রাজধানীর হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত ধাপে। জাপানি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন শেষ করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এখন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আলোচনা ও দর-কষাকষি শেষে চূড়ান্ত চুক্তি করতে হবে।
আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দুই পক্ষের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অক্টোবরে চুক্তি হতে পারে। এরপর সরকার ঘোষিত ১৬ ডিসেম্বরের সীমিত পরিসরের উদ্বোধনের দিনই টার্মিনালটি চালু করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বেবিচকের নির্ভরযোগ্য সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বেবিচক জানায়, নানা জটিলতায় আটকে থাকা থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য গত মঙ্গলবার বেবিচক সদর দফতরে নির্ধারিত কমিটির কাছে জাপানি প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তাব জমা দেয়। এতে কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয় ছিল। সেদিনই দুটি প্রস্তাব উন্মুক্ত করা হয়। একই দিন কারিগরি বিষয়ের ওপর মূল্যায়ন কমিটির সভা হয়। পরে বৃহস্পতিবার আর্থিক বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পূর্বে গঠিত প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি ওই দিন থেকেই কাজ শুরু করে। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমানকে। সদস্যসচিব করা হয়েছে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডোর আবু সাঈদ মেহবুব খানকে।
প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ও বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূল্যায়ন কমিটির সভা আমরা শেষ করেছি। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হবে। আলোচনা শেষে চুক্তি হবে। আমরা ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে যে সীমিত পরিসরে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, তার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, সবকিছু সময়ের মধ্যেই শেষ করতে পারব।’
দুই বছরের বেশি সময়েও চালু হয়নি
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প ছিল এই থার্ড টার্মিনাল। ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কাজ ৯৯ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৩ সালের অক্টোবরে এর সীমিত পরিসরে উদ্বোধন করা হয়। এরপর দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জাপানের সঙ্গে আলোচনা সফল না হওয়ায় টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।
বহুল আলোচিত এই থার্ড টার্মিনালের আয়তন দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল দিয়ে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী বহনের সক্ষমতা রয়েছে। তৃতীয় টার্মিনাল যুক্ত হলে বছরে দুই কোটি পর্যন্ত যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। টার্মিনালটিতে একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ পার্কিং করা যাবে। রয়েছে ১৬টি ব্যাগেজ বেল্টসহ অত্যাধুনিক বিভিন্ন সুবিধা।
থাকছে আধুনিক বিভিন্ন সুবিধা
নতুন টার্মিনালে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি চলন্ত পথ। যারা বিমানবন্দরের দীর্ঘ পথ হাঁটতে পারবেন না, তাদের জন্য এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সিঙ্গাপুর, ব্যাংককসহ বিশ্বের অত্যাধুনিক ও বেশি যাত্রী প্রবাহের বিমানবন্দরগুলোতে এ ধরনের চলন্ত পথ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও মসৃণ যাত্রার অভিজ্ঞতা দিতে সহায়তা করে।
নতুন টার্মিনালে যাত্রীদের ব্যাগের জন্য সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি ও ব্যাংকের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের মতো অত্যাধুনিক তিনটি আলাদা সংরক্ষণ এলাকা করা হয়েছে। এগুলো হলো—সাধারণ ব্যাগেজ সংরক্ষণ, হারানো ও পাওয়া ব্যাগেজ এবং অতিরিক্ত আকারের ব্যাগেজ সংরক্ষণ এলাকা।
যাত্রীদের স্বাভাবিক ওজনের ব্যাগেজের জন্য টার্মিনালটিতে ১৬টি সাধারণ ব্যাগেজ বেল্ট থাকবে। অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজের জন্য রয়েছে আরও চারটি পৃথক বেল্ট।
টার্মিনালের প্রতিটি ওয়াশরুমের সামনে থাকবে একটি করে বেবি কেয়ার লাউঞ্জ। এসব লাউঞ্জে মায়েদের জন্য বুকের দুধ খাওয়ানোর কক্ষ, ডায়াপার পরিবর্তনের জায়গা এবং বড় পরিসরের পারিবারিক বাথরুম রাখা হয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের জন্য দোলনাসহ খেলার জায়গাও রয়েছে।
ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কক্ষ, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ফার্স্ট এইড কক্ষ, করোনাসহ বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা কেন্দ্র এবং আলাদা রাখার ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়েছে।
অত্যাধুনিক এই টার্মিনাল ভবনে থাকবে ১০টি স্বয়ংক্রিয় চেক-ইন যন্ত্র। এগুলোতে পাসপোর্ট ও টিকিটের তথ্য প্রবেশ করালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বোর্ডিং পাস ও আসন নম্বর পাওয়া যাবে। এরপর নির্ধারিত স্থানে যাত্রী তার লাগেজ রাখবেন। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় লাগেজ উড়োজাহাজের নির্ধারিত স্থানে চলে যাবে। তবে ৩০ কেজির বেশি ওজনের ব্যাগেজ নিয়ে এই ব্যবস্থায় চেক-ইন করা যাবে না।
যাত্রীদের জন্য আরও ১০০টি চেক-ইন কাউন্টার থাকবে টার্মিনালটিতে। অবসরে যাত্রীদের সময় কাটানোর জন্য নতুন টার্মিনালে শিগগিরই সিনেমা লাউঞ্জ ও বিমান সংস্থার লাউঞ্জ চালু করা হচ্ছে। এই দুটি লাউঞ্জ ছাড়া অন্যান্য স্থাপনা ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে।
১৬ ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্য
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর জন্য আগামী ১৬ ডিসেম্বরকে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বর্তমান সরকার। ওই দিন সীমিত পরিসরে উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে টার্মিনালের বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা, পরিচালনাগত প্রস্তুতি, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নির্মাণকাজ শেষ হলেই একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল চালু করা যায় না। যাত্রীসেবা থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা, চেক-ইন, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, বোর্ডিং, ভূমি পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রতিটি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে প্রস্তুত করতে হয়। বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনালের মতো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর স্থাপনায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তৃতীয় টার্মিনাল ভবিষ্যতে বিমানবন্দরের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আয়ের উৎস হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) ও মূল্যায়ন কমিটির সহসভাপতি এয়ার কমোডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, ‘দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর জাপানি প্রতিষ্ঠান থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। আমরা তাদের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করছি। সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই আমরা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৬ ডিসেম্বর সরকার ঘোষিত সময় অনুযায়ী চালু করা সম্ভব হবে।’








