টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২২ এর বাজার এলাকার একটি ট্যাপস্ট্যান্ড। দুপুর ২টা ৪০ মিনিট। বড় একটি পানির কনটেইনারে পানি ভরছেন আশরাফ। পাহাড়ি উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে কাঁধে করে সেই পানি ক্যাম্পের খুপড়ি ঘরে নিয়ে যেতে তার সময় লাগে সাত থেকে আট মিনিট। দ্রুত পানি নেওয়ার জন্য কাঁধে দুই পাশে এবং হাতে করে একসঙ্গে কয়েকটি পাত্র নিয়ে যান তিনি।
বৃদ্ধ বাবা-মা ও চার ভাইবোনের সংসারে প্রতিদিন পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহের দায়িত্ব আশরাফের। তার ভাষায়, সুস্থ থাকুন বা অসুস্থ, পানি আনতেই হবে। আশরাফ বলেন, ‘পানি টানতে টানতে শরীর ব্যথা হয়ে যায়। জনপ্রতি ২০ লিটার পানি দেওয়া হয়। এই পানি দিয়েই খাবার, রান্না, গোসল ও শৌচকর্ম, সব করতে হয়। একজন মানুষের জন্য ২০ লিটার কোনওভাবেই যথেষ্ট নয়।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ একবেলা না খেয়ে থাকতে পারে, কিন্তু পানি ছাড়া তো উপায় নেই। টয়লেট ব্যবহারের পর অতিরিক্ত পানি ঢালতেও পারি না। ফলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যেই আমরা বেঁচে আছি।’
খরার সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে জানিয়ে আশরাফ বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে মাপে কিছুটা ছাড় থাকে। কিন্তু খরার মৌসুমে ২০ লিটার পানিও পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তখন তিন-চার দিন পরপর গোসল করি। গোসল করে পানি শেষ করে ফেললে রান্না বা অন্য জরুরি কাজ করা যাবে না।’
তিনি জানান, অক্সফাম পানির ব্যবস্থা না করলে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়ত। আগে অনেক দূর থেকে পানি আনতে হতো। পথে মেয়েরা প্রায়ই হয়রানির শিকার হতেন বলেও জানান তিনি।
‘এত কষ্টের মধ্যে থাকা যায় না। আমরা আমাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই’, বলেন আশরাফ।
একই ট্যাপস্ট্যান্ডে আট বছর বয়সী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে পানি সংগ্রহ করতে এসেছেন আছিয়া। স্বামী অসুস্থ হওয়ায় প্রতিদিন তিনিই পরিবারের জন্য পানি আনেন। তাদের ঘর থেকে ট্যাপস্ট্যান্ডে হেঁটে যেতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ মিনিট।
আছিয়া বলেন, ‘দুই মেয়ে, এক ছেলে আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে সংসার। একা এত পানি টেনে আনা খুব কষ্টের। তাই মাঝে মাঝে মেয়েকেও সঙ্গে নিয়ে আসি।’
তিনি বলেন, ‘জনপ্রতি ২০ লিটার পানি দিয়ে রান্না, খাওয়া, গোসল, সব চালানো অসম্ভব। খরার সময় সরবরাহ আরও কমে যায়। তখন পরিবারের সবাই প্রতিদিন গোসল করতে পারে না। একদিন একজন, পরদিন আরেকজন গোসল করি।’
সরেজমিনে আছিয়ার ঘরে দেখা যায়, হাঁড়ি-পাতিল আধোয়া অবস্থায় পড়ে আছে। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পানির অভাবে সব সময় বাসন পরিষ্কার করে রাখা যায় না। রান্না করার সময়ই ধুয়ে নিই।’
যেভাবে পানি পৌঁছায় ক্যাম্পে
২০১৭ সাল থেকে ডিএসকে ও অক্সফাম যৌথভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। ডিএসকের সহকারী প্রকৌশলী ফজলুল করিম বলেন, টেকনাফে নিরাপদ পানির অন্যতম বড় সমস্যা ভূগর্ভস্থ পানির সংকট। ২০ থেকে ৩০ ফুট নিচে গেলেই পাথর ও শিলাস্তর পাওয়া যায়। ফলে পর্যাপ্ত ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যায় না। অথচ ক্যাম্পে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন। এই চাহিদা পূরণে স্থাপন করা হয়েছে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট।
খরার মৌসুমকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ফজলুল করিম বলেন, ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী পাঁচ মাস খালে পানির পরিমাণ অনেক কমে যায়। তখন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটি এলাকা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করতে হয়। ওই এলাকায় মানুষ বসবাস করে না, শুধু কয়েকজন কৃষক চাষাবাদ করেন।
পানি পরিশোধনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, প্রথমে ঘোলা পানিকে ফিটকিরি দিয়ে স্বচ্ছ করা হয়। এরপর ক্লোরিন প্রয়োগ করে জীবাণুমুক্ত করা হয়। পরে নিজস্ব পরীক্ষাগারে পানির মান পরীক্ষা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী অবশিষ্ট ক্লোরিনের মাত্রা শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা হয়।
ফজলুল করিম বলেন, শুধু প্ল্যান্টে নয়, ট্যাপস্ট্যান্ড ও পরিবারের ঘরেও পানির মান পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের মনিটরিং টিম নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করে। প্রতিদিন দুই থেকে তিনজন চেকার ও হাইজিন টিম মাঠে কাজ করে।
প্ল্যান্ট থেকে পানি দ্বিতীয় সংরক্ষণ ট্যাংকে নেওয়ার পর চারটি ডিস্ট্রিবিউশন ব্লকের মাধ্যমে ১৩৭টি ট্যাপস্ট্যান্ডে সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন সকাল ৭টা ও দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে পানি বিতরণ করা হয়।
হোস্ট কমিউনিটির জন্যও রয়েছে তিনটি পৃথক ট্যাপস্ট্যান্ড। এসব ট্যাপস্ট্যান্ডের মাধ্যমে ৬৯৩ জন স্থানীয় বাসিন্দা নিরাপদ পানি পাচ্ছেন।
ফজলুল করিম জানান, খাল শুকিয়ে গেলে জনপ্রতি পানির পরিমাণ ২০ লিটার থেকে ১৫ লিটারে নেমে আসে। তিনি বলেন, ‘ওয়াশ সেক্টরের নির্দেশনা হলো, কোনও অবস্থাতেই ১০ লিটারের নিচে পানি দেওয়া যাবে না। এখন পর্যন্ত আমাদের ১০ লিটারে নামতে হয়নি; সর্বনিম্ন ১৫ লিটার সরবরাহ করছি।’
বদলেছে হোস্ট কমিউনিটির জীবনও
শুধু রোহিঙ্গারাই নন, টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, অক্সফামের সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর আগে তাদেরও দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো।
স্থানীয় উপকারভোগীরা জানান, আগে এই এলাকায় মেয়েদের বিয়ে দিতে অনেকে অনাগ্রহী ছিলেন। কারণ ভোর বা সন্ধ্যায় দূরে পানি আনতে গিয়ে নারীরা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতেন। এখন কাছের ট্যাপস্ট্যান্ড থেকে দিনে দুইবার পানি পাওয়ায় তাদের ভোগান্তি অনেক কমেছে।
বাড়ছে জনসংখ্যা, কমছে সহায়তা
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান সেবাগুলো টিকিয়ে রাখা।
দুই কারণে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একদিকে সীমান্তের ওপারে সংঘাতের কারণে নতুন করে মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। অন্যদিকে গত ৯ বছরে প্রায় সোয়া ২ লাখ শিশু জন্ম নিয়েছে। ফলে জনসংখ্যা বাড়লেও আন্তর্জাতিক তহবিল কমছে।
তিনি বলেন, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, সব সেবা আগের মতো বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সংস্থা তহবিল শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রকল্প গুটিয়ে নিচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সহায়তাও কমেছে।
মিজানুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে ২০২৭ সালে রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে। সেবা আরও সংকুচিত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা নিজেদের দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যেখানে হিমশিম খাচ্ছি, সেখানে অন্য দেশের ১২ লাখ মানুষের ব্যয় দীর্ঘদিন বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।’









