পাবলিশারের অভাবে মোবাইল গেমের বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১৩:০০, অক্টোবর ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৪, অক্টোবর ২১, ২০২০

মোবাইল গেম (ছবি সংগৃহীত)

দেশের পিসি গেমিংয়ের মার্কেট পুরোটাই বিদেশি গেমের দখলে। পিসি গেমের ডিভাইসেরও বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে, প্রায় ৫০০ কোটি টাকার।  দেশীয় পিসি গেমের কোনও অস্তিত্ব না থাকলেও মোবাইল গেমসে বাংলাদেশের উপস্থিতি দিন দিন উজ্জ্বল হচ্ছে। মার্কেট সাইজ এখনও ঠিক করা না গেলেও বাজারের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে।  মোবাইলে পাবজি ও ফ্রি-ফায়ার বেশ জোরেশোরে খেলা হলেও এ দেশের তৈরি অনেক গেমস যাচ্ছে বিদেশে।  যাচ্ছে প্লেস্টোরে। নিজের দেশেও থাকছে।  তবে উপযুক্ত গেম পাবলিশার বা প্রকাশকের অভাবে দেশের ছোট মার্কেটটি তেমন বড় হতে পারছে না।

দেশে গেমস সাধারণত দুইভাবে তৈরি হয়। প্রথমত বাণিজ্যিক বা ফরমায়েশের ভিত্তিতে। কোনও প্রতিষ্ঠান অর্ডার করলে, তাদের ফরমায়েশ অনুযায়ী গেম তৈরি করে দেওয়া হয়। ব্যস, এখানেই কাজটি শেষ।  মীনাও এমন একটি গেম।  অন্যদিকে আরেকটি গ্রুপ নিজেরা গেম তৈরি করে প্লেস্টোরে আপ করছে।  সেখান থেকে দেশ-বিদেশের গেমাররা ডাউনলোড করে খেলছে।  গেমস নির্মাতারা নিয়মিতভাবে তা আপগ্রেড করছে, নতুন নতুন ভার্সন নিয়ে আসছে।  ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস এমনই একটা গেম বলে জানা গেছে।

দেশীয় গেমের মধ্যে রাইজ আপস ল্যাবসের তৈরি ট্যাপ ট্যাপ অ্যান্টস (এখন অবধি ১৫ মিলিয়নবার এই গেমটি প্লেস্টোর থেকে ডাউনলোড করা হয়েছে বলে জানা গেছে), আর এমসিসি লিমিটেডের তৈরি মীনা গেম সবসময়ই ভালো খেলা হয় বলে দাবি নির্মাতাদের।

তবে অনেক গেমার আছেন যারা গেম তৈরি করছেন, কিন্তু ভালো প্ল্যাটফর্মের অভাবে নিজেদের বিকশিত করতে পারছেন না।  গেম বানাবেন, নাকি গেমটি কোন পাবলিশার প্রকাশ করবেন তা খুঁজবেন!  ফলে গেমের পাবলিশারের সংকট দেখা দিয়েছে দেশে।   সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করলেন, দেশে কোনও গেম পাবলিশার নেই। গেমের বাজার বড় করতে গেলে ডিজনি, প্লে প্লে ফান, জেপ টু ল্যাব, হেডআপ গেমস, টিম ১৭, প্যারাডক্স, ইন্টারঅ্যাক্টিভ ন্যানোভেশনের মতো পাবলিশার প্রয়োজন।

অন্যদিকে সরকার সারাদেশে আগ্রহী তরুণদের মোবাইল গেম ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক তরুণকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।  প্রশিক্ষণ শেষে একটা বড় অংশ গেমার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে মনে করে সরকার। জানতে চাইলে এ বিষয়ে আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মোবাইল অ্যাপসে আমাদের ছেলেমেয়েরা অত্যন্ত ভালো করছে। এর আগে তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে ৫০০ অ্যাপ তৈরি করেছিল। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় হাতে নেওয়া হয়েছে মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো— দেশে গেমের বাজার তৈরি ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।’

আইসিটি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ১০ হাজার গেমারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।  ৭০০ জনকে অ্যাডভান্স পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।  আগামীতে আরও ১০ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।  এর উদ্দেশ্য হলো— গেম ও অ্যাপ ডেভেলপার তৈরি করা।  জানা গেছে, ভারতে ১০ লাখ তরুণকে গেমিং ও মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্টের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সে দেশের সরকার।  ডিজিটাল ইন্ডিয়া গড়ে তোলার পদক্ষেপ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এমসিসি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম আশ্রাফ আবীর বলেন, ‘আমরা সাধারণত বাণিজ্যিক গেম তৈরি করি।  কেউ আমাদের বললে আমরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী গেম তৈরি করে দিই।’  জানা গেলো, এমসিসি শিক্ষা ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে গেম তৈরি করেছে।  এমসিসি এরই মধ্যে ইউনিসেফ, বিবিসি, ইউএনডিপির জন্য গেমস তৈরি করে দিয়েছে।  এসএম আশ্রাফ আবীর আরও বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠান, সংস্থা আছে যারা প্রচারণা, বিপণনের কাজে গেমস ব্যবহার করে থাকে।  অনেক জনপ্রিয় ক্যারেক্টার রয়েছে— যাদেরকে গেমসে রূপ দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রচারণার কাজ চালাচ্ছে।’  তিনি জানান, দেশীয় গেমসের বাজার খুব ছোট।  বাজারটিকে সম্মিলিতভাবে বড় করতে হবে। মূল দায়িত্ব সরকারের। তবে বেসরকারি উদ্যোগেও এ খাতটির অগ্রগতি একেবারে কম নয়।

বিদেশি গেমসের আধিপত্য, জনপ্রিয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশীয় কনটেন্টের অভাব রয়েছে। ফলে বিদেশি গেমসের প্রতি তরুণরা আকৃষ্ট হচ্ছে।  তবে তিনি আশাবাদী, সরকার তরুণদের মোবাইল অ্যাপস ও গেমস বিষয়ে প্রশিক্ষণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেখান থেকে অনেকে ডেভেলপার বের হয়ে আসতে পারে।  তারা লোকাল ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দিতে পারে, আউটসোর্সিং করতে পারে।  আগামীতে আমরা এর থেকে ভালো কিছু পাবো।’

দেশীয় গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাসিভ স্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আলম বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে তৈরি গেমস তরুণরা বেশি একটা খেলে না।  এমনকি ব্যাপকভাবে প্লেস্টোরেও যায় না।  যেটা হচ্ছে বিদেশি গেম বেশি খেলা হচ্ছে।’ তবে করোনার এই সময়ে দেশি গেম আগের চেয়ে বেশি খেলা হচ্ছে বলে তিনি জানান।  তার প্রতিষ্ঠানের তৈরি যুদ্ধ ৭১ (৬টি পার্ট, প্রতিটি পার্টই পূর্ণ গেম) বেশি খেলা হচ্ছে।  তিনি উল্লেখ করেন, তাদের তৈরি হাতিরঝিল গেমটি অনেকদিন প্লেস্টোরে ছিল।  তিনি উল্লেখ করেন, গেম নিয়মিত আপগ্রেড করতে হয়, নতুন ভার্সন আনতে হয়।  এজন্য বড় বিনিয়োগ লাগে।  আমাদের যে গেমের বাজার তাতে করে শুধু গেমস দিয়ে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। ফলে গেম নির্মাতা কোম্পানিগুলো দাঁড়াতে পারছে না।

দেশের বিখ্যাত গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পিনঅফ স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আবু সায়িদ মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান জানান, তার প্রতিষ্ঠান থেকে মারস্ক, এরিকসন, সিমেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য গেম তৈরি করেছেন।  মারস্কের জন্য স্পিন অব স্টুডিও তৈরি করেছে কীভাবে সমুদ্রের তলদেশ থেকে খনিজ পদার্থ আহরণ করা হয়। এরিকসনের জন্য তৈরি করেছে শিক্ষণ বিষয়ক গেমস আর সিমেন্সের জন্য তৈরি করেছে উইন্ডমিল কীভাবে মেইনটেইন করতে হয়—সেসব গেমস।  এছাড়া ট্যাং, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) জন্যও তার প্রতিষ্ঠান গেমস তৈরি করেছে।  তিনি এসব গেমসকে বলতে চান গেমিফিকেশন (মার্কেটিং ও কমিউনিকেশন টুলস)।

তিনি জানান,  বাংলাদেশে এখন গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, গেম ডেভেলপারের পাশাপাশি গেম পাবলিশার প্রয়োজন।  এটা করা কঠিন কিছু নয়, খুবই সহজ।  বিনিয়োগ করতে হবে।  চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশের নিজস্ব গেম পাবলিশার আছে।  ফলে সেসব দেশ গেমস ব্যবসায় ভালো করছে। তাদের নিজস্ব গেমস বিশ্ব পরিমণ্ডলে খেলছে লোকজন।  আমাদের দেশে কিছু গেমস আসছে বটে, কিন্তু পাবলিশারের অভাবে তা ভালো মার্কেট পাচ্ছে না।  তিনি জানান, দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো কিছু গেমস তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করে থাকে।  এটার পরিমাণ খুব বেশি নয়।  তারা এটা করে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য।  ব্যাপারটা এমন, যা আয় হয় হলো।

তিনি উল্লেখ করেন, প্লেস্টোরে এখন গেমস দিয়ে গেমারদের নজরে পড়ার দিন আর নেই। প্রতিদিন হাজারো গেম প্লেস্টোরে জমা পড়ছে।  আজ থকে বছর দশেক আগে দিনে ১০ থেকে ১৫টি গেম হয়তো জমা পড়তো।  নিউ অ্যাপ অপশন ছিল।  ফলে সহজে তা সবার নজর কাড়তো— দেখি কী কী গেম এলো।  তিনি জানান, মোবাইল গেম তৈরি করে এখন দেশের বাইরে বিক্রি করা বেশ কঠিন।  বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পেরে ওঠাও কঠিন বটে।  ফলে দেশীয় গেমসের তেমন কোনও বাজার বিদেশে নেই।  বছর দশেক আগে ছিল।  তখন দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ খাত (বিদেশের বাজার) থেকে ভালো পরিমাণের অর্থ আয় করতো। আমাদের ডেভেলপাররা খুবই উৎসাহী, আন্তর্জাতিকমানের গেম তৈরি করতে পারে। কিন্তু তারা কেউ উপযুক্ত পাবলিশার নয়।  উপযুক্ত পাবলিশারের অভাবে ‘গেমস মার্কেট গ্রো’ করছে না।

জানা গেছে, গেমস থেকে আয় হয় তিনভাবে— বিজ্ঞাপন থেকে, গেম বিক্রি করে এবং গেমস কম্পোনেন্ট (ইন অ্যাপ পারচেজ) বিক্রি করে।

গেমস ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্তরা বলছেন, শুধু প্রশিক্ষণ নিয়েই গেম ডেভেলপার হওয়া যাবে না।  গণিত, জ্যামিতি ও পদার্থবিদ্যায় ভালো দক্ষতা থাকলে ভালো গেম ডেভেলপার হওয়া যাবে।  প্রশিক্ষণার্থীদের গেম তৈরির প্রতি প্যাশন থাকতে হবে।  যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তাতে করে প্রশিক্ষাণার্থীরা অ্যানিমেশন তৈরি, গ্রাফিক ডিজাইনে তথা গেমস আর্ট ডেভেলপমেন্টে ভালো করতে পারবে।  বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ক্রিয়েটিভ তৈরি, এডিটিংয়ে ভালো করতে পারবে।  সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, তারপরও তারা যা শিখছে তাই নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করছে, এটা একটা ভালো লক্ষণ।

 

 

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ