ট্রান্সজেন্ডার ডে অব ভিজিবিলিটি

খসড়াতেই আটকে আছে ট্রান্সজেন্ডার আইন

সুবর্ণ আসসাইফ
৩১ মার্চ ২০২৩, ০৯:০০আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৩, ১৭:২৭

দেশে ট্রান্সজেন্ডার মানুষের জন্য সুরক্ষা আইনের দাবি উঠে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মানবাধিকার কমিশন ও সমাজসেবা অধিদফতর থেকে থেকে ট্রান্সজেন্ডার ও তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষায় আলাদা আইন প্রণয়নে খসড়া তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় গত বছর। কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে টেবিলেই সীমাবদ্ধ রয়েছে খসড়াটি।

এ ছাড়া মানবাধিকার কমিশন থেকে ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাব জানানো হলেও সমাজসেবা অধিদফতর থেকে হিজড়া অধিকার আইন প্রণয়নে খসড়া তৈরিতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফলে এটা হিজড়া অধিকার আইন নাকি ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

দেশের ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, বৈষম্যমূলক আইন, নীতি ও অনুশীলনের কারণে ট্রান্সজেন্ডার ও তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের মানুষসহ যৌন-বৈচিত্র্যমুখী ব্যক্তিরা এখনও তাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে আলাদা আইন হলে পারিবারিক, সামাজিক, কর্মস্থলে তাদের অবস্থান তৈরি হবে বলে মনে করেছেন তারা।

ট্রান্সজেন্ডার ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে নিয়ে কাজ করা সংগঠন বন্ধু ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কাউন্সিলর ফারাহ ফারিন বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব। সবাইকে সমান সুযোগ-সুবিধা না দিলে বৈষম্য হয়ে যাবে। দেশে আইন যেহেতু বড় একটা মাধ্যম, তাই আইনটা থাকলে অধিকার নিয়ে কথা বলাটা সহজ হয়। কিন্তু আইন না থাকলে কোনও অভিযোগ দিলে তখন আইন নেই বলে একটি বাধা তৈরি করা হয়। এতে সেবা-সুরক্ষা থেকে ট্রান্সজেন্ডার বঞ্চিত হন।

ফারাহ আরও বলেন, ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য এখনও সামাজিক বাধাটা সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্র এখন অনেক সুযোগ দিচ্ছে। পরিবারও আস্তে আস্তে মেনে নিতে শিখছে। কিন্তু সামাজিক বাধাটা থেকেই যাচ্ছে। এ কারণে আইনের বাস্তবায়নটা জরুরি। এটা নিয়ে কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থী অঙ্কিতা ইসলাম বলেন, হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। মৌলিক অধিকারের জায়গায় তারা পিছিয়ে থাকে। অথচ চাকরি বা কাজের জন্য তাদেরও সমানতালে পাল্লা দিতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আনতে বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু কোনও আইন না থাকলে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেলে আমরা তো পিছিয়েই থাকবো। পাকিস্তানের মতো দেশেও ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য আলাদা বোর্ড আছে, যারা ট্রান্সজেন্ডারদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ করে। আমাদের দেশে এমন কিছুই নেই। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে আছে।

অঙ্কিতা আরও বলেন, যদি ট্রান্সজেন্ডার মানুষকে দেশের মূলধারার সঙ্গে আনতে হয়, তাহলে আইন করে তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তো আর সমাজের মূলধারার অংশ হতে পারবে না। পরিবার নিশ্চিত হলে শিক্ষা, বাসস্থানসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বশেষ চলতি বছর ১৯ মার্চ সমাজসেবা অধিদফতর থেকে হিজড়া অধিকার আইন প্রণয়নে একটি কমিটি গঠন করে পরিপত্র জারি করা হয়। তবে পরিপত্রে কোথাও ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি।

পরিপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশের অনগ্রসর হিজড়া জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্যে হিজড়া ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষা আইনের খসড়া প্রণয়নের জন্য সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি, আইনের খসড়া প্রণয়নে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ-সংক্রান্ত ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়।

মানবাধিকার কমিশন সংশ্লিষ্টরা ও ট্রান্সজেন্ডার অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইন হলে, তার মধ্যে ট্রান্সম্যান, ট্রান্সউইমেন, হিজড়া, ইন্টারসেক্সুয়াল সব জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে হিজড়া অধিকার আইন প্রণয়ন করা হলে ট্রান্সজেন্ডারদের পরিচয়-সংকট তৈরি হবে বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে ফারাহ ফারিন বলেন, হিজড়াদের নিজেদের সংস্কৃতি আছে। পরিচয়টাও ভিন্ন। কিন্তু ট্রান্সজেন্ডারদের শারীরিক পরিবর্তন ও চিকিৎসার বিষয় থাকে, যেটা সম্পর্কে হিজড়া জনগোষ্ঠী অবগত নয়। আমরা ট্রান্সজেন্ডাররা ছেলে থেকে মেয়ে বা মেয়ে থেকে ছেলেতে রূপান্তর হয়ে থাকি, কিন্তু হিজড়া সংস্কৃতিতে তারা ছেলেও না মেয়েও না। তাই ট্রান্সজেন্ডার আইনটা জরুরি।

‘সম্পর্কের নয়া সেতু’ সভাপতি জয়া শিকদার বলেন, দেশে ট্রান্সজেন্ডার দিবস বাস্তবায়নের জন্য এডিবি অর্থায়ন করতে আগ্রহী। মানবাধিকার কমিশন একটা ট্রান্সজেন্ডার আইনের খসড়া তৈরি করেছে, যেটা পরে সমাজকল্যাণ অধিদফতরের কাছে হস্তান্তর করে। সমাজকল্যাণ অধিদফতর চাইছে, ২০১৩ সালে যেহেতু হিজড়াদের নিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন করে সরকারের, তাই হিজড়া অধিকার আইনের মধ্যে ট্রান্সজেন্ডারদের অন্তর্ভুক্ত করার।

জয়া বলেন, বর্তমান সময়ে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির সুরক্ষা আইন বাস্তবায়িত হলে ট্রান্সম্যান, ট্রান্সউইমেন ও হিজড়া এই আইনের আওতায় আসবে। হিজড়া হলো আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের একটা সংস্কৃতি। তবে এটা যারা ধারণ করে, শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থানে তারা পিছিয়ে। তাই সার্বিক ও সামগ্রিক স্বীকৃতির জন্য হিজড়া নয়, ট্রান্সজেন্ডার আইন প্রয়োজন। আইনটি নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ট্রান্সজেন্ডার একজন মানুষ চাইলেই তার নাম পরিবর্তন করতে পারছে না। আমার এনআইডি পরিবর্তন করতে গেলে পুরো সনদ পরিবর্তন করতে হবে। আমি আমার শরীর পরিবর্তন করলাম কিন্তু নাম পরিবর্তন করতে পারলাম না, এটা অনেক বড় বাধা। ট্রান্সম্যান অনেক ভাই তাদের সনদ ছেড়ে দিয়েছেন, ছেলেতে রূপান্তর হওয়ার পর তার মুখে দাড়ি গজিয়েছে কিন্তু নাম ‘সাবনূর’, তাহলে তার জন্য কতটা কঠিন হচ্ছে। আমারও তো জন্মসনদ, মৃত্যুসনদ, শিক্ষা সনদ পাওয়ার অধিকার আছে নিজের নামে।

মানবাধিকার কমিশনের উপপরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন, ট্রান্সজেডর অধিকার নিয়ে মানবাধিকার কমিশনের একটা কমিটি আছে। কমিটি ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়ে খসড়া তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। আইনটি পাসের দায়িত্ব সরকারের, কমিশন শুধু সুপারিশ করতে পারে। পরে সমাজসেবা অধিদফতর খসড়া তৈরির আগ্রহ দেখায়। আমরা যে খসড়া তৈরি করেছিলাম, সেটা সম্পূর্ণ নয় কারণ ট্রান্সজেন্ডার বিষয়টা অনেক জটিল। এখানে ট্রান্সজেন্ডার ছাড়াও হিজড়া, ইন্টারসেক্সুয়ালসহ কয়েকটি বিষয় চলে আসে। তাই খসড়ায় অনেক কিছুই বাদ ছিল। অল্প দিনে এই খসড়া তৈরি করা সম্ভব নয়। যেহেতু সমাজসেবা অধিদফতর এটার নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে নিয়মিত সভা হলে এই খসড়া দ্রুত হয়ে যেতো।

তিনি আরও বলেন, হিজড়া একটা সংস্কৃতি, কোনও লিঙ্গ নয়, তারা না ছেলে না মেয়ে, কিন্তু ট্রান্সজেন্ডার একটা লিঙ্গ। আমরা যদি হিজড়া অধিকার আইন করি, তাহলে সবাই এর মধ্যে আসবে না। কিন্তু ট্রান্সজেন্ডার অধিকার আইন করা হলে ট্রান্সম্যান, ট্রান্সউইমেন, হিজড়া, ইন্টারসেক্সুয়াল সবাই আসবে। তাই ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইনের প্রস্তব দিয়েছি। খসড়া প্রস্তুতে কালক্ষেপণ হচ্ছে বলা যায়, কারণ আইন হওয়া অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয়।

জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক ও হিজড়া অধিকার আইন প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক ড. মো. মোকতার হোসেন বলেন, আমরা খসড়া নিয়ে কাজ করছি। দ্রুতই খসড়া তৈরি হবে বলে আশা করছি। এটা এমন একটা বিষয়, এখানে হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডারসহ কয়েকটি গোষ্ঠীর বিষয় আছে। তাই গুছিয়ে আনতে সময় লাগছে।

মানবাধিকার কমিশনের ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইন প্রস্তবের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, আমরা ট্রান্সজেন্ডার গোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলেছি। সবার সঙ্গে কথা বলে একটি পরিপূর্ণ খসড়া করতে চাচ্ছি। এখনও যেহেতু এটা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সবার মতামত নিয়ে একটি চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করা হবে।

/এনএআর/
সম্পর্কিত
আজ বাবা দিবস
আজ প্রাণভরে গোসল করার দিন 
‘পুশইন’ থামেনি, বন্ধ হয়নি সীমান্ত হত্যা
সর্বশেষ খবর
‘আমি আরিশাকে পানিতে চুবিয়ে মেরেছি, আমাকে হাজতে ভরেন’
‘আমি আরিশাকে পানিতে চুবিয়ে মেরেছি, আমাকে হাজতে ভরেন’
জার্মানির বিপক্ষে এক গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে আইভরি কোস্ট
জার্মানির বিপক্ষে এক গোলে এগিয়ে থেকে বিরতিতে আইভরি কোস্ট
শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মসজিদের ইমাম গ্রেফতার 
শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মসজিদের ইমাম গ্রেফতার 
জার্মানির বিপক্ষে ইতিহাসের দ্বারে আইভরি কোস্ট, নকআউট নিশ্চিত করার সুযোগ
জার্মানির বিপক্ষে ইতিহাসের দ্বারে আইভরি কোস্ট, নকআউট নিশ্চিত করার সুযোগ
সর্বাধিক পঠিত
হঠাৎ ইসলামী ব্যাংকের সতর্কবার্তা জারি
হঠাৎ ইসলামী ব্যাংকের সতর্কবার্তা জারি
৫০১ নম্বর কক্ষকে ‘বিজয়ের প্রতীক’ ঘোষণা মামুনুল হকের
৫০১ নম্বর কক্ষকে ‘বিজয়ের প্রতীক’ ঘোষণা মামুনুল হকের
হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিং যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
হাই স্পিড ট্রেনে বেইজিং যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী কবে ভারত সফরে যাবেন, জানালেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
প্রধানমন্ত্রী কবে ভারত সফরে যাবেন, জানালেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গী কতজন
বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গী কতজন