শিশুর অভিভাবকত্বে আইনি জটিলতা দূর করার তাগিদ

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৭ আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৭

শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় তার প্রকৃত পরিচর্যাকারীর অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার তাগিদ দিয়েছেন আইনজীবী, সংসদ সদস্য, অধিকারকর্মী ও গবেষকরা। তারা বলেছেন, আদালতের আদেশ কার্যকর করা, একক অভিভাবকের সন্তানের স্কুলে ভর্তির বাধা দূর করা এবং আইনি স্বীকৃতির পর পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর দৃকপাঠ ভবনে ‘শিশুদের অভিভাবকত্ব সম্প্রসারণ প্রস্তাব’ (সিজিইপি)-এর দ্বিতীয় সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে। নাগরিক কোয়ালিশনের সাংগঠনিক সহযোগিতায় আয়োজিত সংলাপে আইনজীবী, সংসদ সদস্য, সাংবাদিক, গবেষক, অধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।

সংলাপে বলা হয়, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে বাবাকে শিশুর স্বাভাবিক অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে যিনি বাস্তবে শিশুর লালনপালন করেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই মা স্কুলে ভর্তি, জরুরি চিকিৎসা বা বিদেশভ্রমণের মতো বিষয়ে সন্তানের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন। আদালতের আদেশ পাওয়ার পরও তা কার্যকর না হওয়া এবং অভিভাবকত্ব পাওয়ার পর সামাজিক অসহযোগিতার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।

সিজিইপির গবেষণা প্রধান ও সমন্বয়ক তৃষিয়া নাশতারান বলেন, উদ্যোগটি তিনটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত—শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, মা-বাবা উভয়ের অভিভাবকত্বের অধিকার এবং শিশুর পরিচর্যার ধারাবাহিকতা। বিদ্যমান পারিবারিক আইন প্রতিস্থাপন না করেই প্রকৃত পরিচর্যাকারীর অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার উপায় খুঁজছে উদ্যোগটি।

ব্লাস্টের আয়েশা আক্তার জানান, ২০২৩ সালে অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০-এর ১৯(খ) ধারা চ্যালেঞ্জ করে জনস্বার্থ মামলা করা হয়। ২০২৪ সালে আদালত এ বিষয়ে রুল জারি করে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নির্দেশিকা তৈরির নির্দেশ দেন। তবে নির্দেশিকার অগ্রগতি সম্পর্কে এখনও তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম সৎবাবার অভিভাবকত্ব, দত্তক নেওয়ার অধিকার ও দত্তক সন্তানের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, মৃত্যু বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটলেও শিশুর জীবন যেন অনিশ্চয়তায় না পড়ে, সে জন্য অভিভাবকত্বের পরিসর সম্প্রসারণ জরুরি।

সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ শিশুদের সুরক্ষায় ফস্টার কেয়ার ব্যবস্থা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে ব্লাস্টের ব্যারিস্টার সারা হোসেন আইন সংস্কারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও বিচারকদের প্রশিক্ষণ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, শিশুর অভিভাবকত্ব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও নীতিনির্ধারকেরা সবসময় এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন না। শিশুর পরিচর্যাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া উচিত রাজনীতিতে সক্রিয় ব্যক্তিদের কাছ থেকেই।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী পথশিশু, অনাথ ও রোহিঙ্গা শিশুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন। শিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ক্লাব ও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের পরিচর্যা ও বেড়ে ওঠার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, একটি শিশুকে বড় করতে গোটা সমাজের ভূমিকা প্রয়োজন। সমাজের বৃহত্তর অংশের স্বীকৃতি ছাড়া আইনি প্রতিকার কার্যকর করা কঠিন। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে শিশুর চাহিদা ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসনের পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আলোচনায় আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চিহ্নিত করা, শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাতের আদেশ নিশ্চিত করা এবং আইনি স্বীকৃতির পর ট্রমা ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও উঠে আসে। ইংল্যান্ডের শিশু ও পারিবারিক আদালতবিষয়ক পরামর্শ ও সহায়তা ব্যবস্থার আদলে বাংলাদেশে স্বাধীন সংস্থা গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।

সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, নারী প্রয়াসের সেক্রেটারি ড. ফেরদৌস আরা খানম, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট রেহনুমা আহমেদ, সাংবাদিক সামসুদ্দোজা সাজেন, সংবাদকর্মী মো. মুসা মিয়া, টিভি উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী, লোটাস মারমা, গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ এবং নাগরিক কোয়ালিশনের সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেনসহ অন্যরা।

/এম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
এনসিপির কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ
এনসিপির কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ
ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে জোর, ৩ মাস পর অগ্রগতি দেখতে চান মন্ত্রী
ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে জোর, ৩ মাস পর অগ্রগতি দেখতে চান মন্ত্রী
শিশুর অভিভাবকত্বে আইনি জটিলতা দূর করার তাগিদ
শিশুর অভিভাবকত্বে আইনি জটিলতা দূর করার তাগিদ
সর্বাধিক পঠিত
জেলেদের কাছ থেকে ১০ মণ ইলিশ মাছ উদ্ধার, এতিমখানায় বিতরণ
জেলেদের কাছ থেকে ১০ মণ ইলিশ মাছ উদ্ধার, এতিমখানায় বিতরণ
মক্কায় মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’, বাংলাদেশি নারী ও পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
মক্কায় মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’, বাংলাদেশি নারী ও পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
উন্মুক্ত হচ্ছে নতুন এক্সপ্রেসওয়ে, বড় পরিবর্তন আসবে যোগাযোগে
উন্মুক্ত হচ্ছে নতুন এক্সপ্রেসওয়ে, বড় পরিবর্তন আসবে যোগাযোগে
অতিরিক্ত খরচ আর ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন রুটে রিয়াদ যাচ্ছেন প্রবাসীরা 
অতিরিক্ত খরচ আর ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন রুটে রিয়াদ যাচ্ছেন প্রবাসীরা 
ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ওষুধ কারখানা বন্ধ ঘোষণা
ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ওষুধ কারখানা বন্ধ ঘোষণা