ডেঙ্গু রোগীর সরকারি হিসাব অসম্পূর্ণ!

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২২:১৪, ডিসেম্বর ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২০, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯





ডেঙ্গু রোগী (ফাইল ছবি)দেশে এবছর কতজন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তার সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে তাতে শুরু থেকেই রয়েছে গড়মিলের অভিযোগ। কারণ, সুনির্দিষ্ট কিছু সরকারি ও খ্যাতনামা বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া বাকি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর তথ্য এতে নেই। এমনকি বছরের শুরুর দিকেই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হলেও তার তথ্যও নেই কন্ট্রোল রুমের কাছে। এই কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত মোট এক লাখ ২৮২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৯৯ হাজার ৬২৪ জন। তবে বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে যত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তার প্রায় সমান সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তিই হননি। তারা চিকিৎসা নিয়েছেন বাড়িতে। যে কারণে সরকারি হিসাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না।







চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্টরা জানান,গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে, সেটা রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় গত আগস্টে। আগস্টে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৫২ হাজার ৬৩৬ জন। দেশের ইতিহাসের কোনও একক রোগে আক্রান্ত হয়ে এত মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার নজির নেই। এছাড়া ২৬৪টি মৃত্যুর মধ্যে ২০৪টি পর্যালোচনা করে ১২৯ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। তাদের মতে, এরআগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এত মানুষের মৃত্যু হয়নি।
বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,কন্ট্রোল রুম প্রতিদিন গণমাধ্যমে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা পাঠায়। তাতে ঢাকা শহরের ২৯টি বেসরকারি ও ১২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালের তথ্য থাকে। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে যত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তার প্রায় সমান বা কাছাকাছি সংখ্যার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হননি। যাদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন ছিল না, তারা হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাসায় থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন অথবা চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়েছেন। সে হিসাব কন্ট্রোল রুমে নেই। এছাড়া ঢাকার হাসপাতালগুলোতে যেসব রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের তথ্যও নেই স্বাস্থ্য অধিদফতরে, হিসাব নেই ঢাকার বাইরে ঘরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীরও। হিসাব পাওয়া যায় না অন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদেরও।
রাজধানীর অন্যতম প্রধান একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে জানা গেছে,গত জুলাই মাসে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২জন করে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে এসেছেন। তাদের কাউকে ভর্তি রাখা হয়েছে, কেউ আবার হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরত গেছেন। অথচ স্বাস্থ্য অধিদফতরের তালিকায় দেখানো হয়েছে ওই হাসপাতালে মাত্র একজন চিকিৎসা নিয়েছেন।
বেসরকারি গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনে ভর্তি ছিলেন ৩২ জন রোগী,এরমধ্যে অর্ধেক ছিল শিশু। হাসপাতাল থেকে জানা যায়, মার্চ মাস থেকেই সেখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রোগী ভর্তি হচ্ছিল। কিন্তু জুলাইতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের তালিকাতে এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দেখানো হয় শূন্য।
বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একইভাবে জুলাইতে মিরপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল তৌসিফ নামের এক শিশু। তবে কন্ট্রোল রুমের তালিকাতে সে হাসপাতালের নামই ছিল না। জুলাই মাসে উত্তরার উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মগবাজারের ইনসাফ বারাকাহ হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। তবে তাদেরও তথ্য নেই কন্ট্রোল রুমের তালিকায়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গুর সময়টাতে হাসপাতালগুলোতে প্রচুর রোগী ভর্তি হয়েছেন। যে কারণে পরে সংকটাপন্ন অবস্থা ছাড়া রোগী ভর্তি করা হয়নি। আবার অনেকে বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েও বাড়ি ফিরেছেন। তাদের নাম ডেঙ্গু রোগীর তালিকায় নেই।
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অনেক রোগীকেই হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি।
অ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে জানা যায়, বেড সংকট থাকায় তারা প্রতিদিন অন্তত ৫০ জন ডেঙ্গু রোগীকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে ডেঙ্গু নিয়ে যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে সেটা যে অসম্পূর্ণ, একথা স্বীকার করেছেন খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারাই। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাতে ছোট বড় হাসপাতাল, ক্লিনিক মিলিয়ে রেজিস্টার্ড হাসপাতালই রয়েছে ৩৩৬টি। অথচ স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে রিপোর্ট করছে মাত্র ২৯টি বেসরকারি হাসপাতালের। আবার বছরের শুরুর দিকে ২৯টি বেসরকারি ও ১২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালের তথ্যও অধিদফতরের কাছে ছিল না।
হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগে যারা চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের তথ্য হাসপাতালে থাকে না। পরীক্ষার পর পজিটিভি হলেই কেবল তারা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসেন। আবার অনেকে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আলাদা করে এসব রোগীর তথ্য নেওয়া সম্ভব না।
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদফতরের তালিকার চেয়ে কয়েকগুণ বেশিই হবে বলে মন্তব্য করেছেন রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর)সাবেক পরিচালক ডা. মাহমুদুর রহমান। তবে একেবারে ঠিক কতটা বেশি, সেটা নিরূপণ না হলে বলা মুশকিল। একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে,আরও কয়জন রোগী বাইরে থেকে যান,সেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। তবে সংখ্যাটা কয়েকগুণ বেশিই হবে।
সরকারি হিসাবের এক লাখের বাইরেও রোগী ছিল কিনা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অবশ্যই ছিল।কারণ,শুরুর দিকে আমরা বেশি হাসপাতাল থেকে তথ্য আনতে চাইনি বা তারা রিপোর্ট করেনি। আর তালিকার বাইরেও অনেক হাসপাতাল রয়েছে, সেখানেও ডেঙ্গু রোগী এসেছিল, বহির্বিভাগের রোগীদেরও হিসাবে আনা হয়নি। আবার চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারে যারা গিয়েছেন তাদেরও তথ্য নেই বলে স্বীকার করেন তিনি।

/টিটি/টিএন/

লাইভ

টপ