টিকিট সংকটে সৌদি প্রবাসীদের ‘কপাল পোড়ার’ শঙ্কা

Send
আমানুর রহমান রনি ও সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ০৩:১০, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৮, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

সৌদি আরব প্রবাসীদের বিক্ষোভ‘ছুটি কাটাতে দেশে এসে এখন কপাল পুড়তে বসেছে। ফিরতি টিকিট কেটে এসেছি যেই এয়ারলাইন্সের, সেই এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হলো, অথচ সেখানে আমাদের জায়গা হচ্ছে না। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে না যেতে পারলে আমার চাকরি থাকবে না, ভিসায়ও জটিলতা হবে।’ সৌদি আরব প্রবাসী মোস্তফা জামাল প্রিন্স নামে এক যুবক তার শঙ্কার কথা এভাবেই বর্ণনা করেন।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে রাজধানীর কাওরান বাজারে সোনারগাঁও হোটেল সংলগ্ন সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের টিকিট বুকিং অফিসের সামনে দ্বিতীয় দিনের মতো তিন শতাধিক প্রবাসী ভিড় করেন। যারা ফিরতি টিকিট কেটে ছুটিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে লকডাউনের কারণে তারা আর নির্দিষ্ট সময় সৌদি যেতে পারেননি। তাই আটকা পড়েন নিজ দেশে। সৌদি সরকার নিজ দেশের ফ্লাইট চলাচলের অনুমোদন দিলেও তাতে আসন মিলছে না প্রবাসীদের। ফিরতি টিকিটেও তারা আসন পাচ্ছেন না। তাই সহসা ফিরতে পারছেন না কাজে। এ কারণে তারা আন্দোলন করছেন।

প্রবাসী মোস্তফা জামাল প্রিন্সের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং এলাকায়। জেদ্দার হারাজাদ এলাকায় তিনি কাজ করেন। তিন বছর পর দেশে আসেন গত ৯ জানুয়ারি। এরপর করোনা মহামারিতে তিনি দেশেই আটকা পড়েন। তাই ছুটি শেষ হলেও আর সৌদি ফিরতে পারেননি। তিন দফায় ইকামা ও ভিসার মেয়াদ সৌদি সরকার বৃদ্ধি করলেও এখনও সংকট কাটেনি তার। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সৌদি না যেতে পারলে থাকবে না চাকরি। তাই ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সৌদি যেতে মরিয়া তিনি। তার মতো শত শত প্রবাসীর চিত্র একই। তারা সৌদি এয়ারলাইন্সের ওপর ক্ষুব্ধ।

ছুটিতে দেশে এসে প্রিন্সের মতো ৩৫ হাজার সৌদি আরব প্রবাসী শ্রমিক আটকা পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকরা। এই সংখ্যা কেউ কেউ লাখও দাবি করেছেন।

৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিরতেই হবে কয়েক হাজার শ্রমিককে

সৌদিতে চার বছর ধরে কাজ করেন গোপালগঞ্জের এমদাদ হোসেন, করোনা সংক্রমণের আগে দেশে ছুটিতে এসে আটকা পড়েন তিনি। এখন হন্যে হয়ে খুঁজছেন ফ্লাইটের টিকিট, কিন্তু মিলছে না। তাই নিরুপায় হয়ে অপেক্ষা করছেন কাওরানবাজার মোড়ে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৩০ তারিখে ভিসার মেয়াদ শেষ আমার। এর মধ্যে না যেতে পারলে আমাদের সব কিছু বাদ হয়ে যাবে। আমার কফিল (নিয়োগকর্তা) আমাকে জানাইসে আমরা যেতে পারবো না। এখান থেকে ২৩ তারিখে ফ্লাইট ছাড়ার কথা কিন্তু আমাদের টিকিট দিচ্ছে না। সৌদি সরকার ইকামার মেয়াদ একবার বাড়িয়ে দিলো ৩ মাস, সেটা শেষ হবে ৩০ তারিখে। এরপর আর বাড়ানোর কোনও পরিকল্পনা আছে বলে আমরা শুনি নাই। সৌদি এয়ারলাইন্সের লোকজন আমাদের কিছুই বলে নাই, তারা গেট তালা লাগিয়ে দিয়েছে। তারা পুলিশি পাহারায় আছে।

সৌদি আরব প্রবাসীদের বিক্ষোভটাঙ্গাইলের মো. রফিকুল ইসলাম সৌদিতে ঝালাইয়ের কাজ করেন। এই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি  তিনি দেশে ছুটিতে আসেন। করোনার কারণে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আটকা পড়েন তিনিও। তিনি বলেন, ‘সৌদি সরকার এক এক করে ৩ বার ছুটি বাড়াইলো, বাংলাদেশের সরকার কোনও গুরুত্বই দেয় না। সরকারের উচিত সৌদি সরকারের সঙ্গে কথা বলে ইকামার মেয়াদ আরও এক মাস বাড়ানো। এক মাস বাড়ালে সব মানুষ ভালোমতো যেতে পারবে।’

পাশেই দাঁড়ানো কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে আসা টিকিট প্রত্যাশী শরিফ বলেন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ছাড়া আর কিছু না। এখানে কত অসহায় মানুষ আছে যারা যেতে পারছে না। তাদের একজনের আয়ে পুরো সংসার চলে। অথচ এগুলা বুঝার কেউ নাই। প্রবাসীদের কথা কেউ ভাবে না। 

টিকিটের জন্য আন্দোলন ও বেশি টাকা সবই দিতে চায় প্রবাসীরা

সোনারগাঁও হোটেলের সামনে অবস্থান নেওয়া প্রবাসীরা টিকিটের জন্য নির্ধারিত টাকার বাইরেও বেশি টাকা দিয়ে টিকিট নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে ঠিক করে কিছুই বলা হচ্ছে না। অনেক প্রবাসী লিংক ধরে বেশি টাকা খরচ করে টিকিট নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে সফল হননি তারা। গত রবিবার থেকে টোকেন সিস্টেম চালু করে সৌদি এয়ারলাইন্স। টোকেনের সিরিয়াল অনুযায়ী টিকিট প্রার্থীদের ডাকার কথা। মোশারফ হোসেন নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘যাদের আগে টোকেন নেওয়া ছিল শুধু তাদের কয়েকজনের নামের তালিকা নিয়ে গেছে সৌদি এয়ারলাইন্স। আর কিছু বলেনি তারা। আবার অনেক প্রবাসী আগে টোকেন নিলেও তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘২০ তারিখে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কষ্ট করে টোকেন নিলাম, সিরিয়াল ১৫০৩। আজকে পর্যন্ত টিকিট নিতে পারলাম না, তাহলে আমার লাভ হলো কী লাইনে কষ্ট করে দাঁড়িয়ে।’

ছয় মাসে সৌদি থেকে দেশে ফিরেছেন প্রায় ৩৫ হাজার প্রবাসী

সৌদি আরব থেকে করোনাকালীন সময়ে (১ এপ্রিল থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) দেশে ফিরেছেন ৩৩ হাজার ২১৬ জন। এর মধ্যে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন ৭ হাজার ৫৬২ জন এবং পাসপোর্টসহ দেশে ফিরেছেন ২৫ হাজার ৬৫৪ জন। এদের মধ্যে অনেকে আউটপাসে এবং অনেকে ছুটিতে দেশে ফিরেছেন বলে জানায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন। ফিরে আসাদের মধ্যে পুরুষ আছেন ২৮ হাজার ৩১৫ জন এবং নারী আছেন ৪ হাজার ৯০১ জন। এদের অধিকাংশদের ছুটির মেয়াদ শেষ। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সৌদি আরব না যেতে পারলে তারা চাকরি হারাবেন।

যে সংকটে পড়েছেন প্রবাসীরা

শর্ত সাপেক্ষে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর অনুমতি দেয় সৌদি আরব সরকার। এরপর সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে অনুমতি চায়। একইভাবে বিমানও বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করতে সৌদি অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চায়। আকাশপথ নীতিমালা অনুযায়ী, এক দেশ আরেক দেশকে সমানসংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা অনুমতি দেওয়ার কথা। বেবিচক সৌদি এয়ারলাইন্সকে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট চালানোর অনুমতি দিলেও বিমানকে অনুমতি দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। এর ফলে সৌদি এয়ারলাইন্সের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় বেবিচক। এতে বিপাকে পড়েন সৌদি আরবে ফিরতে চাওয়া প্রবাসীরা। তাদের অধিকাংশেরই ফিরতি টিকিট সৌদি এয়ারলাইন্স ও বিমানে করা আছে। বিমান চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় সংকটে পড়েছেন প্রবাসীরা। তবে বাংলাদেশ বিমান দাবি করেছে সৌদি আরবের কাছ থেকে ল্যান্ডিং কনফারমেশন পেলে যত বিমান লাগবে তারা দেবে।

সৌদি আরব প্রবাসীদের বিক্ষোভশুক্রবার পর্যন্ত সরকারকে সৌদি প্রবাসীদের আল্টিমেটাম 

সংকট সমাধানে বাংলাদেশ সরকারকে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন প্রবাসীরা। এই সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে পুনরায় তারা আরও কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন।

এ সপ্তাহে সৌদি এয়ারলাইন্সের আরও পাঁচটি ফ্লাইট চলবে

আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও চার থেকে পাঁচটি উড়োজাহাজ পরিচালনার কথা জানিয়েছে সৌদি এয়ারলাইন্স। এই এয়ারলাইন্সের বাংলাদেশ অফিসের ম্যানেজার জাহিদুল ইসলাম মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ সপ্তাহে আরও চার পাঁচটি ফ্লাইট থাকবে। এসব ফ্লাইটে যাদের টিকিট রয়েছে তারা যেতে পারবেন।’ তবে এতে সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন প্রবাসীরা।

সময় বাড়াতে ফের সৌদি সরকারকে বাংলাদেশের চিঠি

চতুর্থ দফার মতো বাংলাদেশিদের সৌদি আরবে যাওয়া নিশ্চিত করতে সে দেশের সরকারকে তিন মাসের জন্য ইকামার মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে দুই দফায় তিন মাস করে ছয় মাস এবং সবশেষ এক মাসসহ তিনবার বাংলাদেশিদের ইকামার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দেশটিতে বাংলাদেশ দূতাবাস এই অনুরোধ জানিয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠিতে ইকামা ও ভিসার মেয়াদ তিন মাসের জন্য বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সৌদি সরকারকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

সমস্যা সমাধানে প্রবাসীদের সরকারের আশ্বাস

সৌদি  প্রবাসীদের ভিসা ও ইকামার মেয়াদ বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাসুদ মোহাম্মদ খন্দকার। মঙ্গলবার দুপুরের পর প্রবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলে প্রবাসীদের কর্মকর্তারা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। এই প্রেক্ষিতে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করেছেন টিকিট প্রত্যাশী প্রবাসীরা।

/এফএএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X