লিবিয়া কিংবা অন্য কোনও দেশ হয়ে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করলে অনুমতি দেওয়া হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় আইন কার্যকর হওয়ার পর এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে ঢাকায় ইতালির দূতাবাস। তবে শুধু ইতালি নয়, অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ এবং রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো।
গত ১২ জুন ইইউর অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থাকে পুনর্বিবেচনা করে অভিবাসন এবং আশ্রয়-সংক্রান্ত নতুন চুক্তি কার্যকর করা হয়েছে। ১০টি আইনি পদক্ষেপের এই বিস্তৃত নীতিমালা ইইউ সীমান্তে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের স্ক্রিনিং ও নিবন্ধনের জন্য অভিন্ন পদ্ধতি নির্ধারণ করে। একইসঙ্গে দ্রুত আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়াকরণ, প্রত্যাবর্তন পদ্ধতি, আশ্রয় আবেদনের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং অভিবাসী চাপে থাকা ইইউ দেশগুলোকে সহায়তার জন্য একটি সংহতি প্রক্রিয়াও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দুই বছর ধরে আলোচনার পর নতুন এই সিদ্ধান্ত এখন বাস্তবায়নের পথে। ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলোকে এই ১০টি আইনি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিচালনাগত, অবকাঠামোগত ও আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে এটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
সীমান্ত আরও নিরাপদ করা হচ্ছে
ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও ঝুঁকি মূল্যায়নের আওতায় আনা হবে। যারা নিরাপত্তা বা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করে, তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে শেনজেন অঞ্চলকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
নতুন স্ক্রিনিং পদ্ধতিতে ইইউতে প্রবেশকারী অনিয়মিত অভিবাসী ও আশ্রয় প্রার্থীদের পর্যবেক্ষণ ও নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সব সদস্য রাষ্ট্রকে অভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। এর ফলে শেনজেন সীমান্ত ব্যবস্থার বিদ্যমান একটি বড় ফাঁক বন্ধ হবে। অর্থাৎ, শেনজেনভুক্ত সব দেশে একই নিয়ম কার্যকর হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী স্ক্রিনিং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করতে হবে। ইইউ দেশগুলোর সীমান্তে ধরা পড়লে সাত দিনের মধ্যে এবং দেশের অভ্যন্তরে আটক হলে তিন দিনের মধ্যে স্ক্রিনিং সম্পন্ন করতে হবে। স্ক্রিনিংয়ের পর আশ্রয় প্রার্থীদের আবেদন প্রক্রিয়ার উপযোগী ব্যবস্থায় পাঠানো হবে। আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালে তাদের সীমান্ত এলাকায় রাখা হবে।
শেনজেন অঞ্চলে স্বয়ংক্রিয় ডাটাবেজে থাকবে সব তথ্য
এই চুক্তির মাধ্যমে আগের ব্যবস্থার পরিবর্তে ইইউজুড়ে সমন্বিত, শক্তিশালী ও ন্যায্য আশ্রয় পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। সংক্ষিপ্ত সময়সীমা এবং ‘ইউরোড্যাক’ ডাটাবেজের উন্নত ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ইইউতে অননুমোদিত প্রবেশের প্রবণতা কমানোর চেষ্টা করা হবে।
অধিকার নিশ্চিত করতে অভ্যর্থনা শর্তাবলি নির্দেশিকা পুরো ইউরোপে একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। এতে সুরক্ষা জোরদার, ন্যূনতম জীবনযাত্রার পরিবেশ নিশ্চিত এবং আশ্রয় প্রার্থীদের একীভূতকরণ সহায়তা উন্নত করার ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে—সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলসহ সব পর্যায়ে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ, আবেদন, অধিকার ও বাধ্যবাধকতা বিষয়ে সহায়তা, ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, ইইউজুড়ে অভিন্ন অভ্যর্থনা মান এবং জরুরি পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যাপ্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করা।
এই চুক্তি আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সংহতি ও দায়বদ্ধতার একটি কার্যকর ইউরোপীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এতে একটি বাধ্যতামূলক, নমনীয় ও প্রয়োজনভিত্তিক ‘সংহতি প্রক্রিয়া’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাতে অভিবাসী চাপে থাকা সদস্য দেশগুলো এককভাবে চাপের মুখে না পড়ে।
ইইউর আশ্রয় ও অভিবাসন ব্যবস্থায় এখন প্রথম প্রবেশের সদস্য রাষ্ট্রে আবেদন করার বাধ্যবাধকতা, আশ্রয়ের আবেদন মূল্যায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্র নির্ধারণের স্পষ্ট মানদণ্ড, অননুমোদিত গৌণ চলাচল মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর পদ্ধতি এবং আবেদনকারীদের জন্য সুস্পষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
অবৈধ প্রবেশের সময় সীমান্তে আটক করা হবে
নতুন নিয়ম সদস্য দেশগুলোকে আশ্রয় প্রার্থীদের আবাসন ও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বরাদ্দের ক্ষেত্রে আরও নমনীয়তা দেবে। প্রয়োজনে তাদের চলাচলের স্বাধীনতাও সীমিত করা যাবে।
আশ্রয় প্রার্থীরা আবেদন নিবন্ধনের ছয় মাসের মধ্যে শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। যাদের আবেদন গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে আরও আগে সুযোগ দেওয়ার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে উৎসাহিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভাষা শিক্ষা, নাগরিক শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
গত বুধবার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ইইউতে অবৈধভাবে অবস্থানরত তৃতীয় দেশের নাগরিকদের প্রত্যাবর্তন নীতিতে পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে। নতুন বিধিগুলোর অপব্যবহার ও অননুমোদিত চলাচল রোধের পাশাপাশি মৌলিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে প্রক্রিয়াগুলো সহজ ও দ্রুত করার লক্ষ্য নিয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কোনও সদস্য রাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থানরত ইইউ বা নন-ইইউ নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত হলে তাকে অবিলম্বে অথবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশ ত্যাগ করতে হবে।
ঢাকার ইতালি দূতাবাস জানিয়েছে, ১২ জুন থেকে নতুন অভিবাসন আইন কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীদের সীমান্তেই আটক করে দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে। ফলে তাদের পক্ষে ইতালিতে অবস্থান বা কাজ করার সুযোগ থাকবে না।
সহযোগিতা এবং আটকের বাধ্যবাধকতা
যাদের বিরুদ্ধে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে। প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাদের আটকও করা যেতে পারে। যেমন—যদি তারা সহযোগিতা না করে, পালানোর চেষ্টা করে, পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে বা নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
আটকের আদেশ প্রশাসনিক বা বিচারিক কর্তৃপক্ষ দিতে পারবে এবং এটি সর্বোচ্চ ২৪ মাস পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। পরিস্থিতির পরিবর্তন, নতুন তথ্য পাওয়া বা তৃতীয় কোনও দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লে আটকের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো যাবে।
যদি তৃতীয় দেশের কোনও নাগরিক অন্য ইইউ সদস্য রাষ্ট্রে চলে যায়, তবে তাকে নতুন করে আটক করা যেতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে নতুন মেয়াদ প্রযোজ্য হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো আটক ব্যক্তিদের নির্ধারিত স্থানে বসবাসে বাধ্য করতে পারবে।
প্রত্যাবর্তনকারীদের গ্রহণে ইইউর বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি
ইইউ সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির ভিত্তিতে কোনও দেশ চাইলে ‘রিটার্ন হাব’ স্থাপন করতে পারবে, যেখানে সঙ্গীবিহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাদ দিয়ে অভিবাসীদের স্থানান্তর করা যাবে।
এ ধরনের চুক্তি কেবল সেসব তৃতীয় দেশের সঙ্গে করা যাবে, যারা মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি মেনে চলে। প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু করার আগে জাতীয় কর্তৃপক্ষকে ইউরোপীয় কমিশন এবং অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রকে অবহিত করতে হবে।
ইউরোপের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশিদের ঝুঁকি কতটা—জানতে চাইলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন নীতি বদলাচ্ছে। কোথাও দক্ষ জনশক্তি নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি বাড়ানো হচ্ছে।
তার ভাষ্য, “বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত কাঠামোয় তরুণ কর্মশক্তি বেশি, কিন্তু দেশে চাকরির সুযোগ কম—এটাই অনেককে বিদেশমুখী করছে।”
তার মতে, মধ্যম আয়ের পরিবারের অনেক তরুণ-তরুণী দেশে প্রতিযোগিতায় এগোতে পারছে না। আবার বিদেশে পড়াশোনা বা বৃত্তি পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই। তাই তারা অন্য যেকোনও উপায়ে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, ইতালি বলছে যারা লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে আসবে, তাদের আর প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এটা কার্যকর হলে এখান থেকে ইতালিগামী অনেক বাংলাদেশির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ভিএফএসে যাওয়া অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সবাই যে ইতালিতে দীর্ঘমেয়াদে থাকার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে, তা নয়। কেউ হয়তো ফ্যামিলি ভিসায় যাচ্ছে এবং পরে পরিবারকে একীভূত করার চেষ্টা করবে।
তিনি আরও বলেন, ফেরত পাঠানোর এই প্রবণতা যখন বাড়বে, তখন হয়তো এখান থেকে যাওয়ার হারও কমে আসবে। যদি বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের প্রবাহ কমে, তখন ইউরোপ থেকে ফেরত পাঠানোর হার বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইতালি থেকে প্রত্যাখ্যানের হার তুলনামূলক বেশি হতে পারে।









