ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতনে পশ্চিমা নারীবাদীদের নীরবতায় ক্ষোভ

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট  
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৩৫ আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৩৫

আইডিএফ (ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস) ও আইপিএস (ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস) সদস্যদের, এবং ইসরায়েলের বিভিন্ন আটকাগারের নিরাপত্তাকর্মীদের দ্বারা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ধর্ষণ, যৌন অত্যাচার ও নিপীড়নের বিষয়ে মূলধারার পশ্চিমা নারীবাদীদের মৌনতা ও পরোক্ষ সমর্থনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলনের অংশীজনরা।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে তারা এই নিন্দা জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, আইন প্রবক্তা ও সাংবাদিকদের প্রতিবেদন থেকে সুস্পষ্ট যে ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের নিয়মিতভাবে যৌন অত্যাচার ও নিপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়। তাদের বারবার অপদস্থ করা হয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন আচরণ করা হয় যেন তারা নিজেদের মানুষ এবং মানবিক আচরণের অযোগ্য।

এতে আরও বলা হয়, জাতিসংঘ-নিযুক্ত তদন্ত কমিশন ছাড়াও ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বেটসেলেম, দ্য প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর হিউমান রাইটস এবং ফিজিশিয়ান্স ফর হিউমান রাইটস-এর প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে অকাট্য প্রমাণ মিলেছে যে ফিলিস্তিনি বন্দিদের খাঁচার মতো বেষ্টনীতে আবদ্ধ করে রাখা, পোশাক খুলে উলঙ্গ থাকতে বাধ্য করা, যৌনভাবে অপদস্থ করার ভিডিও ধারণ, বিছানায় বেঁধে রাখা, খাবার, পানি, ঘুম ও চিকিৎসা না দেওয়া, ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন আক্রমণ, যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, সিগারেট দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া, কুকুর দিয়ে আক্রমণ করা, ওয়াটারবোর্ডিং, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা এবং বন্দিদের কান দিয়ে রক্ত না ঝরা পর্যন্ত জোরে বাজনা বাজানোর মতো নির্যাতনের শিকার করা হয়। প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনিদের মাতৃসদনের ওপর আক্রমণ, প্রজনন ও ঋতুস্রাবসংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা দিতে অস্বীকৃতি এবং অনাহারজনিত গর্ভপাতের কথাও উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর হিউমান রাইটসকে দেওয়া সাক্ষ্যে ভুক্তভোগীরা বলেন, ইসরায়েলি সেনারা সংঘবদ্ধভাবে তাদের ধর্ষণ করে, উলঙ্গ থাকতে বাধ্য করে, জোর করে ভিডিও তোলে এবং নিজেরা ছাড়া বস্তু ও কুকুর দিয়েও বন্দিদের ধর্ষণ করে।

উত্তর গাজার একটি ইসরায়েলি চেকপয়েন্ট অতিক্রম করার সময় এক ৪২ বছর বয়সী মাকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তাকে ভয়াবহ যৌন অত্যাচার ও সহিংসতার শিকার হতে হয়। তিনি একাধিক ইসরায়েলি সেনার দ্বারা চারবার ধর্ষণের শিকার হন, তাকে বারবার মারধর, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, উলঙ্গ করা ও অপমান করা হয় এবং এসবের ভিডিও ধারণ করা হয়। একটি ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, “আমাকে ধর্ষণ করার পর সেই ঘরে একা ফেলে রাখা হয় বিছানার সঙ্গে হাতকড়া দিয়ে বাঁধা অবস্থায়, বহু ঘণ্টা ধরে আমি বিবস্ত্র ছিলাম।”

একজন ৩৫ বছর বয়সী বাবা, যাকে গাজার আল-শিফা হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করা হয়, তিনি চরম নির্যাতনের সাক্ষ্য দেন। ইসরায়েলের স্টে টেইমান টর্চার ক্যাম্পে তাকে প্রশিক্ষিত কুকুর দ্বারা ধর্ষণ করা হয়। আরেকজন ১৮ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি তরুণ, যাকে তথাকথিত ‘গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন’-এর সাহায্যকেন্দ্র থেকে গ্রেফতার করা হয়, তিনি বোতল দিয়ে ধর্ষিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি বলেন, “তারা আমাদের আত্মমর্যাদাবোধ গুড়িয়ে দেয়, আমাদের উদ্যম ও জীবনের আশা-প্রত্যাশা বিনাশ করে।”

বিবৃতিতে বলা হয়, আইডিএফ ও নিরাপত্তা বাহিনীর যৌন অত্যাচার যেমন বীভৎস, তেমনি ভয়াবহ হচ্ছে এই অপরাধের প্রতি ইসরায়েলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বৃহত্তর সমাজের সমর্থন। স্টে টেইমান সামরিক বেসসহ আটকাগারের ফাঁস হওয়া নজরদারি ভিডিও ঘিরে সৃষ্ট কেলেঙ্কারি এর প্রমাণ। ভিডিও ফাঁসের জেরে ২০২৪-২০২৫ সালে ইসরায়েলে রাজনৈতিক ও আইনি সংকট তৈরি হয় এবং সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

ভিডিওতে দেখা যায়, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা এক বন্দিকে এক কোণায় নিয়ে সেনারা ঢাল দিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে আড়াল করে তার ওপর ধর্ষণ ও যৌন অত্যাচার চালায়। এতে তার অন্ত্র ফেটে যায়, মলদ্বার ও ফুসফুসে গুরুতর আঘাত লাগে এবং পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়।

বিবৃতিতে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন গাভিরের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেনাবাহিনীর “যে কোনও কর্ম—এমনকি সংঘবদ্ধ ধর্ষণও—অনুমোদনযোগ্য।”

এ ছাড়া গ্রেফতার হওয়া ১০ সেনা সদস্যের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনকারীদের “ফিলিস্তিনি বন্দিদের ধর্ষণ করার অধিকার” সমর্থনে স্লোগান দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, এসব তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মূলধারার বহু পশ্চিমা নারীবাদী সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব নীরব। অথচ ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর ইসরায়েলি নারীদের গণধর্ষণের দাবিতে তারা প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন, যার সত্যতা পরে পাওয়া যায়নি।

নারী আন্দোলনের অংশীজনরা বলেন, যে নারীবাদ অন্যত্র লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে কিন্তু ইসরায়েলের সংগঠিত অপরাধকে অপরাধ মনে করে না, তা নারীবাদ নয়—বরং যুদ্ধাপরাধে মদদ দেওয়ার শামিল।

তারা ইসরায়েলি যৌন অত্যাচার ও রাষ্ট্র-সহিংসতার কঠোর নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর সংঘটিত প্রতিটি নির্যাতন, ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিচার দাবি করেন।

/এসএনস/এম/
সম্পর্কিত
পশ্চিম তীরে গাজার মতো ‘যুদ্ধের’ আহ্বান ইসরায়েলি মন্ত্রীর
যুদ্ধাপরাধীদের জায়গা জাতিসংঘের মঞ্চ নয়, আদালত কক্ষ: এরদোয়ান
ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করলেন আয়ারল্যান্ডের গোলরক্ষক
সর্বশেষ খবর
সৌদি আরবকে সহযোগিতা করতে তুরস্কের পিছুটান কোথায়?
সৌদি আরবকে সহযোগিতা করতে তুরস্কের পিছুটান কোথায়?
ডিমের দাম নিয়ে কড়া বার্তা বাণিজ্যমন্ত্রীর, ব্যবসায়ীদের যা বললেন
ডিমের দাম নিয়ে কড়া বার্তা বাণিজ্যমন্ত্রীর, ব্যবসায়ীদের যা বললেন
তুচ্ছ ঘটনায় বারবার তিন কলেজের সংঘর্ষ, আতঙ্কে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-ব্যবসায়ী
তুচ্ছ ঘটনায় বারবার তিন কলেজের সংঘর্ষ, আতঙ্কে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-ব্যবসায়ী
১৫ হাজার রানে শচীনকে ছাড়িয়ে ওয়ানডের নতুন রেকর্ড কোহলির
১৫ হাজার রানে শচীনকে ছাড়িয়ে ওয়ানডের নতুন রেকর্ড কোহলির
সর্বাধিক পঠিত
কোটি মানুষের শিল্পনগরী, নেই কোনও বিনোদনকেন্দ্র
কোটি মানুষের শিল্পনগরী, নেই কোনও বিনোদনকেন্দ্র
ঢাকার কাছেই ৫ রিসোর্ট: কোথায় কী সুবিধা, খরচ কত 
ঢাকার কাছেই ৫ রিসোর্ট: কোথায় কী সুবিধা, খরচ কত 
সরকারকে সতর্ক করে আসিফ নজরুল বললেন, ‘এগুলো স্পষ্ট ওয়েক-আপ কল’
সরকারকে সতর্ক করে আসিফ নজরুল বললেন, ‘এগুলো স্পষ্ট ওয়েক-আপ কল’
চীন-ভারতকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রই হবে বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস?
চীন-ভারতকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রই হবে বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস?
দেশের সব বিভাগের আইনজীবীদের জন্য নতুন সিদ্ধান্ত
দেশের সব বিভাগের আইনজীবীদের জন্য নতুন সিদ্ধান্ত