X
সোমবার, ০৮ আগস্ট ২০২২
২৩ শ্রাবণ ১৪২৯

‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে ময়নাতদন্ত, লাশ হয় টুকরো টুকরো

শাহরিয়ার হাসান
১৪ অক্টোবর ২০২০, ১১:১১আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২০, ১৭:৩৪

‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে ময়নাতদন্ত, লাশ হয় টুকরো টুকরো

মরদেহের শরীরে থাকা কোনও বস্তুকে শনাক্ত করতে ডিজিটাল পোর্টেবল এক্সরে মেশিন ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে দুই মিনিটেই তা শনাক্ত করা যায়। তারপর রুটিন অনুযায়ী কাটা-ছেঁড়ার মাধ্যমে একটা ডেথ বডির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এই মেশিনটির দামও আহামরি কিছু নয়, মাত্র পাঁচ-সাত লাখ টাকা। কিন্তু এই একটি মেশিনের অভাবেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে একটি মরদেহ ২০ থেকে ৩০ টুকরো, ক্ষেত্র বিশেষে ৫০ টুকরো পর্যন্ত করা হচ্ছে। সময় লাগছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে এই সময়ে আসা অন্য লাশগুলো পচন ধরছে পর্যাপ্ত ফ্রিজিং স্পেসের অভাবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এই সাধারণ মেশিনটি নেই। অর্থাৎ গুলিবিদ্ধ হয়ে ও বোমা বিস্ফোরণে মারা যাওয়া ব্যক্তির শেষ পরিণতি এই কাটা-ছেঁড়া। তবে পাশের দেশ ভারত-নেপাল-শ্রীলংকার ফরেনসিক বিভাগ এই মেশিন ছাড়া ময়নাতদন্তের কথা চিন্তাও করতে পারে না বলে জানাচ্ছে ঢামেকের এই বিভাগ।

এত অল্প টাকা হওয়ার পরও কেন এক্সরে মেশিনটি কেনা হচ্ছে না জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'ফরেনসিন বিভাগ নরমালি একটা অবহেলিত বিভাগ। আমি এই এক্সরে মেশিনটির কথা বেশ কয়েকবার মৌখিকভাবে উপস্থাপন করেছি। কিন্তু সেটা এখনও পাইনি।'

ফরেনসিক বিভাগের এই চিকিৎসক আরও বলেন, 'আমি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বিভাগের দায়িত্ব পালন করি। গুলিবিদ্ধ/শরীরে স্প্লিন্টার লেগে মারা গেছে এমন শতাধিক ডেথ বডি পেয়েছি। তাদের শরীর থেকে বুলেট/পিলেট/স্প্লিন্টারের অংশ বের করতে শরীর বা পেশি কেটে টুকরো টুকরো করতে হয়েছে। অনেক সময় পেটে গুলি লেগে মৃত্যুর পর মলদ্বার দিয়ে বের হয়ে গেছে। সেটা খুঁজতে না জেনে পুরো শরীর কেটে ফেলা হয়েছে। কিন্তু পাওয়া যায়নি। এই এক্সরে মেশিন থাকলে ডেথ বডি এত টুকরো করার প্রয়োজন পড়তো না।'

অতিরিক্ত কাটাছেঁড়ার ব্যাপারে সোহেল মাহমুদ বলেন, ময়নাতদন্তের পর এই কাটা বডিগুলো দ্রুত পচতে শুরু করে। চেহারা পুরোই বিকৃত হয়ে যায়। স্বজনরাও লাশ দেখে ভয় পান। নানা রকম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।'

ময়নাতদন্ত কেন

অন্যদিকে ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা বলছেন, কোনও কোনও ডেথ বডিতে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট থাকে। কোথাও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার মধ্যেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সার্বিক ধারণা পাওয়া যায়। কোথাও আবার স্বাভাবিক মৃত্যু তবুও মনে সন্দেহ, এমন প্রত্যেক ঘটনাতেই মৃতদেহ বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর কারণ জানার চেষ্টা করা হয়। মৃত্যুর কারণ জানতেই সাহায্য নিতে হয় পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্তের।

‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে ময়নাতদন্ত, লাশ হয় টুকরো টুকরো

দেশের ময়নাতদন্ত চিত্র

বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজারের ওপর ময়নাতদন্ত হয়ে থাকে। শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেই প্রতিদিন ৯-১০টা ময়নাতদন্তের ঘটনা আসে। এর মধ্যে মাসে একটি/দুটি করে আসে গুলি লেগে বা স্প্লিন্টার লেগে মৃত্যুর ঘটনা। এসব ডেথ বডি নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় তখন। ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স, ডোমরা লাশ কাটা টেবিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিয়েও তার কূল কিনারা করতে পারেন না। এ সময়ে আরও মরদেহ এসে জমা হয়, যেগুলোতে আর তখন হাত দেওয়ার সুযোগ থাকে না।

ঢামেক মর্গের সীমাবদ্ধতা

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢামেকের মর্গে মোট ১৬টা ফ্রিজ আছে। তার মধ্যে চারটা নষ্ট, চারটায় জঙ্গি ও বিদেশিদের রাখা হয়েছে। একটা কাজ করছে না। বাকিগুলোতে ৮-৯টি মরদেহ রাখা হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পাঁচটার মধ্যে ৮-৯টা লাশ ময়নাতদন্ত করা হয়। যেদিন গুলিবিদ্ধ লাশ আসে, সেদিন মেশিনের অভাবে পুরো সময় ওই লাশ কাটতে দেওয়া হয়। যার ফলে অন্য লাশগুলো ফ্রিজে রাখতে হয়। ফ্রিজে জায়গা না হওয়ায় লাশগুলো মেঝেতে ফেলে রাখতে হয়। তখন তাদেরও আলামত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গুলিবিদ্ধ লাশে ময়নাতদন্ত

ঢামেক মর্গের দেওয়া তথ্য বলছে, এবছর অর্থাৎ ২০২০ সালে এখন পর্যন্ত বুলেট শরীরে নিয়ে পাঁচটি মরদেহ মর্গে এসেছে। যার মধ্যে খিলক্ষেতের দুটি, শাহবাগের দুটি, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি। এর মধ্যে খিলক্ষেতের দুটিই অজ্ঞাত মরদেহ ছিল। ময়নাতদন্ত নম্বর ১০৬/২০। দেহটি থেকে ২৫টি পিলেট উদ্ধার করেছেন চিকিৎসক। বুকের পাশ থেকে উদ্ধার হয়েছে একটা বুলেট। যার জন্য লাশকাটা ঘরে বডি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছিল। ৩৪১/২০ ময়নাতদন্ত নম্বর ছিল শাহবাগ থেকে উদ্ধার রাকিবের দেহ। এই দেহ থেকে ১৪টি পিলেট পায় ফরেনসিক বিভাগ। তার শরীরও ৪০/৫০ টুকরো করা হয়েছিল।

ভুল প্রতিবেদন

এদিকে আদর্শ মর্গে ময়নাতদন্ত না হলে অনেক প্রতিবেদনই ভুল আসছে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট মামলাও ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে এমনটা দাবি করছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই। সংস্থাটি বছর শেষে একটি প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা দিচ্ছে পুলিশ সদর দফতরে।

পিবিআইয়ের ওই প্রতিবেদন সূত্র বলছে, হত্যার স্পষ্ট আলামত থাকার পরও আত্মহত্যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। পুরনো জরাজীর্ণ মর্গ। পর্যাপ্ত আলোর অভাব। প্রশিক্ষণহীন ফরেনসিক চিকিৎসক। পুরোপুরি ডোম নির্ভর ময়নাতদন্ত। ময়নাতদন্তকে গুরুত্ব না দেওয়ায় ফরেনসিক প্রতিবেদন ভুল আসছে। যার ফলে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হচ্ছে।

ভালো মর্গের জন্য সুপারিশ

পিবিআইয়ের পক্ষে এসব ময়নাতদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছেন বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'মর্গ আধুনিক না হলে, কমবেশি ভুল থেকেই যাবে। মর্গ ও তার কাটা ছেঁড়ার আধুনিক অস্ত্র হতে হবে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কাজের প্রতি মনোযোগ থাকতে হবে। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডোম হতে হবে।'

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ খান আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'আমরা জানি আমাদের মর্গে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে। তবে সেই তুলনায় আধুনিক করতে পারিনি। আমাদের যা যা লাগবে আমরা ফরেনসিক বিভাগ দিয়ে সেটার তালিকা করে ফেলেছি। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথাও হয়েছে। খুব শিগগিরই আমরা ব্যবস্থা করে ফেলবো।'

/এএইচ/এমএমজে/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কিউবার তেল মজুতে ভয়াবহ আগুন, সহায়তায় মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা
কিউবার তেল মজুতে ভয়াবহ আগুন, সহায়তায় মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা
স্পিনারদের অনন্য কীর্তিতে জিতলো ভারত
স্পিনারদের অনন্য কীর্তিতে জিতলো ভারত
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯২তম জন্মবার্ষিকী আজ
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯২তম জন্মবার্ষিকী আজ
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স কি তাহলে ‘ফ্লুক’?
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স কি তাহলে ‘ফ্লুক’?
এ বিভাগের সর্বশেষ
মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতায় ভোগেন দেশের ৩৯ শতাংশ নারী
মাতৃত্বকালীন বিষণ্নতায় ভোগেন দেশের ৩৯ শতাংশ নারী
উত্তরায় জার্মান নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার
উত্তরায় জার্মান নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার
সড়ক দুর্ঘটনা: ক্ষতিপূরণ ফান্ড গঠনের অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট
সড়ক দুর্ঘটনা: ক্ষতিপূরণ ফান্ড গঠনের অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট
লঞ্চ ভাড়া দ্বিগুণ করার প্রস্তাব, বৈঠক সোমবার
লঞ্চ ভাড়া দ্বিগুণ করার প্রস্তাব, বৈঠক সোমবার
মায়ের হাতে শিশু খুন!
মায়ের হাতে শিশু খুন!