ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ বছরের তরুণ ইব্রাহিম প্রথমবারের মতো ওমানের সালালাহ শহরে গিয়েছেন এমপ্লয়মেন্ট ভিসায়। যদিও তার যাত্রার শুরুটা শুভ ছিল না। ভিসা, বিমানের টিকেট থাকা সত্বেও ইব্রাহিম গত ১২ এপ্রিল মঙ্গলবার ওমানে যেতে গিয়ে ফ্লাই দুবাইয়ের প্রতারণার শিকার হন। তখন ইব্রাহিমের পাশে দাঁড়ান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসুফ। মোবাইল কোর্টের অভিযানে বের হয়ে আসে ইব্রাহিমের মত হাজারো যাত্রীকে সেবা থেকে বঞ্চিত করার ভয়াবহ সব তথ্য। ফলে সাড়ে ৬ লাখ টাকা জরিমানা গুণতে হয় ফ্লাই দুবাইকে। একই সঙ্গে ফ্লাই দুবাই ইব্রাহিমকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ হিসেবে আগামী একবছরের জন্য উন্মুক্ত ওয়ানওয়ে টিকেট দেয়।
ভোক্তা অধিকার আইন অনুসারে ফ্লাই দুবাইকে করা জরিমানার ২৫ শতাংশ হিসেবে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা পান ভূক্তভোগী ইব্রাহীম। এভাবেই ইব্রাহিমের মতো অসংখ্য যাত্রীর আস্থার জায়গায় পরিণত হয়েছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের দায়িত্বে আছেন দু’জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। যাত্রী হয়রানি, ব্যাগেজ কাটাছেঁড়া, লাগেজ হারানো, লাগেজ থেকে চুরি, অবৈধভাবে অর্থ আদায়সহ নানা অভিযোগ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে করেন যাত্রীরা। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে অপরাধীদের শনাক্ত করে সাজা দিচ্ছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ অন্যান্য সমস্যার সমাধানও দিচ্ছেন তারা। পাশাপাশি যাত্রীদের অধিকার সর্ম্পকে সচেতন করতেও কাজ করছেন দুই ম্যাজিস্ট্রেট।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ সংযুক্ত আছেন ম্যাজিট্রেট কোর্টের (https://www.facebook.com/magistrates.all.airports.bangladesh) অফিসিয়াল পেজে। এই পেজের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতনও করা হচ্ছে। এই পেজে গিয়ে দেখা গেছে, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের কার্যক্রম নিয়ে অনেকেই প্রশংসা করছেন। কেউ কেউ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে অভিযোগও করছেন।
আরো পড়ুন: কোপাকুপির আতঙ্কে কাঁপছে দেশ
জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের মার্চ থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালু হয় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ প্রণীত হওয়ার পর মূলত বিমানবন্দরের অপরাধের ধরনের সঙ্গে এর কার্য ক্ষমতা বাড়ে। একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করলেও কোর্টের প্রতি যাত্রীদের নির্ভরতা বাড়ে ২০১৪ সালের শেষ দিকে। ২০১৪ সালের ৬ জুলাই শাহজালালে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে আসেন শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন। একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর দায়িত্বে আসেন অপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসুফ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই যাত্রীদের নানা অভিযোগ ও সমস্যার সমাধানে তৎপর হয়ে ওঠেন এই দুই ম্যাজিস্ট্রেট। কোর্টের উদ্যোগে যাত্রীরা খুঁজে পান নির্ভরতার জায়গা। যাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা, হয়রানিসহ নানা অভিযোগে অর্থদণ্ড, কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সসহ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মীদের।
বর্তমানে ফেসবুকে অভিযোগ জানানোর পরও যাত্রীরা পাচ্ছেন সমস্যার সমাধান। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় মাসকাটগামী আরএক্স-৭২৩ ফ্লাইটে ওভারবুকিংয়ের কারণে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ৬ জন যাত্রীর বোর্ডিং ডিনাই করে। কোনও প্রকার থাকা-খাওয়া-যাতায়াতের ব্যবস্থা না করে ৬ যাত্রীকে টিকেটে সমস্যা দেখিয়ে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করে। যাত্রীরা নিজ নিজ ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয় যে, টিকেটে কোনও প্রকার সমস্যা নেই। তবুও এয়ারলাইন্সটি ফ্লাইটে সিট নেই জানিয়ে তাদের দুইদিন পরে আসতে বলে। সেদিন রাতেই ‘ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের ফেইসবুক পেইজে’ এই হয়রানির চিত্র তুলে ধরেন সেই ৬ যাত্রীদের পরিচিত একজন।
ফেসবুক থেকে তাৎক্ষণিক ভুক্তভোগী যাত্রীদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসুফ। পরদিন ভোরে যাত্রী আমির এবং রিজেন্ট এয়ারের স্টেশন ম্যানেজারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে ঘটনার সত্যতা জেনে উভয়পক্ষকে তলব করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসুফ। যাত্রী আমির হোসেন, নিরঞ্জন ঋষি, মাসুম বিল্লাল, রাশেদ মিয়া, ইনসান আলী ও মোহাম্মদ আলীসহ মোট ৬জনের পৃথক পৃথক অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিশ্রুত সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ভোক্তা অধিকার আইনের ৪৫ ধারায় প্রত্যেক অভিযোগের বিপরীতে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এয়ারওয়েজটিকে। আইন অনুসারে জরিমানার ২৫ শতাংশ যাত্রীদেরকে প্রদানের নির্দেশ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ওভারবুকিং পলিসি ও তার রিমিডিয়াল পলিসি এডপ্ট না করা পর্যন্ত এভাবে যাত্রী হয়রানির পুনরাবৃত্তি না করারও নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এ ধরনের হয়রানির দায়ে একইভাবে এয়ার অ্যারাবিয়া, ইউনাইটেড এয়ার এবং টার্কিশ এরালাইন্সকেও বিভিন্ন সময়ে জরিমানা করা হয়েছে।
কোর্টের এই দুই ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে আসার পর শুরুটা এত সহজ ছিল না বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, শাহজালালে দায়িত্বে আসার শুরুতে একজন দৈনিকভিত্তিক নিরাপত্তা কর্মীর পরিচয়পত্র জব্দ করার পর নানাদিক থেকে চাপ আসে। তখন বুঝতে পারি এখানে অপরাধীদের শিকড় কত গভীর! আমরাও কৌশলের অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাত্রীদের সচেতন করা শুরু করি। যাত্রীরা সচেতন হয়, কোনও অনিয়ম হলে তারা প্রতিবাদ করেন, আমাদের কাছে অভিযোগ করেন। আমাদের মূল লক্ষ্য যাত্রী সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফলে যাত্রীদের সমর্থন পেয়েছি। কিন্তু এখনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।
অারো পড়ুন: ‘জয়কে অপহরণের কথা শফিক রেহমান হয়তো জানতেন কিন্তু জড়িত নন’
যাত্রীদের এত অভিযোগ আসে যে সবগুলোর বিচার করলে এয়ারপোর্টে অনেক ব্যক্তিকে সাজা পেতে হতো উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এজন্য গুরুতর অপরাধগুলোর বিচার করা হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে সর্তক করা হয়, তারপরও কেউ একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা চেষ্টা করছি এয়ারপোর্টে সেবার মান নিশ্চিত করতে।
কোন ধরনের অভিযোগ বেশি আসে এমন প্রশ্নের জবাবে শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন বলেন, সাধারণত যাত্রী হয়রানি, ব্যাগেজ হারানো, ব্যাগেজ সময়মত না পাওয়া, নিরাপত্তার নামে হয়রানি, অবৈধভাবে যাত্রীদের টাকা নেওয়ার অভিযোগ বেশি আসে। অনেকে বলেন, এয়ারপোর্টে লোকবল কম, কিন্তু হয়রানি তো কম লোকবলের জন্য হয় না। মূল সমস্যা কর্মী ব্যবস্থাপনায়।
ফেসবুকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের কার্যক্রম প্রসঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিটি বিমানবন্দরের গ্রাহক সেবা ও নিরাপত্তা গুরুত্বর্পূণ। যাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে এয়ারলাইন্সগুলোকেও নানা অপরাধে জরিমানা করা সম্ভব হয়েছে যা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। ফলে অপরাধ প্রবণতা কমে আসছে। একটা সময় প্রতিদিন শতশত লাগেজ হারিয়ে যেত, এখন এগুলো আর নেই। যাত্রীদের অভিযোগও কমে আসছে। এ সবই সম্ভব হয়েছে যাত্রীদের সচেতনতার কারণে। এজন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে যাত্রীদের সচেতন করার চেষ্টা করেছি। যাত্রীদের অধিকার কি সেটা বোঝাতে চেষ্টা করেছি। এখন প্রাপ্য সেবা না পেলে ফেসবুকেও প্রচুর অভিযোগ আসে।
ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে মুহাম্মদ ইউসুফ বলেন, কোনও অপরাধে একজনকে সাজা দিলে অন্যরা সর্তক হয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে যাত্রীরা তাদের অধিকার সর্ম্পকে সচেতন হচ্ছেন। শুরুর দিকে এয়ারপোর্ট ঘুরে দেখতাম, সচারচর যা দেখা যায় তা বোঝার চেষ্টা করতাম। শুরুটা সহজ ছিল না। পরিকল্পনা করেছি কিভাবে শুরু করবো। কাজ করতে গেলে প্রতিবন্ধকতা থাকবে। সেগুলো মাথায় রেখে আমরা প্রথমে দৃশ্যমান সমস্যাগুলো নানাভাগে বিন্যস্ত করে প্রায়োরিটি নির্ধারণ করেছি এবং পরিকল্পনা মাফিক এগিয়েছি। এজন্য বিভিন্ন সংস্থার সাপোর্ট এবং সমন্বয় আমরা কাজে লাগিয়েছি।
আরও পড়ুন: কাশিমপুর কারাগারের সামনে সাবেক রক্ষীকে গুলি করে হত্যা
ফেসবুকে অনলাইন-অ্যাক্টিভিস্ট, সেলিব্রিটি এবং প্রবাসীদের অকৃত্রিম সাপোর্ট আমাদের ‘অদৃশ্য’ সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতে প্রেরণা যুগিয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রতিনিয়ত ফোনে নানারকম হুমকি আসে, গালাগাল করে, তবে তাদের সংখ্যা কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যাত্রীরা নানাবিষয়ে জানতে চান, সমস্যা তুলে ধরেন। যার মাধ্যমে এখন আমরা ‘অদৃশ্য’ সমস্যাগুলো দেখতে পাচ্ছি এবং সেগুলো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। তবে যে পরিস্থিতি আমরা ধাপে ধাপে অতিক্রম করেছি, বর্তমানে আবার সেখানেই নিয়ে যেতে চাইছে একটি পক্ষ। তারা নানাভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। একটা পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষ পুনরায় সংগঠিত হয়ে এ ধরণের অপচেষ্টা করবে, তা আমাদের হিসেবের ভেতরেই ছিল। আমরা আইনের ভেতর থেকে তা মোকাবেলা করার চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং যাব।
/সিএ/এমও/ এমএসএম/








