্ট হাসপাতালের দুটি শাখাকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে চুক্তি করে।

কিন্তু গত ৬ জুলাই হাসপাতালটিতে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব জানতে পারে, এ হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি ২০১৪ সালের পর। সেই সঙ্গে টেস্ট না করিয়ে রোগীদের রিপোর্ট দেওয়া, সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েও নমুনা সংগ্রহ ও রিপোর্টের বিনিময়ে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া, নিম্নমানের আইসিইউ, অননুমোদিত র‌্যাপিড টেস্টিং কিট দিয়ে পরীক্ষাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে মর্মে সরকারের কাছে এক কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার টাকার বিল জমা দিয়েছে রিজেন্ট।

এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুলাই রিজেন্টের মূল কার্যালয় এবং হাসপাতাল সিলগালা করে র‌্যাব। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অনিয়মের কারণে এবং দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স-১৯৮২ অনুযায়ী হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অনুমোদনহীন একটি হাসপাতাল কীভাবে মহামারির এই সময়ে সরকারি তালিকায় এলো? জানতে চাইলে গত ৯ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বোচ্চ একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওপরের কারও নির্দেশে রিজেন্টকে অনুমোদন দিয়েছেন। সেদিনই লাইসেন্সের মেয়াদ নবায়ন না করেই রিজেন্ট কীভাবে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের সনদ পেয়েছে তার ব্যাখ্যা তলব করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। জবাবে স্বাস্থ্য অধিদফতর তার দুই দিন পর (১১ জুলাই) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে। তার একদিন পর (১২ জুলাই) অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবি করে মন্ত্রণালয়। ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ বলতে স্বাস্থ্য মহাপরিচালক কী বোঝাতে চেয়েছেন সে বিষয়ে তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয় এবং তাকে তিন দিন সময় দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সচিবালয়ে বলেছেন, ডিজির অনুরোধে তিনি চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ছিলেন। তিনি নিজেও রিজেন্ট সম্পর্কে জানতেন না। পরে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ডিজির দেওয়া ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। তাতে যদি কারও দোষ পাওয়া যায় তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ২১ মার্চ চুক্তি সই হওয়ার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান স্বাক্ষরিত চিঠিতে লেখা রয়েছে, ‘করোনাজনিত জটিলতা মোকাবিলার জন্য সচিব মহোদয়ের নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের দুটি হাসপাতাল পরিদর্শন করা হয়। দুটি হাসপাতালের একটি ঢাকার মিরপুর-১২নং সেক্টরে এবং অপরটি ঢাকার উত্তরায় ৬নং সেক্টরে। প্রতিটি হাসপাতাল ৫০ শয্যার। প্রতিটিতে তিন বেডের আইসিইউসহ রোগ নির্ণয়ের সুবিধা ও জনবল আছে। জরুরি বিবেচনায় হাসপাতাল দুটি পরিচালিত করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনার জন্য অনুরোধ করা হলো।’ এর ঠিক দুই দিন পরই ২৩ মার্চ হাসপাতাল দুটিতে একজন করে চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ করেন তিনি।

৫ মে রিজেন্ট চেয়ারম্যান মো. সাহেদ করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের রোগী, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তার খাওয়ার খরচ বহন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে হাসপাতাল পরিচালক বরাবর আবেদন করেন।

গত ৯ মে আরেক চিঠিতে ডা. আমিনুল হাসান এ হাসপাতালকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের আদলে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো বলেও আবেদন করেন।

একাধিক সূত্র বলছে, রিজেন্ট হাসপাতাল নিয়ে সেখানে দায়িত্বরত দুই সরকারি চিকিৎসক অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু পরিচালক কোনও ব্যবস্থা নেননি। তার বদলে বরং রিজেন্টকে নানা সুবিধা দিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সবসময়ই বলে এসেছি স্বাস্থ্য অধিদফতর এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা ব্যতিরেকে দিতে পারে না। সেটাই এখন প্রমাণিত হচ্ছে।

লাইসেন্স না থাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণেই রিজেন্টকে ডেডিকেটেড করে দ্রুত কার্যাদেশ দিয়ে দেওয়াটা স্বাস্থ্য অধিদফতর ‘এককভাবে’ করতে পারে সেটা কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি। আর এর দায় অবশ্যই মন্ত্রণালয়ের ওপর আসবে। যে প্রতিষ্ঠানের আইনগত ভিত্তি নেই, যোগ্যতা নেই, তা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয় কোন যুক্তিতে এ নির্দেশনা দেয়, সে প্রশ্নের জবাব এখন মন্ত্রণালয়কে দিতে হবে।

এসব সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অধিদফতরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন কোন কাগজের মাধ্যমে কী কী সুবিধা আমিনুল হাসানের স্বাক্ষরে রয়েছে সে সবকিছুই মন্ত্রণালয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) একজন চিকিৎসক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ভালো সম্পর্ক থাকায় তিনি মহাপরিচালকের অনেক নির্দেশই পালন করতেন না, তাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করতেন না। এ নিয়ে আমরা তাকে (মহাপরিচালক) বারবার সতর্ক করেছি, কিন্তু তার কিছু করার ছিল না, হাসপাতাল পরিচালক ছিলেন ডেসপারেট।’

রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তির দিনে উপস্থিত থাকা একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সেদিন হাসপাতাল পরিচালককে অতি উৎসাহী দেখেছি। আমার ধারণা, মন্ত্রণালয় এবং হাসপাতাল পরিচালকসহ কিছু মানুষ জড়িত রয়েছে। তবে তাদের ওপরে বাইরে থেকে আর কারও রিকমেন্ডেশন ছিল কিনা, সেটা তারা বলতে পারবে।’

‘তবে হাসপাতাল পরিচালকের চিঠিতে দেখা যায়, তিনি সাবেক সচিবের নির্দেশে রিজেন্ট পরিদর্শন করেছেন। এ চিঠিকেও অগ্রাহ্য করা যাবে না’- বলেন তিনি।

এসব বিষয়ে জানতে ডা. আমিনুল হাসানের ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

/এমএএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ