মৃত্যুতেই শেষ হলো দেশের দীর্ঘমেয়াদি অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব

Send
বাহাউদ্দিন ইমরান
প্রকাশিত : ২২:৫৪, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৯, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

মাহবুবে আলমসদ্য প্রয়াত অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘসময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী অ্যাটর্নি জেনারেল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে আইনি লড়াই করেছেন তিনি। তার সেসব আইনি দক্ষতার কারণে তিনি সমাদৃত হয়েছেন প্রতিথযশা আইনজীবী হিসাবে। তাই মাহবুবে আলমের জীবদ্দশায় তার বিকল্প খোঁজা হয়নি কখনও। আর এভাবেই মাহবুবে আলম বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১১ বছর ৮ মাস ১৪ দিন। অবশেষে মৃত্যুর কাছে অবসান ঘটলো তার সে দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের।

আরও পড়ুন: বিচার বিভাগ এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে যাবে: মাহবুবে আলম

অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম অত্যন্ত নম্র ছিলেন। আইনজীবী হিসেবে তিনি আমরা সঙ্গে অনেক কাজ করেছেন। ভালো আইনজীবী ছিলেন। আইনের দক্ষতা ও সততা ছিল তার মাঝে। দক্ষতার কারণে তিনি আইন পেশার প্র্যাকটিস জীবনে ভালো সফলতা পেয়েছেন। তার বিকল্প এ মুহূর্তে ভাবা যায় না। একজন অ্যাটর্নি হিসাবে যে দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয়, বর্তমানে তা কারও মাঝেই সেভাবে প্রতীয়মান নয়। তাই মাহবুবে আলমের বিকল্প খুঁজতে আরও সময় লেগে যাবে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট এএম আমিন উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ এক অপূরণীয় শূন্যতা। এখন পর্যন্ত তার বিকল্প এই বারে কাউকে ভাবা যায় না। তিনিই তার বিকল্প ছিলেন। এখন তার জন্য দোয়া করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও এ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুসারে জানা গেছে মাহবুবে আলম ১৯৪৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দ্রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও ১৯৬৯ সালে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৭২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।


তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে আইন পেশা পরিচালনার অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশা পরিচালনার অনুমতিপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৮০ সালে আপিল বিভাগে আইন পেশা পরিচালনার অনুমতি পান। ১৯৯৮ সালে আপিল বিভাগের সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি।
মাহবুবে আলম সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ১৯৯৩-৯৪ সালে সম্পাদক ও ২০০৫-২০০৬ সালে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ২০০৪-২০০৭ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ১৯৭৯ সালে ভারতের নয়াদিল্লির ইনস্টিটিউট অব কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ থেকে সাংবিধানিক আইন ও পার্লামেন্টারি বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৯৮ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ২০০১ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি মাহবুবে আলম বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং পদাধীকারবলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাহবুবে আলমের আগে খন্দকার আবু বকর দীর্ঘদিন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৬ সালের ১১ মে নিয়োগ পান এবং ১৯৮৫ সালের ১৩ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৮ বছর ১০ মাস ২ দিন দায়িত্বপালন করেন।


ব্যক্তি জীবনেও মাহবুবে আলম একজন সফল মানুষ ছিলেন। এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। পুত্র সুমন মাহবুব পেশায় সাংবাদিক। কন্যা শিশির কনা ও জামাতা শেখ রিয়াজুল হকও আইনপেশায় আছেন। তার স্ত্রী বিনতা মাহবুব একজন স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী।


মাহবুবে আলম একজন ভ্রমণ প্রিয় মানুষ। তিনি বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামসহ বেড়ানোর উদ্দেশে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, হংকং, কোরিয়া ও তানজানিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশ সফর করেছেন।
বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল পদে থাকাকালে মাহবুবে আলম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য সংবিধানের ৫ম, ৭ম ও ১৩তম, ১৬ তম সংশোধনী মামলা, বিডিআর বিদ্রোহ হত্যা মামলা, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, কাদের মোল্লা, মো. কামরুজ্জামান, আলী আহসান মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে থেকে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনা করেছেন।
প্রসঙ্গত, মাহবুবে আলম আজ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭ টা ২৪ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। জ্বর ও গলা ব্যথা নিয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর তিনি সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই দিনই করোনা পরীক্ষা করালে রিপোর্ট পজিটিভ আসে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

/এমআর/

লাইভ

টপ
X