রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার শিরিন ম্যানশনে রবিবার (৫ মার্চ) সকালে যে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, সেটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে হয়েছে, নাকি অন্য কোনও ঘটনা, সংশ্লিষ্ট কেউ সুনির্দিষ্ট করে তা বলতে পারেননি। ফায়ার সার্ভিস বলছে ‘সন্দেহজনক’ বিস্ফোরণ। সঠিক কারণ তারা জানেন না। তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সেনাবাহিনীর বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের মেজর মো. কায়সার বারী জানিয়েছেন, তারা কোনও বিস্ফোরকের আলামত পাননি। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের এডিসি রহমত উল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, এটি ২০২১ সালের মগবাজারের বিস্ফোরণের মতো ঘটনা। ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছেন, প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে এটি একটি দুর্ঘটনা।
সায়েন্সল্যাব এলাকার ঘটনার একদিন আগেই শনিবার (৪ মার্চ) সকালে রাজধানীর নিকেতনের ভাড়া বাসায় এসি বিস্ফোরণে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন গোপাল মল্লিক। গুরুতর অবস্থায় তাকে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে শনিবার মধ্যরাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একই ঘটনায় মো. মিজান (২০) নামে আরও একজন দগ্ধ হন। তাকে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। কয়েক দিন পরপরই বিভিন্ন স্থানে এসি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। এতে অনেকেই জখম হন। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরাও জানান, এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দগ্ধ রোগীদের মধ্যে অনেকেই এসি বিস্ফোরণের শিকার। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার শিরিন ম্যানশনে বিস্ফোরণের কারণ জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যে ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে সেটা সন্দেহজনক মনে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের কাছে। সে কারণে আমরা আগুন নেভানোর পর সরকারের যেসব সংস্থার বোম্ব ডিসপোজাল টিম বা বিস্ফোরক শনাক্তের সক্ষমতা আছে তাদের জানিয়েছি। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারবো না। তবে প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এয়ার কন্ডিশন (এসি) থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিসের যারা আগুন নেভানোর কাজ করেছে তাদের কাছে এই বিস্ফোরণ সন্দেহজনক মনে হয়েছে। যে কারণেই হোক সেটা সংশ্লিষ্টরা তদন্ত করে বের করবেন।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, যেকোনও ইলেক্ট্রনিক্স জিনিসেরই সার্ভিসিং প্রয়োজন হয়। এসি বলেন, ইলেকট্রিক্যাল বোর্ড আছে, পয়েন্ট আছে, এগুলো অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে সার্ভিসিং বা চেক করা প্রয়োজন। নানামুখী সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড চালালেও আমরা সচেতন হই না। আগুন ও বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় শটসার্কিট থেকে। প্রথমে আগুন লাগে। পরে বিস্ফোরণ হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জানিয়েছেন, যে ভবনটির তিনতলায় বিস্ফোরণ হয়েছে, সেখানে নাশকতা বা বিস্ফোরকের কোনও আলামত পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে এটি একটি দুর্ঘটনা বলে মনে হয়েছে।
রবিবার (৫ মার্চ) বিকেলে সায়েন্সল্যাব এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনাস্থলের পরিদর্শন শেষে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) বোম ডিসপোজাল ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ও সিটিটিসির বোম ডিসপোজাল দলের প্রধান রহমত উল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে সায়েন্সল্যাবের বিস্ফোরণের ঘটনাটি ২০২১ সালে ঘটে যাওয়া মগবাজারের বিস্ফোরণের মতো গ্যাস থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণ। ভবনটিতে কোনও না কোনোভাবে গ্যাস জমে ছিল। জমে থাকা গ্যাসের মাত্রা যদি ৫ থেকে ১১ ঘনফুট হয়, এটা যদি ট্রিগার হয়, তাহলে এ ধরনের বিস্ফোরণ হতে পারে। এটি ট্রিগার সুইচ, ফ্যানের সুইচ বা এসির সুইচের মাধ্যমেও হতে পারে। এটা গ্যাস থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণ হতে পারে। আর এত বড় বিস্ফোরণ গ্যাস থেকেই হয়ে থাকে।
এসি বিস্ফোরণ ঠেকাতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদফতরের সহকারী পরিদর্শক সাব্বির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। গ্যাসের পাইপলাইনটি ১০০ পিএসআই (পাউন্ডস পার স্কয়ার ইঞ্চি)-এর নিচে। ফলে এটি আমাদের লাইসেন্সভুক্ত বিষয় নয়। এ কারণে বিস্ফোরক পরিদফতর কোনও কমিটি গঠন করেনি। সংশ্লিষ্ট যারা কমিটি গঠন করেছে তাদের আমাদের বক্তব্য জানিয়ে দেবো। তবে স্থানীয় অনেকেই বলেছেন, এয়ার কন্ডিশন (এসি) বিস্ফোরণ থেকে হতে পারে। এটিও আমাদের আওতাভুক্ত নয়।
রেফ্রিজারেশন সার্ভিসিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারও বাসা বা অফিস কক্ষে লাগবে দুই টনের এসি, সেখানে লাগানো হয়েছে এক বা দেড় টনের এসি। সেক্ষেত্রে কক্ষ ঠান্ডা করার জন্য সেই এসি দীর্ঘ সময় চালাতে হয়। এতে এসির ওপর চাপ পড়ে। সঙ্গে দুর্ঘটনার শঙ্কাও বেড়ে যায়। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ এসির কমপ্রেসার মেরামত করে বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় বিক্রি করা হয়। যেগুলো খুবই বিপদজনক। সেগুলোও সংশ্লিষ্টদের তদারকির আওতায় আনা জরুরি।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র মেরামত করেন মোশাররফ হোসেন। রাজধানীর কলাবাগানে তার ন্যাশনাল রেফ্রিজারেশন নামে একটি সার্ভিসিং সেন্টার রয়েছে। এসি বিস্ফোরণের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসি কখনও বিস্ফোরণ হয় না। যখন এসির কানেকশনগুলোতে ময়লা জমে যাওয়ার কারণে বৈদ্যুতিক সংযোগের কোনও স্থানে শটসার্কিট হয়, তখন এসির গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এতেই পুরো জিনিসটা বিস্ফোরিত হয়। যে কারণে মাঝে মধ্যেই এগুলো চেক করা, পরিষ্কার কিংবা সার্ভিসিং করা প্রয়োজন। তাহলে দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
এর আগে রবিবার (৫ মার্চ) সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে শিরিন ম্যানশনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সেখানে আগুন ধরে যায় এবং ভবনটির কিছু অংশ ধসে পড়ে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও ১৪ জন আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। ভবনটির তিনতলায় ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অফিস থেকে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।









