X
সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২
৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

ঢাকামুখী কেন এই জনস্রোত?

শফিকুল ইসলাম
৩১ জুলাই ২০২১, ২১:০৬আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২১, ২৩:৩৫

ঢাকায় যে সমস্ত শ্রমিকরা রয়েছেন তাদের দিয়েই চালু করা হবে গার্মেন্টস কারখানা। কোরবানির ঈদে যারা বাড়ি গেছেন, তারা লকডাউনের কারণে রাজধানীতে আসতে পারছেন না, এই সময়ে তারা কাজেও যোগ দিতে পারবেন না এটাই স্বাভাবিক।

মালিকপক্ষ পর্যায়ক্রমে রাজধানীর বাইরে অবস্থান করা শ্রমিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনবেন- এইসব শর্তে ১ আগস্ট থেকে কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। পরিস্থিতি উল্টো। যদি বিষযটি এত সহজই হয়, তাহলে প্রশ্ন- কারখানা খোলার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর অভিমুখী জনস্রোতে এরা কারা?

জানা গেছে, ঢাকায় অবস্থান করা শ্রমিকদের দিয়ে কারখানা চালানো যে সম্ভব নয়, তা সরকার বুঝুক আর না বুঝুক, মালিকরা তা ভালভাবেই বোঝেন। তাই তো সরকারের ওপরমহলকে নানা যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে যে কোনও শর্তে কারখানা খোলার সিদ্ধান্তটি পাওয়াই ছিল তাদের কাছে মুখ্য। কারখানা মালিকরা সে সিদ্ধান্তটি পেয়েছেন। কিন্তু সরকারকে দেওয়া কোনও শর্তই বাস্তবায়ন করছেন না তারা। পরিস্কার করে অধস্তনদের বলা হয়েছে- যার যার অধীনস্ত শ্রমিকদেরকে নির্দিষ্ট দিনে কাজে হাজির করতে না পারলে চাকরি থাকবে না। সেভাবেই মেসেজ পৌছে গেছে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর থেকে শত শত কিলোমিটার দুরে অবস্থান করা গার্মেন্টস শ্রমিকদের কানে। তাই তো পেটের প্রয়োজনে জীবনকে ঝুঁকিতে রেখে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে কর্মস্থলের দিকে ছুটেছেন গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকরা। যে কোনও মূল্যে রবিবার ১ আগস্ট সকাল ৮টার আগেই কারখানার গেটে পৌঁছাতে চান তারা। ঢাকা অভিমুখী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।   

পটুয়াখালী থেকে ঢাকার দিকে আসা ফিরোজ মিয়ার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয় যাত্রাবাড়ি মোড়ে। ফিরোজ মিয়া জানিয়েছেন, আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেন তিনি। শুক্রবার (৩০ জুলাই) রাতে তার সেকশনের লাইনম্যানের ফোন পেয়ে সকালেই রওনা হয়েছি। ভেঙে ভেঙে পটুয়াখালী থেকে বরিশাল, গৌরনদী, মোস্তফাপুর হয়ে পদ্মা নদীর পাড়ে ফেরিঘাট বাংলাবাজার এলাকায় এসে পৌছেছি। সেখান থেকে ফেরিতে পদ্মা নদী পার হয়ে মাওয়া হয়ে যাত্রবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছেছি। কখন যে আশুলিয়া গিয়ে পৌঁছাবো আল্লাই জানেন বলে জানান ফিরোজ মিয়া।

তিনি জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট সময় কাজে ফিরতে না পারলে চাকরি থাকবে না বলে ফোন করেছেন লাইনম্যান। তাইতো জীবনের মায়া না করে পেটের তাগিদে ঢাকার দিকে ছুটেছি। কারখানার কাছেই বাসা। বাসায় পৌছাতে পারলে আর চিন্তা নাই। তিনি জানান, করোনায় মরে গেলে তো বেঁচে গেলাম। যদি বেঁচে থাকি আর চাকরি না থাকে তাহলে খাবো কি? এই ভেবেই কাজে যোগ দিতে যাচ্ছি। বাকি আল্লাহ ভরসা।

এভাবেই শুধু ফিরোজ মিয়া নন, লাখ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক কাজে যোগ দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন বসের ফোন পেয়ে কর্মস্থলের দিকে ছুটেছেন। তাইতো ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ অভিমুমী মানুষের এত ভিড় বলে জানিয়েছেন ভ্যানচালক রফিক। যাত্রাবাড়ি মোড় থেকে ৬ জন যাত্রী নিয়ে রওনা করেন নারায়ণগঞ্জ-ঢাকার সংযোগস্থল সাইনবোর্ডের দিকে। আবার সেখান থেকে ৬ জন যাত্রী নিয়ে আসেন যাত্রাবাড়ি। রফিক জানিয়েছেন, সকাল ৬টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত যতো যাত্রী বহন করেছি, তারা সবাই গার্মেন্টস কর্মী। ঈদের পর এত গার্মেন্টস শ্রমিক রাস্তায় দেখি নাই। যাত্রীরাই ভ্যানে বসে আলাপ করছিলো- বসের ফোন পেয়ে কাজে যাচ্ছি। ঠিক সময়ে হাজির হতে না পারলে চাকরি থাকবে না আলাপ করছিলেন শ্রমিকরা-এমনটাই জানালেন ভ্যানচালক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পোশাক কারখানা ও রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া নৌপথ ব্যবহার করে হাজারও মানুষ নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছে। একইভাবে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকেও কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ। এদের মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকই বেশি। একই চিত্র দেখা গেছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে। শনিবার সকাল থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা থেকে বিভিন্ন উপায়ে ঘাটের দিকে আসছে মানুষের স্রোত। কঠোর লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় কর্মস্থলে ফেরা এসব যাত্রীর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। গণপরিবহনের অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা।

গাজীপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রবাড়ি মোড়ে অবস্থান করা গার্মেন্টস শ্রমিক হাজেরা বানু এসেছেন বরিশালের গৌরনদী থেকে। ৫ আগস্টের আগে কারখানা খুলবে না জেনে বাড়ি গিয়েছিলাম। কাল রাতে ফোন পেয়ে সকালে রওনা করেছি। ধার দেনা করে ভাড়ার টাকার ব্যবস্থা করেছেন। বেতন পেয়ে এই ধারের টাকা পরিশোধ করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছেন, চাকরি তো আমার। আমার চাকরি আমাকেই রক্ষা করতে হবে। তাই নিজেকেই কর্মস্থলে আসতে হবে। আমাকে আবার কে আনবেন? নিজের ভাড়া নিজে নিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। কেউ আনেননি বলেও জানিয়েছেন হাজেরা বানু। 

অপরদিকে এ বিষয়ে জপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, ‘কারখানা খোলার বিষয়ে আমরা শিল্প মালিকদেরকে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছি, যে সকল কর্মী ঢাকাতে আছে, বিশেষ করে কারখানার আশেপাশে রয়েছেন তাদের দিয়ে কাজ করাবেন। শিল্প মালিকরাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা ঢাকায় থাকা কর্মীদের নিয়ে কাজ শুরু করবেন এবং যারা বাড়িতে গেছেন তাদের আসতে হবে না, তারা চাকরি হারাবেন না। শিল্প মালিকরা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় পর্যায়ক্রমে ওই সকল শ্রমিকদের ঢাকায় নিয়ে আসবেন।

এদিকে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পোশাক কারখানা ও রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া নৌপথ ব্যবহার করে হাজারও মানুষ নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছে। শনিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত বাংলাবাজার ঘাটে আটকা পড়েছে চার শতাধিক গাড়ি। ঘাট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মানুষের ভিড়ে যানবাহন পার করা সম্ভব হচ্ছে না।

শিল্প-কারখানা আগামীকাল থেকে খুলে দেওয়ার হঠাৎ সিদ্ধান্তের পর উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন কর্মজীবী মানুষ। শনিবার সকাল থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল গোল চত্বর ও কড্ডার মোড় এবং পূর্বপ্রান্তে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গাসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ঢাকামুখী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। এদের অধিকাংশই গার্মেন্টস কর্মী। গণপরিবহণ না থাকায় কয়েকগুণ বেশি টাকা খরচ করে কর্মস্থলে ফিরতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের এই মানুষদের।

হঠাৎ করে শিল্প কারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণায় কাজিরহাট ফেরিঘাটেও যাত্রীর চাপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মচারি সাব্বির হোসেন। তিনি জানান, প্রতিটি ফেরিতে সাধারণত এক থেকে দেড় হাজার যাত্রী পার করা হয়। আজ  তিন থেকে চার হাজার মানুষ পার হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মানানো কোনওভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এদের অধিকাংশই গার্মেন্টস কর্মী বলে জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে শনিবার সকাল থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা থেকে বিভিন্ন উপায়ে ঘাটে আসা যাত্রীদের ব্যাপক ভিড়। বৃষ্টি, পুলিশের ভয়ের পাশাপাশি কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে তারা কর্মস্থলে ফিরছেন। বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানিয়েছে, এই ঘাটে ১৬টি ফেরিই প্রস্তুত আছে। উভয় ঘাটে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে মোট আটটি ফেরি চলছে।

 

/এফএএন/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনতে বছরজুড়েই কাজ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনতে বছরজুড়েই কাজ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
কিউইদের বছরের প্রথম হারের স্বাদ দিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ
কিউইদের বছরের প্রথম হারের স্বাদ দিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে স্পিকারের শ্রদ্ধা
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে স্পিকারের শ্রদ্ধা
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপি’র রাজনীতি
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নিয়ে বিএনপি’র রাজনীতি
এ বিভাগের সর্বশেষ
লকডাউনে ৮৭ শতাংশ শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন, ৭ শতাংশ এখনও বেকার: বিলস
লকডাউনে ৮৭ শতাংশ শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন, ৭ শতাংশ এখনও বেকার: বিলস
নিউমার্কেট ও গাউছিয়ায় কেনাকাটার হিড়িক (ফটোস্টোরি)
নিউমার্কেট ও গাউছিয়ায় কেনাকাটার হিড়িক (ফটোস্টোরি)
‘অর্ধেক পরিবহন’ নিয়ে যত প্রশ্ন
‘অর্ধেক পরিবহন’ নিয়ে যত প্রশ্ন
চলছে ধোয়ামোছা, টার্মিনালে সাজ সাজ রব
চলছে ধোয়ামোছা, টার্মিনালে সাজ সাজ রব
যে কারণে আজও রাজধানীতে ফিরছে মানুষ
যে কারণে আজও রাজধানীতে ফিরছে মানুষ