‘ফুটপাতে হকার উচ্ছেদের চেষ্টা এরশাদ-হাসিনা-খালেদা সবাই করেছেন, কেউ পারেনি’ 

​আবু ছালেহ আতিফ 
২৪ এপ্রিল ২০২৬, ২২:৫৪ আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ২২:৫৪

​রাজধানীতে ফের জমেছে ফুটপাত আটকিয়ে জমজমাট ব্যবসা। কিছুদিন আগের উচ্ছেদ অভিযানের পর কিছুদিন বন্ধ থাকলেও পুনরায় হাঁটার রাস্তা দখল করে বসেছে দোকানপাট। 

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিকালে রাজধানীর গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউসহ বায়তুল মোকাররম সংলগ্ন বিভিন্ন জায়গায় এমন দৃশ্য দেখা গেছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফুটপাত বন্ধ করলে আবারও বসবে। সারাজীবন এভাবেই চলে আসছে। সব সরকার চেষ্টা করছে— কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি, আর পারবেও না। কারণ এই ব্যবসা অনেক বছর ধরে চলছে। 

​গুলিস্তানের ফুটপাতে বসে জুতা বিক্রি করছেন সিরাজগঞ্জের ষাটোর্ধ্ব এক ব্যবসায়ী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যবসায়ী বিভিন্ন সময়ে ফুটপাত উচ্ছেদে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ফুটপাতে হকার উচ্ছেদের চেষ্টা এরশাদ, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া সবাই করেছেন— কিন্তু কেউ পারেনি। আর বর্তমান সরকারও পারবে না। কারণ এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল অনেক মানুষ। গরিব মানুষদেরও আশ্রয়স্থল এই ফুটপাত। তারা খুব অল্প টাকায় বিভিন্ন জিনিস কিনতে পারেন। সুতরাং এটা বন্ধ সাময়িক হলেও স্থায়ী হবে না।” 

উচ্ছেদে ব্যবসায় লস হয় উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী বলেন, “ঈদের পর থেকে লসে আছি। ঠিকমতো বেচাকেনা নেই। কারণ দোকান উঠিয়ে দিলে ক্রেতারা ভাবে দোকানতো বসে না। এজন্য বেচাকেনা কমে যায়।” 

একই সুরে কথা বললেন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের ফুটপাতে টি-শার্ট বিক্রেতা মোখলেস। উচ্ছেদ অভিযানকে ‘লুকোচুরি খেলা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “পুলিশ আসলে মাল নিয়া দৌঁড়াই, পুলিশ গেলে আবার সাজাই। আমাগো তো আর বড় বড় শোরুম নাই যে ভেতরে যামু। এই ফুটপাতেই আমাগো জীবন। সরকার উচ্ছেদ কইরা আমাগো পেটে লাথি মারলে আমরা তো আবার এখানেই বসুম।” 

বায়তুল মোকাররমের গেটে এক প্লাস্টিক পণ্য বিক্রেতা  বলেন, “মার্কেটের ভেতরে যেই বাটি ২০০ টাকা, আমরা সেইটা ১০০ টাকায় দেই। গরিব মানুষ মার্কেটে ঢোকার সাহস পায় না। সরকার চাইলে আমাদের জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা কইরা দিক, নয়তো পেটের দায়ে রাস্তা দখল কইরাই বসতে হইবো।” 

সড়কের একাংশ দখল করে বেল্ট বিক্রি করা এক ব্যবসায়ী যুবক বলেন, “আমাগো সরানোর আগে বিকল্প কর্মসংস্থান দিতে হইবো। হুটহাট আইসা দোকান ভাইঙ্গা দিলে কয়েকদিন বন্ধ থাহে, তারপর আবার সব আগের মতন হইয়া যায়। এইটা কোনোদিনও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না।” 

​সরেজমিনে দেখা যায়, ফুটপাত ছাপিয়ে দোকানগুলোর মালামাল মূল রাস্তার অনেকটা অংশ দখল করে নিয়েছে। এতে করে পথচারীরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনের মাঝখান দিয়ে চলাচল করছে। রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়ায় জিপিও মোড় থেকে গুলিস্তান এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বাসে থাকা  কয়েকজন যাত্রী বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, “ফুটপাত যদি এভাবে দখল হয়ে থাকে, তবে আমরা সাধারণ মানুষ যাবো কোথায়? রাস্তা দিয়েও হাঁটা যায় না, আবার ফুটপাতেও জায়গা নেই। এক মিনিটের রাস্তা পার হতে আধা ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকতে হচ্ছে।” রাস্তায় চলাচলকারী আরেক পথচারী  বলেন, “ফুটপাত এখন দোকানদারদের শোরুম হয়ে গেছে। আর রাস্তার ওপর ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকার কারণে বাসগুলোও আগাতে পারে না। সিটি করপোরেশনের অভিযান কেবল দু’দিনের নাটক মনে হয়।” 

ডিএসসিসির সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা (উপসচিব) মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসানের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তিনি বলেন, “উচ্ছেদ অভিযানের ব্যপারে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে সহায়তা করে থাকি। এর বাইরে বাকি নীতি নির্ধারণ করে সরকার এবং অন্যান্যরা। এরপরও কিছু জানার থাকলে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে জানতে পারেন। তিনি সব জানেন।” 

যদিও এবিষয়ে জানতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো.জহিরুল ইসলামকে ফোন দিয়ে পাওয়া যায়নি। 

​উল্লেখ্য, রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে এবং যানজট নিরসনে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে গত বৃহস্পতিবার  (৯ এপ্রিল) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল এবং গুলিস্তানের জিপিও লিংক রোড এলাকায় পৃথক দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ওইদিন ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে বিপুল সংখ্যক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও অবৈধ কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এক অভিযানে বায়তুল মোকাররম মার্কেটের দক্ষিণ পাশে জিপিও লিংক রোডের উভয় পাশের রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করে। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে থাকা অস্থায়ী দোকান ও অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করার ফলে পথচারীদের চলাচলের পথ পুনরায় উন্মুক্ত হয়েছিল। 

​পাশাপাশি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো পরিচালিত অভিযানে প্রায় ১০০টি অবৈধ বাস কাউন্টার সিলগালা করা হয়। একই সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের অবৈধ স্থাপনাগুলোও। তখন নগরীর সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ডিএসসিসির আওতাধীন সব শপিংমল ও মার্কেটের সামনের ফুটপাতে কোনও ধরনের মালামাল রাখতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এছাড়া দখলদারদের নিজ উদ্যোগে অবিলম্বে সব মালামাল সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট দোকান বা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলসহ প্রচলিত আইনে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে জানানো হলেও বর্তমানে পরিস্থিতির কোনও উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। জনস্বার্থে ডিএসসিসির এই উচ্ছেদ ও তদারকি অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। 

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
বধির স্কুলের জমি আর দখল হতে দেওয়া হবে না: ডিএসসিসি প্রশাসক
অনুমোদিত স্থান ছাড়া হকার বসলেই মালামাল ক্রোক ও মামলা: ডিএসসিসি প্রশাসক
মিরপুরে উচ্ছেদ অ‌ভিযানে ভাঙচুর-আগুন: ৪ মামলায় আসা‌মি এক হাজার
সর্বশেষ খবর
আখতারুজ্জামানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে নিজ এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল
আখতারুজ্জামানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে নিজ এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল
খুবি শিক্ষার্থীদের মাদক-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ফেসবুক পোস্ট, রাতে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
খুবি শিক্ষার্থীদের মাদক-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ফেসবুক পোস্ট, রাতে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা
গাজায় ঘুমন্ত বাসিন্দাদের ওপর ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৫
গাজায় ঘুমন্ত বাসিন্দাদের ওপর ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৫
পোশাক কেনার আগে কেমন মানাবে দেখতে চান, আছে সহজ উপায়
পোশাক কেনার আগে কেমন মানাবে দেখতে চান, আছে সহজ উপায়
সর্বাধিক পঠিত
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
ব্র্যাকের পর নতুন যাত্রায় মিথিলা
ব্র্যাকের পর নতুন যাত্রায় মিথিলা
ভারতের পর পাকিস্তানি নায়িকা শাকিবের!
ভারতের পর পাকিস্তানি নায়িকা শাকিবের!
ফের বাড়লো তেলের দাম
ফের বাড়লো তেলের দাম
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেফতার
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেফতার