অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করতেন আরিফুল ইসলাম রিফাত। দীর্ঘ দুই বছর তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করেও তার কোনো সন্ধান পাচ্ছিল না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের একটি দল গাজীপুরের একটি রিসোর্ট থেকে দুই সহযোগীসহ আরিফকে গ্রেফতার করেছে। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে একই চক্রের আরও তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতাররা হলেন—আরিফুল ইসলাম রিফাত, আরমান হোসেন জিহাদ, মাসুদ হোসেন, আব্দুল রাব্বী, কৌশিক আহমেদ শুভ ও মশিউর রহমান তারেক।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, গ্রেফতারদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০টি মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের (বিকাশ ও নগদসহ) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ এবং একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে।
ডিবি জানায়, সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে পরিচালিত একাধিক জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব প্ল্যাটফর্মে লেনদেন পরিচালনার জন্য মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছিল। পরে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সংঘবদ্ধ চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গাজীপুরের টঙ্গীর একটি রিসোর্ট থেকে প্রথমে তিনজনকে এবং পরে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় কুমিল্লা সদরের একটি হোটেল থেকে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ পরিচালনায় কয়েকটি পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে। মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট সংরক্ষণের জন্য তারা বড় রেজিস্টার বই ব্যবহার করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
পুলিশ জানায়, বাংলাদেশকেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে কাজ করা অধিকাংশ পেমেন্ট কোম্পানি চীনা নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে। এসব কোম্পানি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয়দের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। ব্যাংকের তুলনায় সহজলভ্য হওয়ায় এবং তুলনামূলক দুর্বল নজরদারির সুযোগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়।
ডিবি জানায়, জুয়ার সাইট পরিচালনায় সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট এবং মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। দিন শেষে এসব অ্যাকাউন্টের অর্থ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে বাইন্যান্স, বাইবিট ও বিটগেটের মতো ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মে ইউএসডিটি কিনে বিদেশে থাকা পেমেন্ট কোম্পানির ওয়ালেটে পাঠানো হতো।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ অংশের মূলহোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত। তার অধীনেই অন্যরা ‘গো পে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করতেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তার ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি একজন চীনা নাগরিক নাথান, যিনি ‘এলিয়েন’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ জানিয়েছেন, পেমেন্ট কোম্পানিগুলো দৈনিক মোট লেনদেনের শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ কমিশন দিত। প্রাপ্ত অর্থের অর্ধেক তিনি বিভিন্ন ভেন্ডরের মধ্যে বিতরণ করতেন। এসব ভেন্ডরের মধ্যে এমএফএস এজেন্ট, ডিএসও, সুপারভাইজার, হাউস ম্যানেজার, মালিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিছু ব্যক্তিও কমিশনের অংশ পেতেন। এ ছাড়া আবাসন, খাবার ও যাতায়াতসহ অন্যান্য ব্যয়ও কোম্পানি বহন করত।
ডিবিপ্রধান বলেন, আরিফের ব্যবহৃত ডিভাইস বিশ্লেষণ করে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে এ-সংক্রান্ত আরও চারটি মামলা রয়েছে এবং তিনি অতীতেও গ্রেফতার হয়েছেন।
তিনি বলেন, অবৈধ উপার্জনের অর্থে আরিফ বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। সম্প্রতি পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়কে তার একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লেও পরে তিনি আরেকটি বিএমডব্লিউ কিনেছেন।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারের সময় যে রিসোর্টে আরিফ অবস্থান করছিলেন, সেখানে তিনি তিনটি কক্ষ বুক করেছিলেন। তিনি যে কক্ষে ছিলেন, সেটির দৈনিক ভাড়া ছিল ৫০ হাজার টাকা। সাধারণত চার থেকে পাঁচ দিন এক জায়গায় অবস্থান করে পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে অন্য কোনো হোটেল বা কক্সবাজারের অভিজাত হোটেলে চলে যেতেন। দীর্ঘদিন এভাবেই তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপনে ছিলেন।
দেশে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন কী পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।









