বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুজব ও মিসইনফরমেশন একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনও এসব গুজব ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের চরিত্রহনন করা হয়েছে, আবার কখনও গুজবকে ব্যবহার করে সহিংসতা উসকে দেওয়া হয়েছে। এখন ডিজিটাল লাইভ দেখে মানুষ অনেক কিছু বিশ্বাস করে, অথচ তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ নেই। এসব গুজব প্রতিরোধে একটি সুসংহত ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
‘জুলাই অভ্যুত্থান ও গুজবের রাজনীতি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় কথাগুলো বলেন বক্তারা।
শনিবার রাজধানীর বনানীর ওমনি রেসিডেন্স হোটেলে এ অনুষ্ঠান হয়। গবেষণা ও নীতিগত পরামর্শ প্রদানকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিস (BCSA) এ আয়োজনের উদ্যোক্তা।
আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং সেই প্রেক্ষিতে দেশে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অপপ্রচারের বিষয়টি পর্যালোচনা করা।
এই গোলটেবিল আলোচনায় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, ফ্যাক্টচেকার, সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষাবিদ ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য কীভাবে রাজনৈতিক যোগাযোগ, জনমত ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে— সে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
আলোচনার শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক সিনিয়র হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন স্পেশালিস্ট ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুজব ও মিসইনফরমেশন একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ের পর আমরা দেখেছি কীভাবে ভুয়া অডিও-ভিডিও ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক পরিবেশকে কলুষিত করা হয়েছে। কখনও এসব গুজব ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের চরিত্রহনন করা হয়েছে, আবার কখনো গুজবকে ব্যবহার করে সহিংসতা উসকে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সব পক্ষকে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনামূলক পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। কেউ যদি গুজব ছড়ায়, তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে; আর কেউ যদি গুজবের শিকার হয়, তার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।”
ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম তার বক্তব্যে বলেন, “গুজব প্রতিরোধে আমাদের একটি সুসংহত ও কার্যকর আইনগত কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। ফেসবুকসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে, কারণ তারা বর্তমানে দেশের কোনও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় নয় এবং জনগণের প্রতিও তাদের জবাবদিহি নেই। এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে অবশ্যই আমাদের আইন ও নীতিমালার আওতায় আনতে হবে, যাতে গুজব বা ভুয়া তথ্য ছড়ালে তারা তা মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে বাধ্য হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।”
ইন্টারনিউজের বাংলাদেশ প্রতিনিধি শামীম আরা শিউলী বলেন, “গত দুই বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবগুলোর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হয়েছেন নারী রাজনীতিকরা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব গুজবের খুব কমই ডিবাঙ্ক বা খণ্ডন করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি গণমাধ্যমে একটি শক্তিশালী ফ্যাক্টচেকিং টিম থাকা জরুরি। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত একটি নির্দিষ্ট ইউনিট গঠন করা, যারা গুজব ও মিথ্যা তথ্য মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করবে।”
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ বলেন, “ভারতের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের মিডিয়াগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে প্রপাগান্ডা প্রচার করছে। এটি কোনও সাধারণ ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। গুজবকে আমি অসম যুদ্ধ বলি।”
তিনি বলেন, “ডিসইনফরমেশন এবং মিসইনফরমেশনের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটি পুরোপুরি অসম। যারা ভুয়া সংবাদ তৈরি করে তাদের কোনও যোগ্যতা লাগে না, অথচ ফ্যাক্টচেক করতে গেলে আমাদের বিশেষজ্ঞ হতে হয়।”
আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা চাই একটি নতুন পলিটিক্যাল কালচার— যেখানে গুড আইডিয়া, গুড রিফর্ম এবং গুড প্র্যাকটিস থাকবে।”
তিনি বলেন, “নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ডিসইনফরমেশন বা রিউমার এমনভাবে ছড়ানো হয়, যেগুলো মোকাবিলা করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।”
তিনি আরও বলেন, “এখন ডিজিটাল লাইভ দেখে মানুষ অনেক কিছু বিশ্বাস করে, অথচ তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ নেই। মিডিয়া লিটারেসি ছাড়া আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই কঠিন হবে।”
আলোচনায় বক্তারা উল্লেখ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে গুজব ও ভুয়া তথ্যের বিস্তার রাজনৈতিক সৌহার্দ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা বলেন, এসব গুজব রাজনৈতিক বার্তা বিকৃত করছে এবং জনমতকে প্রভাবিত করছে।
বক্তারা গুজব প্রতিরোধে গবেষণা, তথ্য যাচাই ব্যবস্থা, মিডিয়া লিটারেসি এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক বার্তার উপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়াও রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তথ্য যাচাই ও জবাবদিহির পরিবেশ গড়ে তোলার তাগিদ দেন।
বিসিএসএ-এর উপপরিচালক শাহাদাত স্বাধীন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এবং আলোচনার মডারেটরের দায়িত্বে ছিলেন আসিফ বিন আলী, পিএইচডি ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি।
আলোচনায় অংশ নেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম, ড. ফয়জুল হাকিম লালা, অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল, মাহবুব মোরশেদ (ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক, বাসস), রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কাইসার, ড. মো. সেলিম হোসেন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), সাদিক মাহমুদ (ব্রেইন), প্রফেসর সালমা বেগম (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), সমাজকর্মী নাদিয়া নিভিন, ইন্টারনিউজের বাংলাদেশ প্রতিনিধি শামীম আরা শিউলি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগি অধ্যাপক বুলবুল আশরাফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক তানভীর হাবিব জুয়েল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অ্যধাপক জালাল জালালউদ্দিনসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।








