এনু-রূপনের আরও টাকার ভল্টের খোঁজে গোয়েন্দারা!

Send
নুরুজ্জামান লাবু ও আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ১৭:৫৯, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৩, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০

ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেফতার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল ও রূপনক্যাসিনোকাণ্ডের অন্যতম দুই হোতা এনামুল হক এনু ও রূপন ভূঁইয়ার কত টাকা, বাড়ি, গাড়ি আর ফ্ল্যাট আছে তা নিশ্চিত করে কেউ জানেন না। তাদের পুরান ঢাকার বিভিন্ন বাড়িতে সিন্দুকের পর সিন্দুকে নগদ টাকা মিলছে। গত মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) উদ্ধার করা পাঁচটি টাকাভর্তি ভল্টের সঙ্গে কয়েকটি ইলেকট্রনিক চিপসও উদ্ধার করেছে র‌্যাব। র‌্যাব কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এগুলো টাকার ভল্টের চিপস। তাদের হেফাজতে অন্য কোথাও আরও অন্তত ডজন খানেক সিন্দুক বা ভল্ট রয়েছে। সেগুলোর ভেতরে আরও কোটি কোটি নগদ টাকা রয়েছে। এসব চিপসের মাধ্যমে সেসব ভল্ট খোলা যায়। তবে সেগুলো কোন বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়েছে সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি র‌্যাব। এসব ভল্টের সন্ধানে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে।

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, এনু-রূপনের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া টাকাগুলো ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের জুয়ার অর্থ। সেপ্টেম্বর মাসে র‌্যাবের অভিযান শুরুর পরপরই বস্তায় করে এসব টাকা এনু-রূপনের বাসায় নিয়ে লুকিয়ে রাখা হয়। ওয়ান্ডারার্স ক্লাব পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যদের অংশও এখানে ছিল। তদন্তে তাদের বিষয়েও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে।

গত সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে নারিন্দার ‘মমতাজ ভিলা’য় রাখা পাঁচটি সিন্দুক বা ভল্ট থেকে সাড়ে ২৬ কোটি টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব। এর আগে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর তাদের বাসায় প্রথম দফায় অভিযানে ৫ কোটি টাকা উদ্ধার করেছিল র‌্যাব। তখন থেকেই দুই ভাই পলাতক ছিল। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সে সময় তাদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

সিআইডির রিমান্ডে তারা ২০০০ সালের পর থেকে ১৫৬টি ফ্ল্যাট এবং ২২টি বাড়ির মালিক হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। ঢাকাতেই তাদের ছোট-বড় ৭০টি জায়গা পাওয়া গেছে। এছাড়াও ঢাকার বাইরে তাদের ৪ বিঘা জমিরও সন্ধান মিলেছে।

র‌্যাবের গোয়েন্দা এবং আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, আমরা নিয়মিত ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালাচ্ছি। ক্যাসিনো থেকে আমরা দৃষ্টি সরাইনি। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করার পরই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্যাসিনোর সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’ র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এনু-রূপনের আরও অবৈধ অর্থ আছে কিনা তারও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে তথ্য এসেছে, পুরান ঢাকার আরেকটি বাসায় এনু-রূপনের আরও একাধিক ভল্ট রয়েছে। অত্যাধুনিক ওই ভল্টগুলো ইলেকট্রনিক্স চিপস এবং পাসওয়ার্ড সংবলিত। অত্যন্ত সুরক্ষিত এসব ভল্টে রক্ষিত আছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। তবে ওই তথ্যের বিষয়টি নিশ্চিত হতে বেশ কয়েকটি বাসায় এরইমধ্যে বিভিন্ন কৌশলে রেকি করা হয়েছে। বাসার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য চেষ্টা চলছে। র‌্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, ওই বাসায় রক্ষিত ভল্টগুলোতে সম্পদের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর একযোগে রাজধানীর ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, শাহজাহানপুর মুক্তিযোদ্ধা চিত্তবিনোদন ক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে র‌্যাবের একাধিক টিম অভিযান শুরু করে। ওই সুযোগে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে রক্ষিত বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়। প্রায় ৪ ঘণ্টা পর ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে র‌্যাব সদস্যরা অভিযানে গেলে নগদ মাত্র ১০ লাখ টাকা এবং ক্যাসিনোর কিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করে। ২৪ সেপ্টেম্বর এনামুল ও রূপনের সূত্রাপুরের মুরগিটোলা মোড়ের বাসায় এবং তাদের দুই কর্মচারীর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই অভিযানে এনু-রূপন ও তাদের দুই সহযোগীর বাসা থেকে ৫টি সিন্দুক ভর্তি ৫ কোটির বেশি টাকা, ৮ কেজি সোনা (৭০০ ভরি) ও ৬টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর ও ওয়ারী থানায় মোট ৭টি মামলা হয়। তখনই বেরিয়ে আসে ক্যাসিনো ব্রাদার্সের লুকায়িত সম্পদের একটি অংশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, যেহেতু নারিন্দার বাসা থেকে ২৬ কোটি টাকা, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রার সঙ্গে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনো চিপস উদ্ধার হয়েছে, তাই এর দায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। ক্লাবে ক্যাসিনোর সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, ভাগ পেতেন, তাদেরও পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি আরও বলেন, শুরুতে মাত্র দুটি ক্লাবে একযোগে অভিযান চালানোর কারণে ক্যাসিনো চলে এমন অন্য ক্লাবের মালিকরা ক্যাসিনো সামগ্রী সরিয়ে ফেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। নারিন্দার বাসার চিত্র আমাদের অন্য ক্লাবগুলোর বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন নারিন্দা কাঁচাবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সবার মুখে মুখে ক্যাসিনো ব্রাদার্সের কথা। তাদের অনেকেরই প্রশ্ন, এই দুই ভাই কীভাবে এলাকায় এত সম্পদের মালিক হলো, কীভাবেই বা তারা দিনের আলোতে এতসব সিন্দুক বাসায় এনেছিল? তাদের অনেকেই আবার সিআইডি আর দুদকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বিশ্বাস, এই দুই ভাইয়ের হেফাজতে আরও অনেকের গুপ্তধন রয়েছে।

এলাকাবাসীর তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৫ সাল থেকেই এনামুল ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও রূপন আরামবাগ ক্লাবে জুয়া খেলতো। একটা সময় তারা জুয়ার বোর্ডের মালিক বনে যায়। সেখান থেকে আসতে থাকে কাঁচা টাকা। সেই টাকাতেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ফ্ল্যাট ও বাড়ি কেনা শুরু করে এনু-রূপন। গত ছয় থেকে সাত বছরে পুরান ঢাকায় বাড়ি কিনেছেন কমপক্ষে ১২টি। ফ্ল্যাট কিনেছেন ৬টি। পুরনো বাড়িসহ কেনা জমিতে গড়ে তুলেছেন নতুন নতুন ভবন। এই দুই ভাইয়ের মূল পেশা ছিল জুয়া।

স্থানীয়রা জানান, ২০১৮ সালে এনু গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হন। আর রূপন পান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ। তাদের পরিবারের পাঁচ সদস্য, ঘনিষ্ঠজনসহ মোট ১৭ জন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগে পদ পান। তারা সরকারি দলের এসব পদ-পদবি জুয়া ও ক্যাসিনো কারবার নির্বিঘ্নে চালানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।

আরও পড়ুন:

মামলার তদন্তে সিআইডি, টাকার হদিস পেলো র‌্যাব

বাসায় সাজানো থরে থরে টাকা

ক্যাসিনোকাণ্ডে দুই ভাই এনামুল ও রূপন ৪ দিনের রিমান্ডে

 

 

/এআরআর/এনএল/এমআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ