পেঁয়াজের বাম্পার ফলন, তবুও লোকসানে চাষিরা

শফিকুল ইসলাম  
১০ মার্চ ২০২৬, ১৯:৩৭ আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৬, ২০:১৪

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি, তাই এবছর দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম অনেকটাই কম। এতে ভোক্তারা লাভবান হলেও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন পেঁয়াজ চাষিরা। 

পাবনা ও ফরিদপুরের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বীজ, সার ও শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু খরচের তুলনায় বর্তমান বাজারমূল্য অনেক কম। অন্যদিকে আধুনিক হিমাগারের অভাবে কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ওপর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও রয়েছে। তাদের কারণে অনেক সময় কৃষকরা সঠিক দাম পান না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুর ও পাবনার মতো প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে এ বছর। প্রতিমণ পেঁয়াজ উৎপাদনে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে চাষীদের। তবে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। উৎপাদন খরচ না ওঠায় এবং ঋণের চাপে অনেক কৃষক এখন দিশেহারা। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা কৃষকদের সরাসরি বিক্রি না করে কিছুদিন সংরক্ষণ করে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন ১০ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩২ লাখ ২১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। তবে কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩৭ দশমিক ৯ লাখ টন, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ব্যাপক উৎপাদন সত্ত্বেও সংরক্ষণের অভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন। যেহেতু পেঁয়াজ পচনশীল, তাই উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ পচে যায়। সেখানেই ঘাটতি তৈরি হয়। এই ঘাটতি মেটাতে বছরে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন থেকে ৫ লাখ ৭৮ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও জয়পুরহাটে পেঁয়াজের চাষ হলেও প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চল পাবনা, রাজবাড়ী ও ফরিদপুর।

এ বছর উত্তরাঞ্চলের বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও জয়পুরহাট অঞ্চলে প্রায় ৫৯ হাজার ৪৩৯ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু পাবনায় চাষ হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় এবার ১৬ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে মুড়িকাটা পেঁয়াজ।

অপরদিকে ফরিদপুর জেলায় ২০২৫-২৬ মৌসুমে ব্যাপক হারে পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ বীজের চাষ হয়েছে। ফরিদপুরের শুধু সালথা উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এছাড়া ফরিদপুর জেলায় রেকর্ড ১ হাজার ৮৫৪ হেক্টর জমিতে শুধুমাত্র পেঁয়াজ বীজের চাষ করা হয়েছে, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য জেলায় পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফরিদপুর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল, যেখানে মাটি পেঁয়াজ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

পেঁয়াজ চাষিরা জানিয়েছেন, মুড়িকাটা পদ্ধতিতে বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে পেঁয়াজ আবাদ করা হয়। এই পেঁয়াজ ডিসেম্বরের শেষ থেকে মার্চের মধ্যে ঘরে তোলা হয়। অপরদিকে হালি পদ্ধতিতে চাষ করা পেঁয়াজ ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আবাদ করে মার্চ-এপ্রিলে তোলা হয়। বর্তমানে বাজারে যে পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে তার পুরোটাই মুড়িকাটা পেঁয়াজ, যা বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। মাঠ থেকে তুলে এনে ২-৪ দিনের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে তা পচে যায়। ফলে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়েন।

ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষি মোবারক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বছর পেঁয়াজ বিক্রি করে খরচ উঠছে না। অনেক লোকসান হবে। ফলন ভালো হয়েছে, তবে দাম নেই। চাহিদা নেই। তাই মাঠ থেকে যে পেঁয়াজ তুলেছি তা বিক্রি করতে পারছি না। এতে ফসল পচে যাচ্ছে।’

পাবনার পেঁয়াজ চাষি মো. শাহীন মিয়া বলেন, ‘এ বছর ব্যাপক পরিমাণে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ভেবেছিলাম রোজার সময় চাহিদা বাড়বে, তখন হয়তো ভালো দাম পাবো। কিন্তু এ বছর সে আশাও পূরণ হয়নি। আমরা নিশ্চিত লোকসানে পড়ে গেছি। কীভাবে এই লোকসান কাটাবো তা বুঝতে পারছি না।’

শ্যামবাজারের পেঁয়াজের পাইকারি ব্যবসায়ী ফিরোজ মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাপক সরবরাহের কারণে দাম কম। বেশি করে সংরক্ষণে রাখতে পারি না, কারণ দুদিন রাখলেই মুড়িকাটা পেঁয়াজে পচন ধরে। যে কারণে দাম কম।’

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোকতাদির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লোকসানের সম্ভাবনা নেই। ঈদের পরপরই চাহিদা বাড়বে, তখন দামও বাড়বে। আশা করছি কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’ 

/এম/
সম্পর্কিত
দোকানে দোকানে সার, কৃষক বলছে ‘পাচ্ছি না’
সূর্যের আলোয় সেচ, কমছে কৃষকের খরচ বাড়ছে আয়
আমরা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ, এভাবে দাম বাড়লে কীভাবে বাঁচবো
সর্বশেষ খবর
পরাজিত শক্তির কালো টাকা দিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে: রিজভী
পরাজিত শক্তির কালো টাকা দিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে: রিজভী
যে কারণে এআইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নিষেধ করলেন মাক্রোসফটের সিইও
যে কারণে এআইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নিষেধ করলেন মাক্রোসফটের সিইও
বিরোধী দলকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের
বিরোধী দলকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের
আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে আলোচনার চেষ্টা চলছে: প্রতিমন্ত্রী
আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে আলোচনার চেষ্টা চলছে: প্রতিমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
লাখ টাকায় আইফোন কিনে বাড়িতে নেওয়ার পরই গেলো পুলিশ
লাখ টাকায় আইফোন কিনে বাড়িতে নেওয়ার পরই গেলো পুলিশ
আগুন কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে নিশ্চিত নয়: ফায়ার সার্ভিস
আগুন কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে নিশ্চিত নয়: ফায়ার সার্ভিস
ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠান ‘কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’: হাইকোর্ট
ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠান ‘কর ফাঁকি দেওয়ার একটি ধ্রুপদি উদাহরণ’: হাইকোর্ট
আরও ১৮ ফ্লাইট বাতিল, শাহজালাল বিমানবন্দরে আটকা ৪৮৫১ যাত্রী
আরও ১৮ ফ্লাইট বাতিল, শাহজালাল বিমানবন্দরে আটকা ৪৮৫১ যাত্রী
ইন্ডিয়া জোটের পদযাত্রায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী, অনড় রাহুল গান্ধী
ইন্ডিয়া জোটের পদযাত্রায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী, অনড় রাহুল গান্ধী