চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ার সাইবার প্রতারণা-চক্রে বাংলাদেশিরা

আলী আসিফ শাওন
১৭ জুলাই ২০২৬, ২০:০০ আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ২১:১২

ভালো বেতনে অফিসের চাকরির আশায় কম্বোডিয়ায় গিয়ে মানবপাচারের শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশি তরুণরা। চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের সাইবার প্রতারণা চক্রের আস্তানায় আটকে রাখা হচ্ছে, বাধ্য করা হচ্ছে অনলাইন জালিয়াতিতে অংশ নিতে। অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতন, আটকে রাখা, এমনকি মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত পরিবার ঋণ করে দেশে ফিরিয়ে আনছে তাদের।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাইবার প্রতারণা চক্রের আস্তানা থেকে উদ্ধার হয়ে ৩০০-এর বেশি বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। এসব ঘটনা বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে নতুন ধরনের মানবপাচারের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।

চাকরির বদলে প্রতারণার ফাঁদ

গোপালগঞ্জের ৩০ বছর বয়সী আবদুল্লাহ মোল্লা ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ করে কম্বোডিয়ায় যান। সেখানে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, বৈধ কাগজপত্রের জন্য আরও ২ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হবে। পরে তাকে একটি অনলাইন প্রতারণা চক্রে কাজ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়।

আবদুল্লাহর ভাষ্য, সেখানে নারী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে প্রতারণার কাজ করতে বলা হয়েছিল। রাজি না হওয়ায় তিনি বিপাকে পড়েন। এ সময় কম্বোডীয় কর্তৃপক্ষ ওই প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালালে দালাল পালিয়ে যায়। পাসপোর্ট ছাড়া প্রায় দুই মাস নমপেনে আত্মগোপনে থাকতে হয় তাকে। পরে পরিবার আরও প্রায় ২ লাখ টাকা ঋণ করে থাইল্যান্ড হয়ে দেশে ফিরিয়ে আনে। সব মিলিয়ে প্রায় আট মাস কম্বোডিয়ায় থাকলেও কাজ করেছেন দুই মাসেরও কম সময়।

ঢাকার মিরপুরের শফিকুল ইসলাম হৃদয়ের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। মাসে ৮০০ ডলার বেতনের ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের চাকরির কথা বলে তাকে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারেন সেটি একটি সাইবার প্রতারণা কেন্দ্র।

হৃদয়ের অভিযোগ, প্রতারণার কাজে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে ১৭ দিন অন্ধকার কক্ষে আটকে রাখা হয়। প্রথম তিন দিন মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। আটকের আগে তিনি স্ত্রীকে নিজের অবস্থান পাঠাতে সক্ষম হন। পরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় পরিবারের সদস্যরা তার অবস্থান শনাক্ত করেন। মুক্তির জন্য পরিবারকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ ডলার দিতে হয়েছে। পুরো ঘটনায় তাদের প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান তিনি।

মানবপাচারের নতুন রূপ

জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর এ ধরনের ঘটনাকে 'জোরপূর্বক অপরাধে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে মানবপাচার' হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটির মতে, বিদেশে বৈধ চাকরির প্রস্তাবের আড়ালে মানুষকে সাইবার প্রতারণা চক্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভয়ভীতি, সহিংসতা ও জবরদস্তির মাধ্যমে তাদের অপরাধে বাধ্য করা হয়।

জানতে চাইলে জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের মুখপাত্র মার্তা হুর্তাদো বলেন, অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার উদ্দেশ্যে মানবপাচার প্রতিরোধ, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ভুক্তভোগী অর্থনৈতিক সংকটে ছিলেন এবং অর্ধেকের বেশি ছিলেন বেকার বা অপ্রতুল কর্মসংস্থানে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি—স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী বা পরিচিতজনের মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি মেকং অঞ্চলে, বিশেষ করে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওসে অবস্থিত। অনেক ক্ষেত্রেই এসব চক্রের শিকার ব্যক্তিদের মানবপাচারের ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিচার পাওয়া কঠিন

দুই ভুক্তভোগীই তাদের বিদেশে পাঠানো দালালদের শনাক্ত করতে পারলেও এখনও মামলা করেননি। তাদের দাবি, আইনি লড়াই চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই। তারা ব্র্যাক মাইগ্রেশন সার্ভিস সেন্টারের সহায়তা চেয়েছেন।

নীতিগত ও আইনি সহায়তা বিশেষজ্ঞ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর সহায়তা কাঠামো নেই। সাক্ষী সুরক্ষা আইনের অভাবে অনেকেই আদালতে সাক্ষ্য দিতে চান না। ফলে বহু মামলা শেষ পর্যন্ত টেকে না।

নতুন সংকট বলছে সরকার

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এই ধরনের মানবপাচারকে বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, অনলাইন প্রতারণা চক্রের প্রলোভনে অনেক বাংলাদেশি কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লাওসে যাচ্ছেন। অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাদের হাতে থাকা ভিসা মাত্র এক বা দুই মাসের পর্যটক ভিসার, অথচ দালালরা দুই বছরের কর্মভিসার কথা বলে প্রতারণা করে।

তিনি জানান, বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতারণামূলক ভিসা ব্যবহার করে বিদেশযাত্রা ঠেকাতে কাজ করছে সরকার। তবে প্রতিটি ঘটনা আগেই শনাক্ত করা সবসময় সম্ভব হয় না বলেও তিনি স্বীকার করেন।

সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

মার্তা হুর্তাদোর মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই চক্র নির্মূল করা সম্ভব নয়। শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই অপরাধীরা মানুষ পাচার করছে।

তিনি শ্রমিক নিয়োগকারী মধ্যস্থতাকারীদের ওপর কঠোর নজরদারি, অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্মের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, বিদেশে চাকরির বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছতা এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

এছাড়া ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা শনাক্তের ব্যবস্থা এবং দূতাবাস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে আন্তদেশীয় সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

/এম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
স্ক্যাম সেন্টার কী 
কম্বোডিয়ায় স্ক্যাম সেন্টার থেকে মুক্ত ৩০ বাংলাদেশি দেশে ফিরছেন মঙ্গলবার
কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের বিশেষ ফ্লাইটে ফিরিয়ে আনার দাবি
সর্বশেষ খবর
ইশরাকের কাজের উদ্দেশ্য ভালো হলেও হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়াটা ঠিক হয়নি: স্পিকার
ইশরাকের কাজের উদ্দেশ্য ভালো হলেও হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়াটা ঠিক হয়নি: স্পিকার
স্পেনের যে গুহায় পাথরের গায়ে আদিম মানুষের শিল্পকর্ম
স্পেনের যে গুহায় পাথরের গায়ে আদিম মানুষের শিল্পকর্ম
এসআইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মামলা, ৯৯৯-এ ফোনে উদ্ধার ভুক্তভোগী
এসআইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মামলা, ৯৯৯-এ ফোনে উদ্ধার ভুক্তভোগী
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ