১১৩৬: সংখ‍্যা নয়, একেকটি জীবন

উদিসা ইসলাম
২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:১৪

‘‘আমি এই পৃথিবীতে আজ ১৩ বছর বেঁচে আছি। নিশ্বাস নিই খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য কিছু না কিছু করতে হয়। কিন্তু সম্মানের জীবন আর হলো না। ভবনের নিচে চাপা পড়ে বেঁচে গেছিলাম ঠিকই, কিন্তু প্রতিদিন ভাবি মরে গেলে মনে হয় বেঁচে যেতাম। এই ভাঙাচোরা ব্যথাময় শরীর নিয়ে, কাজের অনুপোযোগী হয়ে বেঁচে থাকাটা যেন আজীবনের শাস্তি।’’ কথাগুলো রানাপ্লাজায় বেঁচে যাওয়া এক শ্রমিকের, যিনি আর কারখানায় ফিরতে পারেননি। যার অঙ্গহানি ঘটেনি কিন্তু যার শরীর পুরোটাই ভাঙা। এই যে মরে যায়নি, অঙ্গহানি ঘটেনি তারপরেও তিনি বেঁচে থাকার আনন্দ উপভোগ করতে পারেননি গত ১৩ বছর। শুধু এই শ্রমিক নন, প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক নানাভাবে আহত হয়ে বেঁচে আছেন কিন্তু ‘প্রাণহীন’।

রানা প্লাজায় এরকম হাজারো সত্য গল্প রয়েছে। একদিকে ক্ষতিপূরণ নিয়ে অসন্তোষ আরেকদিকে জীবনে না ফিরতে পারার হতাশা। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন যারা, তারা বলছেন— যতদিন আমরা শ্রমিকদের সংখ্যা মনে করবো, ততদিন মানবিক আচরণ তাদের সঙ্গে করার বাস্তবতা তৈরি হবে না। এই যে নিহত আহত শ্রমিক এগুলো একেকটা প্রাণ। এদের স্বপ্ন ছিল, জীবন ছিল— সব খুইয়েছেন যারা, তারা বিচারটাও পাননি।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনায় ১১৩৬ জন শ্রমিক নিহত হন। ঘটনার দিন থেকে টানা প্রায় দুই মাস দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সে ঘটনা প্রচার হয়েছে। দোষী কারা সবাই জানেন, কিন্তু ১৩ বছরে বিচার সম্পন্ন হয়নি। কারখানা দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা না করে, যদি একেকটি জীবন হিসেবে বিবেচনা করা হতো— তাহলে হয়তো বিচার সম্পন্ন হতো। এ ধরনের মৃত্যু সংখ‍্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা। এত মানুষ দেখলো, উদ্ধারে অংশ নিলো, এত গণমাধ্যমের উপস্থিতি, সে ঘটনায়ও নাকি সাক্ষীর অভাব। এরচেয়ে ‘তামাশার’ আর কী হতে পারে।

জীবনগুলো সংখ্যা হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রথমদিন থেকেই শুরু হয়— যখন কিনা রানা প্লাজার শ্রমিকদের তালিকা নিয়ে বিজিএমইএ প্রহসন শুরু করে। ভবন ধসের পরপরই বিজিএমইএ একটি সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, পুরো শ্রমিক সংখ্যা ৩,১২২। আবার কিছুদিন পরেই বলে যে সংখাটি সঠিক নয়। স্পষ্টতই, উদ্ধারকর্মীদের হাতে শ্রমিকদের একটা সঠিক তালিকা থাকলে উদ্ধার কাজ আরও সহজ হতো। কিন্তু বিজিএমইএ তালিকাটি উদ্ধারকর্মীদের দেয়নি। এরপর জীবিত ও মৃত মিলে উদ্ধারকৃত শ্রমিক সংখ্যা দাঁড়ালো ৩ হাজার ৬৬ জন। সে সময়ের বিজিএমইএ’র নেতারা বলেন, তাদের কাছে পাঁচটি কারখানার সেবছর মার্চের বেতন তালিকা আছে। যদিও তালিকায় কতজন শ্রমিক আছেন, তিনি তা জানেন না। ঘটনার ১৫ দিন পরে বিজিএমইএ ৩,৬১৯ জন শ্রমিকের তালিকা দেয়। কিন্তু উদ্ধারকারীরা ধ্বংস স্তূপে একের পর এক লাশ পাচ্ছে দেখে সম্ভবত তিনি তার আগের অবস্থানে ফিরে গিয়ে বলা শুরু করেছেন, এই তালিকাটিও অসম্পূর্ণ। একটা কারখানায় কতজন শ্রমিক ছিলেন, তার তথ্য কারোর না জানার বিষয়টি নতুন নয়, কিন্তু প্রতিটি দুর্ঘটনার পরেই এটা প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে গেছে।

মাহমুদুল হাসান হৃদয় রানা প্লাজার ঘটনায় আহত শ্রমিক। গত ১৩ বছর ক্ষতিপূরণ পাননি এমন শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজ করছেন তিনি বিভিন্ন সময়ে। তিনি মনে করেন, শ্রমিকদের বিষয়টি সব সময়ই অবহেলিত হয়ে আছে। একজন শ্রমিক নিহত হননি বটে, কিন্তু আজীবন কাজের অযোগ্য হয়ে গেছেন— তার জীবনের মূল্য নেই? তার এই ক্ষতির মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করবেন? এক লাখ, দুই লাখ টাকা দিয়ে সে তার জীবন কীভাবে চালিয়ে নেবে? তারা বিচারও পাবে না?

এ ধরনের ঘটনার পরে বিচার না হওয়াটাকে তামাশা উল্লেখ করে শ্রমিক নেতা শহীদুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘‘সাক্ষী ওনারা পান না, আমাদের সঙ্গে সাক্ষীদের দেখা কথা হয়। তাহলে রাষ্ট্র কেন তাদের দেখা পায় না? এত মানুষ অমানবিকভাবে নিহত হলো, তার বিচার হবে না? ’’

কেন এই বিচারে এত দীর্ঘসূত্রতা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘শ্রেণি হিসেবে শ্রমিকের বিচার পাওয়ার সুযোগ কম। এই শ্রেণি সংখ্যায় বেশি, কিন্তু ‘ক্ষমতায়’ কম, সে কারণে বিচারটাও পায় না।’’

শ্রমিকদের বরাবর উপেক্ষা করা হয়েছে এবং তারা কখনোই গুরুত্ব পায়নি উল্লেখ করে বিলসের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়তো আছেই। এসব বিশেষ ট্রাইব‍্যুনালে বিচার করতে হবে। আবার একটা ভাবনা কাজ করে, বেশি কিছু বলতে গেলে ব‍্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষমতার ভাবসাম‍্যহীনতা একটা ব‍্যাপার। আবার আমরা যারা শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করি, তাদের কাজের আত্ম-সমালোচনা দরকার আছে, আমরা কোনও একটা বিষয়ে লেগে থাকি না।’’

 

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
আকস্মিক পরিদর্শনে প্রতিমন্ত্রী, ভূমি অফিসে সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ
ঈদের ছুটি শেষে ফেরার পর এক গ্রুপের ১৮৬৮ জনকে চাকরি থেকে ছাঁটাই
নিজের দেশে আমি কেন এমন অপমানের শিকার হলাম
সর্বশেষ খবর
চতুর কথা বলে রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না: যুবদল সভাপতি
চতুর কথা বলে রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না: যুবদল সভাপতি
ঈদের আগে বেতন পাননি ৬ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী, সংসদে ক্ষোভ
ঈদের আগে বেতন পাননি ৬ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী, সংসদে ক্ষোভ
সীমান্তের ১১ জেলায় আনসার মোতায়েন
সীমান্তের ১১ জেলায় আনসার মোতায়েন
‘ধন্যবাদ ডার্লিং’ বলে মাইক্রোফোন খুলে সাক্ষাৎকার থেকে চলে গেলেন ট্রাম্প
‘ধন্যবাদ ডার্লিং’ বলে মাইক্রোফোন খুলে সাক্ষাৎকার থেকে চলে গেলেন ট্রাম্প
সর্বাধিক পঠিত
স্পা সেন্টারে ‘ব্ল্যাকমেইল’ ফাঁদ
স্পা সেন্টারে ‘ব্ল্যাকমেইল’ ফাঁদ
আগেই তাকে ত্যাজ্য করেছি, ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবো না
আগেই তাকে ত্যাজ্য করেছি, ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবো না
ভুটানের ভূমিকম্পে কাঁপলো ঢাকাসহ সারা দেশ
ভুটানের ভূমিকম্পে কাঁপলো ঢাকাসহ সারা দেশ
যেকোনও মূল্যে মাজারের সেই কুমির ফেরত চান খাদেম
যেকোনও মূল্যে মাজারের সেই কুমির ফেরত চান খাদেম
পেনাল্টি, লাল কার্ড ও মারামারির ম্যাচে মালদ্বীপকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ 
পেনাল্টি, লাল কার্ড ও মারামারির ম্যাচে মালদ্বীপকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ