স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা সুসংহত করা কঠিন: বঙ্গবন্ধু

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৭:৫৯, আগস্ট ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৯, আগস্ট ০৭, ২০২০

(বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকারি কর্মকাণ্ড ও তার শাসনামল নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বাংলা ট্রিবিউন। আজ পড়ুন ওই বছরের ৭ আগস্টের ঘটনা।)

সোনার বাংলাকে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জাতির প্রতি নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এর আগেও স্বাধীনতার পর থেকেই একাধিকবার নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। লন্ডন ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের পর প্রথম এনার প্রধান গোলাম রসূল মল্লিকের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা ও সুসংহত করার কাজ কঠিন বলে উল্লেখ করেন বঙ্গবন্ধু।

এসময় বঙ্গবন্ধুকে কৃশকায় ও বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল উল্লেখ করে ১৯৭২ সালের ৮ আগস্ট দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বলা হয়, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বলেন, তিনি তার দেশ ও দেশবাসীর ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই চান না। বঙ্গবন্ধুর এই অস্ত্রোপচারের বিলম্ব হলে তাকে চরম পরিণতির সম্মুখীন হতে হতো মনে করা হচ্ছিল। মিথ্যা বিচারের জন্য ইয়াহিয়ার কারাগারের নির্জন বন্দি থাকার সময়ে বর্তমান উপসর্গগুলো দেখা দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বলেন, দেশের মানুষের ভালোবাসা ও দেশকে ভালোবাসার জন্যই আমি বেঁচে আছি। তাদের ভালোবাসা জল্লাদ ইয়াহিয়ার কারাগার থেকে আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছে। শয্যায় বসেই বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে আলাপ করেন। এই সাক্ষাৎকারের সময় বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দেশের বন্যা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধু জানান, দেশের উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ জেলায় বন্যার খবরে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং খাবারের অভাবে কারও যাতে কোনওরকম অসুবিধা না হয় তার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য তিনি এর মধ্যে অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য আর পদস্থ সরকারি কর্মচারীদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এনার মাধ্যমে জাতির উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য জনগণকে কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বানও জানান।

বাঙালি পারবে, দরকার কঠোর পরিশ্রম

তিনি বলেন, কেবলমাত্র কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতি তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। সোনার বাংলার মানুষ স্বাধীনতা ও মাতৃভূমির গৌরবের জন্য যেভাবে মৃত্যু ও ধ্বংসকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছে তারা যে কোনও লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবেন। তিনি বলেন, অপেক্ষা করুন দেখতে পাবেন তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দেশ আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে। জাতির পিতা বলেন, সুখী ও সমৃদ্ধ জাতি গঠন আমাদের লক্ষ্য। বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপর ইয়াহিয়া বাহিনী যে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের উপযোগ ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চালিয়েছে সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ধর্মের নামে বাংলাদেশের মানুষের ওপর এই বর্বর অত্যাচার মানব ইতিহাসের সভ্যতার এক মর্মান্তিক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি এখনও বুঝতে পারছি না কেন বাংলাদেশের নিরীহ মানুষকে এমন নির্মমভাবে খুন করা হলো। তিনি বলেন, যে ইয়াহিয়া সরকার বাংলাদেশকে ধ্বংস স্তূপে পরিণত করে রেখে গেছে। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রত্যেকটি জায়গা হয় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে কিংবা আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে তারা বাঙালিদের মনোবল ও পশ্চিম পাকিস্তানের জল্লাদদের শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করার সুদৃঢ় সংকল্পকে হত্যা করতে পারেনি।

সুইজারল্যান্ডের আমন্ত্রণ গ্রহণ

বঙ্গবন্ধু আরোগ্যের পর বিশ্রামের জন্য সুইজারল্যান্ড সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। পররাষ্ট্র দফতর লন্ডন থেকে প্রাপ্ত এক বার্তায় এ কথা জানতে পেরেছে বলে বাসস জানায়। অন্যান্য দেশ থেকেও বঙ্গবন্ধু আমন্ত্রণ পেয়েছেন। তবে চিকিৎসকরা তাকে সুইজারল্যান্ড সরকারের আমন্ত্রণ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু সুস্থ হওয়ার পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এর নিয়ে এক সম্মেলনও আহ্বান করতে পারেন বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে ইন্দিরার শুভেচ্ছা

এদিন বঙ্গবন্ধু তার বিছানার চারপাশে কিছুটা হাঁটেন। বঙ্গবন্ধুর চিকিৎসক নুরুল ইসলাম তাকে পরীক্ষা করেন। ডাক্তাররা তার স্বাস্থ্যের উন্নতির ধারা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব দেশের পরিস্থিতি জানার জন্য নিজে ঢাকা সংবাদপত্রগুলো পড়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি ব্যক্তিগত বাণী বঙ্গবন্ধুর হাতে দেওয়া হয়। বাণীতে শ্রীমতি গান্ধী বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যের উন্নতি দেখে তিনি খুশি হয়েছেন। বাণীতে আরও বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর পূর্ণ রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করছেন।

অসাধু ব্যবসায়ীরা সক্রিয়

বন্যা খরা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার সুবাদে সারাদেশে অসাধু ব্যবসায়ীরা চাল-ডাল কেরোসিনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আবার বাড়াতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দ্রুতগতিতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়। ঢাকায়ও জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করে সেসময়। এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চাল ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামের খবর পাওয়া গেছে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলগুলো থেকে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে সরকার দেশে খাদ্য অভাব দূর করার জন্য বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ চাল আনছিল। সরকার দেশের খাদ্য পরিস্থিতির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল সন্দেহ নেই। সরকারের আপ্রাণ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সুযোগ হিসেবে নিয়ে স্বার্থলোভী অসাধু ব্যবসায়ীরা এ দেশের মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মারাত্মক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। অসাধু ব্যবসায়ী শ্রেণির এই প্রবৃত্তি সারা দেশকে ভয়াবহ সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

 

/এমআর/

লাইভ

টপ