সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিরও পরিবর্তন হয়। কিন্তু পাসপোর্ট করতে গিয়ে দালালকে টাকা দেওয়া, জমির নামজারি দ্রুত করাতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া, থানায় সাধারণ ডায়েরি বা তদন্ত এগিয়ে নিতে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন— এসব যেন বাংলাদেশের নাগরিকজীবনের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা। সংশ্লিষ্টদের মতে, দল বা সরকার পরিবর্তন হলেও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় সেবা খাতের ঘুষ-দুর্নীতি থেমে থাকে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আগের জরিপের তুলনায় যা ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। একই সময়ে অন্তত একটি সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার— যা ২০২৩ সালে ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ।
এই তথ্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার ১২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়টি। প্রশ্ন উঠেছে, এখনও কি সেই দুর্নীতি অব্যাহত আছে? দুর্নীতি কমেছে নাকি আরও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। আর টিআইবির জরিপ জুন মাসে প্রকাশ হলেও এটি মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার সেবা খাতের একটি বার্ষিক চিত্র। তবে বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পৃথক মূল্যায়ন করেছে টিআইবি— যেখানে ইতিবাচক কিছু উদ্যোগের পাশাপাশি সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতি দমনে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের কথাও বলা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের একবছরের চিত্র
টিআইবির জরিপে শুধু ঘুষের মোট অঙ্কই বাড়েনি, বেড়েছে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের সংখ্যাও। ২০২৩ সালে যেখানে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি সেবা নিতে ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল, সর্বশেষ জরিপে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশে।
সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ সেবার তালিকায় রয়েছে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং ভূমি অফিস। পাসপোর্ট সেবা নিতে যাওয়া ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এবং ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। বিআরটিএ-তেও দুর্নীতির অভিজ্ঞতার হার ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ।
জরিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো— ঘুষ দেওয়া পরিবারগুলোর ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া সম্ভব হতো না, কিংবা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তো। অর্থাৎ বহু ক্ষেত্রে ঘুষ এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, নাগরিকের কাছে এটি কার্যত সেবা পাওয়ার অলিখিত শর্তে পরিণত হয়েছে।
পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৫ হাজার ১২৪ টাকায় নেমে এলেও টিআইবি বলছে, এটিকে দুর্নীতি কমার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ কম অঙ্কের ঘুষ দিলেও আগের তুলনায় বেশি পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতির বিস্তৃতি বেড়েছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপস্থিত হয়ে সরকারি সেবা নিয়েছেন, অথচ অনলাইনে সেবা নিয়েছেন মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে দালালচক্র, ফাইল আটকে রাখা, দ্রুত কাজের নামে অর্থ আদায় এবং কর্মকর্তা-সেবাগ্রহীতার সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বহাল থেকেছে।
বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়ন
বর্তমান সরকারের সময় নিয়ে এখনও টিআইবির একই ধরনের জাতীয় জরিপ হয়নি। ফলে পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়, সেবা খাতে ঘুষ কমেছে, বেড়েছে নাকি আগের অবস্থায় রয়েছে।
তবে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে টিআইবি বলেছে, সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যক্তিগত সফর নিরুৎসাহিত করা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর উদ্যোগের মতো কয়েকটি সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
একইসঙ্গে সংস্থাটি বলছে যে, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দৃশ্যমান নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, বিচারব্যবস্থা ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জরিপের ফলাফল প্রকাশের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা রোধে সরকারের নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দেখা যায়নি। একই সঙ্গে প্রশাসন, পুলিশ, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগ সরকারের নিজস্ব অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দুদকের শূন্যতা
দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু বর্তমান সরকারের শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকটে পড়ে।
গত মার্চে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার একযোগে পদত্যাগ করার পর প্রায় সাড়ে তিন মাস কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান, মামলা অনুমোদন, চার্জশিট, সম্পদ জব্দ, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও গ্রেফতারসংক্রান্ত কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে সরকার নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করেছে এবং আবেদনও আহ্বান করেছে। এতে কমিশন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব না পাওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সংসদে বিতর্ক
টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনার জন্ম দেয়। সরকারি দলের সদস্যরা ১২ হাজার কোটি টাকার ঘুষের হিসাব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানান।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি কোনও নির্দিষ্ট প্রকল্পে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা নয়। বরং নাগরিকরা সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যে ঘুষ দিয়েছেন, তার সামগ্রিক হিসাব। ফলে এটিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত দুর্নীতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে সেবা খাতের এই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় অন্তর্বর্তী সরকার এড়াতে পারে না।
তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা, জাহেদ উর রহমান নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মঙ্গলবার (৩০ জুন) বলেছেন, দুর্নীতি একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এর কোনও তামাদি নেই। অন্তর্বর্তী সরকার, আওয়ামী লীগ সরকার কিংবা বর্তমান সরকার— যে সময়েরই অভিযোগ হোক না কেন, দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে এবং করা উচিত। সরকারের পক্ষ থেকে কোনও বাধা থাকবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সেবা খাতের দুর্নীতি বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা তুলনামূলকভাবে বেড়েছিল।’’ তাঁর মতে, প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে শাস্তির ভয় দুর্বল হয়ে পড়ায় ঘুষের প্রবণতাও বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘দুর্নীতি বন্ধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো দলীয় পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের সমান প্রয়োগ। কেউ যদি বিশ্বাস করে যে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার বিচার হবে না, তাহলে দুর্নীতি কখনও কমবে না।’’
মাসুদ কামালের ভাষায়, “দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রবণতা চলতেই থাকবে। সরকার আওয়ামী লীগের হোক, অন্তর্বর্তী সরকারের হোক কিংবা বিএনপির— প্রশাসনের একই লোকজন যদি শাস্তির ভয় না পায়, তাহলে সেবা খাতের ঘুষও বন্ধ হবে না।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে বহু নাগরিকের কাছে ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া এখনও প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। তাই দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য, প্রতীকী ব্যয় সংকোচন কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের চেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—পাসপোর্ট অফিস, ভূমি কার্যালয়, থানা, বিআরটিএ, আদালত কিংবা ব্যাংকে সাধারণ মানুষ বাস্তবে ঘুষ ছাড়া সেবা পাচ্ছেন কিনা।









